হোম > বিশ্লেষণ

সব লঞ্চার ‘ধ্বংসের’ পরও এত ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে ছুড়ছে ইরান, আর কত অবশিষ্ট

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

জনসাধারণের জন্য প্রদর্শিত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ডামি। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিশেষজ্ঞরা। তবে ইরানের হাতে এখনো এত সক্ষমতা রয়েছে যে তা দিয়ে বড় ধরনের ক্ষতি করা সম্ভব। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

গত শনিবার হোয়াইট হাউস বলেছে, ‘ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের নৌবাহিনীকে যুদ্ধ অযোগ্য হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ইরানের আকাশসীমায় সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধ শুরুর প্রসঙ্গে তারা বলেছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি বিশাল ফল দিচ্ছে।’

রোববার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, মার্কিন বাহিনী ইরানের ড্রোন উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করে দিয়েছে। তবু সোমবার বিকেলে কাতার জানায়, ইরান থেকে তাদের দিকে ছোড়া সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি তারা প্রতিহত করেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনও সতর্কতা জারি করে। আবুধাবিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র একটি গাড়িতে আঘাত হানে, এতে একজন নিহত হন।

তাহলে কি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সত্যিই মারাত্মকভাবে কমে গেছে? আর যদি তা-ই হয়, তবে তারা কীভাবে এখনো প্রতিবেশী দেশ ও ইসরায়েলের দিকে অস্ত্র নিক্ষেপ করছে?

ইরান কি এখন কম ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে

নিশ্চয়ই। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো, ইসরায়েল ও অঞ্চলের অন্যান্য দেশের দিকে ইরানের প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সংঘাতের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ইরান শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকেই ১৬৭টি ক্ষেপণাস্ত্র (ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ) এবং ৫৪১টি ড্রোন ছুড়ে। অথচ যুদ্ধের ১৫ তম দিনে তারা ছুড়েছে মাত্র চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোন। আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির ভিত্তিতে আল জাজিরা এই হিসাব দিয়েছে।

ইসরায়েলের ওপর হামলাও কমেছে। প্রথম দুই দিনে প্রায় ১০০টি প্রজেকটাইল বা প্রক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা এক অঙ্কে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ। গত সপ্তাহে পেন্টাগন জানায়, যুদ্ধের প্রথম দিনের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ৯০ শতাংশ এবং ড্রোন হামলা ৮৬ শতাংশ কমে গেছে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার কত বড় এবং কতটা ক্ষতিগ্রস্ত

২০২২ সালে মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালকের দপ্তর মূল্যায়ন করে যে অঞ্চলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ভান্ডার ইরানের। ঠিক কত আছে তার সরকারি হিসাব নেই। তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের কাছে প্রায় ৩ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর কমে ২ হাজার ৫০০-তে নেমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের লঞ্চার ধ্বংস করা। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে একটি দৃশ্যমান পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেমন বড় বিস্ফোরণ, যা স্যাটেলাইট ও রাডারে ধরা পড়ে। ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের উদ্ধৃত এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা জানান, আনুমানিক ৪১০ থেকে ৪৪০টি লঞ্চারের মধ্যে প্রায় ২৯০টি অকার্যকর করা হয়েছে।

তবে ইরান বিশাল দেশ। স্থলবাহিনী না থাকলে সম্পূর্ণভাবে উৎক্ষেপণ সক্ষমতা নির্মূল করা কঠিন, যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রায় পুরো আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করছে। ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ডেভিড ডেস রশেস এসব কথা বলেন।

ডেভিড ডেস রশেস বলেন, ‘লঞ্চার শনাক্ত করা সহজ নয়। আমরা যা দেখছি, তা হলো এমন ক্ষেপণাস্ত্র, যেগুলো যুদ্ধের আগে গোপন স্থানে বা সামরিক স্থাপনা নয়, এমন জায়গায় রাখা হয়েছিল, যখন নজরদারি কম ছিল।’ তাঁর মতে, হামলার গতি কমে যাওয়ার কারণ ইরানি বাহিনীর একসঙ্গে বহু ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার ক্ষমতা হারানো। ফলে এখন তারা এক বা দুটি করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশের বেসামরিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামোর দিকে, সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে হামলার বদলে। যদিও ইরান দাবি করে, তারা শুধু অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের ওপর হামলা চালাচ্ছে।

ডেস রশেস বলেন, ‘সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটিকে বলা হয় ‘হ্যারাসমেন্ট ফায়ার’, অর্থাৎ সতর্কতা ব্যবস্থা ক্লান্ত করা এবং মানুষকে আতঙ্কিত করার উদ্দেশ্যে হামলা।’

ইরানের কৌশল কী

ইরান বিশেষজ্ঞ এবং জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদ রেজা আজিজি বলেন, তেহরানের মূল হিসাব হলো উপসাগরীয় দেশ ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ফুরিয়ে যেতে পারে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হওয়ার আগে। তিনি বলেন, প্রতিদিন কমসংখ্যক কিন্তু ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে এটিকে ক্ষয়যুদ্ধ বা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বানানোর আগ্রহ থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কিছু বড় ঘাঁটি ও লঞ্চার ধ্বংস করলেও ইরান কমান্ড ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ করেছে এবং মোবাইল লঞ্চারের ওপর নির্ভর করছে, যা শনাক্ত ও ধ্বংস করা কঠিন। আজিজি বলেন, ‘এটি সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দৌড়ে ইরান মনে করে তাদের সুযোগ আছে। দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের সমালোচনামূলক নিরাপত্তা অধ্যাপক মুহান্নাদ সেলুম বলেন, ‘কতটি ছোড়া হলো তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতক্ষণ বিশ্বাসযোগ্য হুমকি বজায় থাকে। একটি সফল ড্রোনই নিরাপত্তাবোধ ভেঙে দিতে পারে।’

ইরান দীর্ঘদিন ধরে সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোন তৈরিতে দক্ষ। শাহেদ-১৩৬ ড্রোন সহজ কারখানায় দ্রুত ও বিপুল সংখ্যায় তৈরি করা যায় এবং একসঙ্গে অনেকগুলো ছোড়া যায়, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলে। এগুলো চালাতে জটিল লঞ্চারের প্রয়োজন হয় না। ঘণ্টায় মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার গতির হওয়ায় হেলিকপ্টার দিয়েও ভূপাতিত করা সম্ভব, তবু অনেক ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ঢুকতে সক্ষম হয়েছে।

সোমবারই দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে ড্রোন-সংক্রান্ত ঘটনায় আগুন লাগে, এতে সাময়িকভাবে ফ্লাইট বন্ধ হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ শিল্প এলাকায় আরেকটি ড্রোন হামলায় আগুন লাগে। ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের কারণে মধ্য ইসরায়েলে সাইরেন বেজে ওঠে। আর হরমুজ প্রণালিতে, যেখানে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ পরিবাহিত হয়, অল্পসংখ্যক হামলা সত্ত্বেও আঘাতের আশঙ্কায় শত শত জাহাজ স্থবির হয়ে আছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একটি সামুদ্রিক পর্যবেক্ষক সংস্থা জাহাজ-সংক্রান্ত ২০টি ঘটনার তথ্য দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি সামরিকভাবে শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের অসম যুদ্ধনীতির অংশ। দুর্বল পক্ষ হিসেবে ইরান অপ্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত করে অর্থনৈতিক ক্ষতি ঘটিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করতে চায়।

ইতিমধ্যে তেহরান তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং বৈশ্বিক বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্যাস রপ্তানিকারক কাতার এখনো উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বাহরাইনের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি চালান স্থগিত ঘোষণা করেছে। ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ৭০ শতাংশ কমে গেছে।

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক ভালি নাসরের মতে, ইরান যদি তেলের দাম বাড়িয়ে রাখতে পারে, তবে ‘এটি ইরানে মার্কিন বোমা হামলার চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রকে সমান বা বেশি ক্ষতি করবে।’

স্কুলে ভর্তিতে লটারি বাতিল: পক্ষে-বিপক্ষে প্রতিক্রিয়া

পরিকল্পনায় তালগোল মার্কিন প্রশাসনের

এবার ইরানের ‘খারগ দ্বীপ’ চান ট্রাম্প, যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন পাহারায় জাহাজ চলাচল কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

বুমেরাং হয়েছে ইরানের ‘ফরোয়ার্ড ডিফেন্স’

হরমুজে অচলাবস্থা: সবচেয়ে লাভবান রাশিয়া, সংকটের আবর্তে এশিয়া

ইরানে ‘বিজয়’ ঘোষণার পরও কেন অন্যদের সাহায্য চাচ্ছেন ট্রাম্প

দ্য আর্ট অব ডেস্ট্রয় অ্যান্ড ডিল: ট্রাম্প-রুবিও নীতি ইরানে কি ব্যর্থ হতে চলেছে

কেন সারা বিশ্বের নজর এখন ইরানের খার্গ দ্বীপে

ইরানে ইরাক যুদ্ধের ছায়া, ট্রাম্প শিক্ষা নেবেন কি