হোম > বিশ্লেষণ

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ক্লাস্টার ওয়ারহেড, চ্যালেঞ্জের মুখে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইসরায়েলের আকাশে ইরানের ক্লাস্টার মিউনিশনস। ছবি: সংগৃহীত

রাতের অন্ধকার আকাশ চিরে কমলা রঙের ক্ষুদ্র আলোর বিন্দুগুলো ছুটে যাচ্ছে, আর পেছনে বাজছে বিমান হামলার সতর্ক সাইরেন। এটি এক অস্বস্তিকর দৃশ্য, যা ইসরায়েলে যুদ্ধের এক নিয়মিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। কারণ, ইরান ক্রমশ তার কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেডে ক্লাস্টার মিউনিশন সংযোজন করছে, যার লক্ষ্য ইসরায়েলের উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করা।

আকাশে দেখা এই আলোর বিন্দুগুলো আসলে ছোট ছোট বোমা। প্রতিটির মধ্যে প্রায় ১১ পাউন্ড পর্যন্ত বিস্ফোরক থাকে। ক্ষেপণাস্ত্রের মাথা থেকে আকাশের অনেক উঁচুতে এগুলো অবমুক্ত করা হয়, তারপর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এলোমেলোভাবে নিচে পড়তে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের বেশিরভাগ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে প্রায় ২৪টি করে বোমলেট থাকে। তবে তাদের একটি ‘খোররমশাহর’ ক্ষেপণাস্ত্রে সর্বোচ্চ ৮০টি পর্যন্ত বসানো যায়।

দুটি পৃথক ইরানি ক্লাস্টার মিউনিশন হামলার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিস্ফোরণগুলো যথাক্রমে সাত ও আট মাইল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেগুলো এলোমেলোভাবে বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সড়ক ও পার্কে আঘাত হানে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে আগাম সতর্কতা পাওয়ার কারণে ইসরায়েলিরা তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে এবং আশ্রয়কেন্দ্রও সহজলভ্য। তবুও গত সপ্তাহে তেল আবিবের উপকণ্ঠে এক বোমলেট বিস্ফোরণে ২ জন নিহত হন এবং আরও অনেকে আহত হন। নিহত দুজনই নির্মাণ শ্রমিক ছিলেন এবং হামলার সময় তারা কোনো আশ্রয়কেন্দ্র বা নিরাপদ স্থানে ছিলেন না।

ক্লাস্টার মিউনিশন স্বভাবগতভাবেই নির্বিচার, আর এ কারণেই জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর ব্যবহার আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে নিষিদ্ধ। এ ধরনের অস্ত্রের বিভিন্ন ধরন রয়েছে, যেমন বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য বোমা এবং একাধিক রকেট উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, যা শত শত বোমলেট ছড়িয়ে দিতে পারে।

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহারের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন’ বলেছিল। একই সঙ্গে ২০০৬ সালে লেবাননে ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহারের জন্য সংস্থাটি ইসরায়েলের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ এনেছিল। ইসরায়েল অতীতে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছে, তবে তাদের দাবি, তা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায়ই করা হয়েছে। ইরান এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য করা অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

বর্তমানে ইরান আগের সংঘর্ষগুলোর তুলনায় আরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে ‘কার্গো ওয়ারহেড’ ব্যবহার করছে, যা ক্লাস্টার সাবমিউনিশন বহন করতে পারে। এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানান, এই যুদ্ধে ইসরায়েলের দিকে ছোড়া প্রায় অর্ধেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রেই ক্লাস্টার মিউনিশন ছিল।

এই অস্ত্রগুলো ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য একটি বড় নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারলেও ছোট আকারের বোমলেটগুলো আটকানো কঠিন। এগুলো খুব ছোট এবং বাধা দেওয়ার সময়ও খুব কম। ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ তাল ইনবার বলেন, ‘এটি সক্রিয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল।’

কিছু ক্ষেত্রে দূরপাল্লার প্রতিরোধ ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করতে পারলেও বোমলেটগুলো ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, ক্ষেপণাস্ত্রটি সরাসরি আঘাতে ধ্বংস না হওয়া বা আগে থেকেই বোমলেট মুক্ত হয়ে যাওয়া। ইনবার জানান, ইসরায়েলের স্বল্পপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ দিয়ে এসব বোমলেট আটকানো সম্ভব হলেও সব সময় সফল হয় না।

অস্ত্র বিশেষজ্ঞ এবং আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেসের পরিচালক এনআর জেনজেন-জোনস বলেন, ইরানি কৌশলবিদরা সম্ভবত উচ্চ আকাশে বোমলেট ছড়ানোর পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন যাতে স্থলভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা এগুলো আটকাতে না পারে। তিনি বলেন, ‘রাশিয়া ও চীনের অস্ত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি দেখা যায়। তবে ইরানের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সংখ্যক সাবমিউনিশন অনেক বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, যা সামরিকভাবে কম কার্যকর নকশা।’

পূর্ববর্তী সংঘর্ষে ইরান প্রায়ই একসঙ্গে ডজনখানেক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সক্ষমতার ওপর আঘাত হানায় এখন ক্লাস্টার মিউনিশন সেই প্রতিরক্ষা ভেদ করার বিকল্প উপায় হয়ে উঠতে পারে।

ইনবার বলেন, ‘এই মুহূর্তে ইরানের বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সংগঠনের সক্ষমতা নেই। তাই অল্প সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়েও বড় ক্ষতি করতে চাইলে বোমলেট-যুক্ত সাবমিউনিশনই তাদের পছন্দের অস্ত্র হবে।’

এ ধরনের অস্ত্র শুধু প্রতিরক্ষা ফাঁকি দেওয়ার জন্য নয়, ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক মজুদ কমিয়ে দেওয়ার কৌশলও হতে পারে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় বহু প্রতিরোধক ছুড়তে বাধ্য হতে পারে ইসরায়েল। ইনবার বলেন, ‘এটি একটি হিসাবের লড়াই। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বনাম ইসরায়েল বা আবুধাবি বা কাতারের প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা।’

৯ মার্চের একটি হামলায় যে নির্মাণস্থলে দুই ব্যক্তি নিহত হন, সেটি পাঁচটি নিশ্চিত আঘাতের একটি ছিল। বিস্ফোরণগুলো আট মাইলেরও বেশি এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাশের শহরে হাঁটতে থাকা একজনও আহত হন। এর আগের দিন আরেকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উত্তর তেল আবিব ও পাশের একটি উপশহরের সাত মাইল এলাকাজুড়ে বোমলেট ছড়ায়। এতে একটি গাড়ি ধোয়ার কেন্দ্র, একাধিক আবাসিক এলাকা এবং একটি পার্কে আঘাত লাগে।

জেনজেন-জোনস বলেন, ‘এই ক্ষেপণাস্ত্র ও সাবমিউনিশনের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য ইঙ্গিত দেয় যে এগুলো মূলত বেসামরিক জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য তৈরি, স্পষ্ট সামরিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নয়।’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও হোম ফ্রন্ট কমান্ড জনগণকে সতর্ক করছে যে, সাইরেন থেমে যাওয়ার পরও কয়েক মিনিট আশ্রয়ে থাকতে হবে, যতক্ষণ না নিরাপদ সংকেত দেওয়া হয়। তারা অবিস্ফোরিত বোমলেটের কাছে না যাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, ‘এর (বোমলেট) বিস্ফোরণ গ্রেনেডের মতো, স্থানীয় ক্ষতি সীমিত হলেও কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার কারণে এগুলো বড় পরিসরে ক্ষতি করতে পারে।’

তবে প্রকৃত ঝুঁকি সম্ভবত ইরানের বৃহত্তর কৌশলে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি ধীরে ধীরে এক ধরনের ক্ষয়যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। একটি মাত্র ক্ষেপণাস্ত্র, বিশেষ করে ক্লাস্টার মিউনিশনযুক্ত হলে—লাখ লাখ ইসরায়েলিকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য করতে পারে এবং একই সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যয়বহুল প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে বাধ্য করে।

জেনজেন-জোনস বলেন, ‘এ ধরনের অস্ত্রের ধারাবাহিক ব্যবহার মূলত দমনমূলক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তৈরির উদ্দেশ্যে। ইরান সম্ভবত বারবার হামলার মাধ্যমে ইসরায়েলিদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করতে এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে মানুষকে বারবার আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হতে হয়।’

ইরানের অল-আউট গেমপ্ল্যান: লক্ষ্য বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসরোধ করে মার্কিন অহংকারকে নতজানু করা

ইরানে ইসলামিক রিপাবলিক ২.০ আসছে, কেমন হবে এটি

ইরান যুদ্ধের সাতপাকে আটকে গেছে ট্রাম্পের জয়

ইরান থেকেই কি শুরু হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

ইলেকট্রনিক যুদ্ধ: ইরানকে যেভাবে সহায়তা করছে চীন-রাশিয়া

ইরান যুদ্ধ কি ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান থামিয়ে দেবে

চারদিকে শত্রু নিয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধে কত দিন টিকবে ইরান

মোজতবা খামেনির উত্থান: রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব নাকি কঠোর শাসনের ধারাবাহিকতা

ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের পতনে জন্ম নিতে পারে ‘আইআরজিস্তান’

যেসব লক্ষ্য পূরণ হলে ইরান যুদ্ধ থামাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র