হোম > বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধ বদলে দিচ্ছে ওয়ার্ল্ড অর্ডার, তেহরান হয়ে উঠছে শক্তির চতুর্থ কেন্দ্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইরানের এই নবজাত শক্তির উৎস হলো বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনার্জি ট্রানজিট বা জ্বালানি চলাচলের পথ হরমুজ প্রণালি। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভূরাজনৈতিক হিসেবে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে, বিশ্বব্যবস্থা তিনটি শক্তিকেন্দ্র বা পাওয়ার সেন্টারের দিকে ধাবিত হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। মূলত, শক্তি অর্থনৈতিক বিস্তৃতি ও সামরিক সক্ষমতা থেকে উদ্ভূত হয়, এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু সেই ধারণা এখন আর টিকছে না। চতুর্থ বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্র হিসেবে দ্রুত আবির্ভূত হচ্ছে ইরান। দেশটি অর্থনৈতিক বা সামরিক দিক থেকে ওই তিন দেশের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারেকাছেও নেই। এর পরিবর্তে, ইরানের এই নবজাত শক্তির উৎস হলো বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এনার্জি ট্রানজিট বা জ্বালানি চলাচলের পথ—হরমুজ প্রণালির ওপর এর নিয়ন্ত্রণ।

দীর্ঘদিন ধরে প্রণালিটি আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এই পথ দিয়ে সব দেশের জাহাজ চলাচল করতে পারত। কিন্তু এ বছর ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করেছে, তা ইরানকে এই প্রণালিতে ‘বাছাইকৃত সামরিক অবরোধ’ তৈরি করতে প্ররোচিত করেছে।

বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। অদূর ভবিষ্যতে এই সরবরাহ রুটের বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প নেই। আমার বিশ্বাস, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ যদি মাস বা বছরব্যাপী স্থায়ী হয়, তবে এটি বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে আমূল বদলে দেবে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য চরম ক্ষতির কারণ হবে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের এই দখলদারি কেবল সাময়িক। ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে যে, মার্কিন ও মিত্র নৌবাহিনী শিগগির পরিস্থিতি স্থিতিশীল করবে এবং তেলের প্রবাহ আগের মতোই স্বাভাবিক হবে।

তবে এই প্রত্যাশা ত্রুটিপূর্ণ। এটি ধরে নেয় যে, প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ইরানকে এটি আক্ষরিক অর্থেই সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে হবে। কিন্তু আমরা ইতিমধ্যে যা দেখেছি, তা হলো—প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ না করেও আপনি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। বর্তমানে প্রণালিটি ট্যাংকার চলাচলের জন্য উন্মুক্তই আছে। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জাহাজ চলাচল ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।

এর কারণ এই নয় যে, ইরান প্রতিটি জাহাজ ডুবিয়ে দিচ্ছে; বরং কারণ হলো, হামলার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকির মুখে বিমা কোম্পানিগুলো যুদ্ধঝুঁকি কাভারেজ প্রত্যাহার করেছে অথবা এর দাম বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি কয়েক দিন অন্তর একটি মালবাহী জাহাজে আঘাত করাই বিমা বাজারের ঝুঁকিকে অসহনীয় করে তোলার জন্য যথেষ্ট এবং হয়েছেও তা-ই।

আধুনিক অর্থনীতির জন্য কেবল তেলই যথেষ্ট নয়। সেই তেলের সরবরাহ সময়মতো, পর্যাপ্ত পরিমাণে ও অনুমেয় ঝুঁকির মধ্যে হওয়া প্রয়োজন। যখন এই নির্ভরযোগ্যতা ভেঙে পড়ে, তখন বিমাবাজার সংকুচিত হয়, জাহাজভাড়া লাফিয়ে বাড়ে এবং সরকারগুলো জ্বালানি প্রাপ্তিকে কেবল সাধারণ বাজার লেনদেনের পরিবর্তে এক জটিল কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে শুরু করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সমস্যাটি হলো অপ্রতিসম বা অ্যাসিমেট্রিক। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া প্রতিটি তেলের চালানকে মাইন, ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করা একটি পূর্ণকালীন অভিযান। এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সামরিক উপস্থিতি। অথচ ইরানকে কেবল বিশ্বের তেল সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করতে মাঝে মাঝে দু-একটি ট্যাংকারে আঘাত করলেই চলে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ গত বৃহস্পতিবার অনেকটা এভাবেই বলেছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, বলপ্রয়োগে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা ‘অবাস্তব’ এবং ‘এটি কেবল ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব’। তিনি মূলত এটিই স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ইরানের সম্মতি ছাড়া তেলের প্রবাহ নিশ্চিত করা অসম্ভব।

কয়েক দশক ধরে পারস্য উপসাগরে একটি সাধারণ ব্যবস্থা ছিল—তেল উৎপাদনকারীরা রপ্তানি করত, বাজার দাম নির্ধারণ করত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত। এই ব্যবস্থা অস্থিতিশীলতা ছাড়াই রেষারেষি বজায় রাখার সুযোগ করে দিয়েছিল। এখন সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো রাষ্ট্রীয় আয়ের জন্য জ্বালানি রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যখন বিমাহার বৃদ্ধি পায় এবং শিপিং অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন এর আর্থিক প্রভাব পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে। সরকারগুলো তখন নিজেদের মানিয়ে নেয়। মালবাহী জাহাজ ভিন্ন পথে পাঠানো হয়। চুক্তিগুলো নতুন করে আলোচনা করা হয়।

যদি এই অনিশ্চয়তা চলতে থাকে, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর বর্তমান বিন্যাস অনিবার্যভাবে পরিবর্তিত হবে। সেখানে এমন একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার উদ্ভব হবে, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমশ সেই শক্তিকেই বেশি গুরুত্ব বা ছাড় (accommodate) দেবে, যে তাদের রপ্তানির নির্ভরযোগ্যতাকে সরাসরি প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। সেই শক্তিটি এখন ইরান।

এর বৈশ্বিক প্রভাব এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি অনুভূত হবে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর প্রবলভাবে নির্ভরশীল। চীন বৈচিত্র্যময় উৎস ব্যবহার করলেও তাদের জ্বালানি আমদানির একটি বিশাল অংশের জন্য এই অঞ্চলের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই নির্ভরশীলতাগুলো অবকাঠামোগত—যেমন রিফাইনারি, শিপিং রুট ও স্টোরেজ সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত, যা খুব দ্রুত পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

যদি জ্বালানি সরবরাহে এই বিঘ্ন অব্যাহত থাকে, তবে এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। উচ্চ বিমা ও মাল বহনের খরচ পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। বাণিজ্য ভারসাম্য ভেঙে পড়বে। মুদ্রার মান কমে যাবে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। জ্বালানিনির্ভরতা তখন রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। সরকারগুলো জ্বালানি প্রাপ্তিকে অগ্রাধিকার দেবে। কূটনৈতিক বিকল্পগুলো সংকুচিত হয়ে আসবে। যেসব পদক্ষেপ আরও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়ায়, সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। ১৯৭০-এর দশকের সেই বিশ্ব, যেখানে তেলের ধাক্কা বছরের পর বছর স্থবিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির (stagflation) দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তা আর কোনো দূরস্মৃতি থাকবে না, বরং এক নিকট বাস্তবতায় পরিণত হবে।

আবারও বলছি, এতে লাভবান হবে ইরান।

চীন তার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভর করে। রাশিয়া তেলের উচ্চমূল্য ও অস্থিরতা থেকে সুবিধা পায়। ইরান তার হরমুজ প্রণালির অবস্থান থেকে বাড়তি সুবিধা বা ‘লিভারেজ’ পায়।

এই তিন দেশের প্রতিটিরই এমন সব সাধারণ লক্ষ্য রয়েছে, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পরিপন্থী। এই তিন দেশের কোনো আনুষ্ঠানিক সমন্বয়ের প্রয়োজন নেই। বর্তমান ব্যবস্থার কাঠামোই তাদের একই দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এভাবেই একটি নতুন শৃঙ্খলার উদয় হয়—কোনো আনুষ্ঠানিক জোটের মাধ্যমে নয় (অন্তত শুরুতে নয়), বরং অভিন্ন স্বার্থের মাধ্যমে যা সময়ের সঙ্গে একে অপরকে শক্তিশালী করে।

এই উদীয়মান নতুন বিশ্বব্যবস্থার অন্যান্য সম্ভাব্য দৃশ্যপট আরও অন্ধকার। কল্পনা করুন, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেলের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ, রাশিয়ার হাতে প্রায় ১১ শতাংশ আর চীন সেই সরবরাহের একটি বড় অংশ শুষে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তারা পশ্চিমা দেশগুলোকে বিশ্বের ৩০ শতাংশ তেল থেকে বঞ্চিত করতে একটি জোট বা কার্টেল গঠন করতে পারে। এর ভয়াবহ পরিণতি বুঝতে কোনো জটিল বিশ্লেষণের প্রয়োজন নেই—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্ষমতার চরম পতন ঘটবে এবং বিশ্বশক্তির কেন্দ্রবিন্দু চীন, রাশিয়া ও ইরানের দিকে সরে যাবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি কঠিন সিদ্ধান্তের সম্মুখীন—হয় হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে নামতে হবে অথবা একটি নতুন বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থা মেনে নিতে হবে, যেখানে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ আর নিশ্চিত নয়।

যদি তারা দ্বিতীয়টি অর্থাৎ মেনে নেওয়াকে বেছে নেয়, তবে ফলাফল স্পষ্ট—আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা পুনর্গঠিত হবে, যেখানে ইরান হবে বিশ্বের চতুর্থ শক্তিকেন্দ্র। আর যদি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তাকে এক দীর্ঘ যুদ্ধে লিপ্ত হতে হবে, যে যুদ্ধে তার হারার সম্ভাবনাও প্রবল।

ইরান যুদ্ধ কোনো সাধারণ সামরিক সংঘাত নয়, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই হাত গুটিয়ে নিতে পারে এবং সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। নতুন কোনো সমঝোতায় আসতে ইরান নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চড়া মূল্য দাবি করবে—তবে সেই মূল্য বিকল্প ভবিষ্যতের চেয়ে অবশ্যই কম হবে। এটি একটি রূপান্তরকারী যুদ্ধ; এই পরিবর্তনগুলো যদি মাত্র কয়েক বছরও স্থায়ী হয়, তবে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা চিরতরে বদলে যাবে।

লেখক: রবার্ট এ পাপে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ বছরের দম্ভ চুরমার করে দিল ইরান

১৯৩৮ সালে লন্ডনে মুসলিম শ্রমজীবীদের বিশাল বিক্ষোভের নেপথ্যে কী ছিল

যুদ্ধ বাধিয়ে এশিয়াকে চীনের হাতে তুলে দিচ্ছেন ট্রাম্প

ক্রুকে উদ্ধারে কী কী প্রযুক্তি ব্যবহার করল যুক্তরাষ্ট্র, ইরানিরা কেন খুঁজে পেল না

যেভাবে যুদ্ধের সমাপ্তি টানা যেতে পারে—ইরানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রূপরেখা

মার্কিন বাহিনীর নতুন মাথাব্যথা ইরানের ‘অদৃশ্য কমান্ডো’

ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থা: শুধু মুখবদল, নাকি আরও কঠোর

ইউরোপ-আমেরিকার ‘ডিভোর্স’ কি তবে অনিবার্য

মার্কিন হামলার সুবাদে হরমুজে ইরানের টোল বুথ, লেনদেন চলছে যেভাবে

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যেভাবে পুরো এশিয়ার সংকটে রূপ নিচ্ছে