ভারতের বিভিন্ন শহরে বর্তমানে বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের তীব্র সংকট এবং পেট্রল-ডিজেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য শুধু কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি ভারতের সাম্প্রতিক বৈদেশিক নীতির একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রতিফলন। গত কয়েক দশকে মধ্যপ্রাচ্যে ভারত যে ভারসাম্য বজায় রেখে আসছিল, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকা ও ইসরায়েলের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ায় সেই ভারসাম্য এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
ভারতের জ্বালানিনিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংযোগের জন্য ইরান সব সময়ই এক গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে ভারতের কৌশলগত অংশীদারত্বের পাল্লা এখন দৃশ্যত ইসরায়েল ও ওয়াশিংটনের দিকে অনেক বেশি ভারী। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মোদির ইসরায়েল সফর এবং নেসেটে দেওয়া ভাষণ এই ঘনিষ্ঠতার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও মোদি সেখানে ‘ইসরায়েল ফাদারল্যান্ড এবং ভারত মাদারল্যান্ড’ কথাটি ভারতীয় বংশোদ্ভূত ইহুদিদের প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, তবু উত্তাল মধ্যপ্রাচ্যের এই সময়ে এই সফরের সময়কাল এবং ঘনিষ্ঠতা তেহরানকে ভারতের দিক থেকে বিমুখ করে তুলেছে।
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের স্ববিরোধিতা নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। প্রথম কয়েক দিন ভারত এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাতে বা সমবেদনা প্রকাশে এক রহস্যজনক নীরবতা পালন করে। এমনকি কূটনীতিকপাড়ায় রিপোর্ট ছিল যে, শুরুতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের ইরানি দূতাবাসে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করতে নিষেধ করা হয়েছিল, যাতে আমেরিকা বা ইসরায়েল ক্ষুব্ধ না হয়।
কিন্তু এই নীরবতা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারত অবশেষে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা পরিস্থিতি সামাল দিতে নামে। ৫ মার্চ ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি নয়াদিল্লিতে ইরানি দূতাবাসে গিয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন। এর কয়েক দিন পর ৯ মার্চ বিজেপি নেতা মুখতার আব্বাস নকভি এবং পিডিপি প্রধান মেহবুবা মুফতিও দূতাবাসে গিয়ে সমবেদনা জানান। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই পদক্ষেপগুলো অনেক দেরিতে নেওয়া হয়েছে, যা ভারতের দীর্ঘদিনের ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
কূটনীতির এই দোদুল্যমানতার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভারতের রান্নাঘরে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের এলপিজি আমদানির ৮৫-৯০ শতাংশ পথ এখন রুদ্ধ। এতে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাইয়ের প্রায় ২০-৫০ শতাংশ রেস্তোরাঁ এলপিজি সংকটে বন্ধ হওয়ার পথে। অনেক জায়গায় মেনু কমিয়ে দেওয়া হয়েছে বা মাটির উনুনে রান্না শুরু হয়েছে।
মার্চ মাসের শুরু থেকেই বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারত সরকার ইতিমধ্যে ঘরোয়া গ্রাহকদের জন্য রান্নার গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে ‘অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন’ জারি করেছে।
ইরান শুধু ভারতের তেলের উৎস ছিল না, বরং মধ্য এশিয়ায় প্রবেশের পথ এবং এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে ভারতের একটি বড় কার্ড ছিল। অতিরিক্ত মার্কিন চাপের মুখে সেই সম্পর্ককে শীতল হতে দিয়ে ভারত এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে নিজেকে অনেক বেশি অরক্ষিত করে ফেলেছে। ভারতের মতো বিশাল দেশ এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর একটি অর্থনীতির পক্ষে কোনো একটি নির্দিষ্ট মেরুর ঝুঁকে পড়ে আত্মঘাতী হতে পারে। বর্তমান সংকট ভারতের বৈদেশিক নীতির নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ