‘সংঘ কোনো কিছু নিয়ন্ত্রণ করে না, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনোভাবেই না’—গত বছরের আগস্টে এক সম্মেলনে রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভগবত এই দাবি করেন। হিন্দু ডানপন্থীদের এই তাত্ত্বিক সংগঠন এ বছর তাদের শতবর্ষ উদ্যাপন করছে। এই মাইলফলক স্পর্শ করার মুহূর্তে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভগবত এমন এক নিস্পৃহ অভিভাবকের ভূমিকা নিলেন, যেন তিনি সন্তানদের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে উদ্গ্রীব।
আরএসএস একটি বিশাল সাংগঠনিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে থাকলেও ভগবত দাবি করেন, সংঘের শাখা সংগঠনগুলো ‘স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত এবং ধীরে ধীরে স্বনির্ভর হয়ে ওঠে’। সংঘের বিভিন্ন প্রচারপত্রেও আরএসএস বারবার সেসব সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করে, যারা তাদের অনুমোদিত প্রায় তিন ডজন সংগঠনের বাইরে।
তবে এটি একটি ওপেন সিক্রেট যে, সংঘের প্রভাব এই সীমিত গণ্ডির বাইরে গভীরভাবে বিস্তৃত। ভগবতের এই মন্তব্যের মাত্র কয়েক দিন আগে দিল্লির লালকেল্লায় ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আরএসএসকে ‘বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ভগবত লুকাতে চাইলেও মোদির এই বক্তব্য প্রমাণ করে, সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকা আরএসএস-সংশ্লিষ্ট সংগঠনের এক বিশাল নক্ষত্রপুঞ্জ, যাদের সম্মিলিত শক্তিই সংঘের ক্ষমতার মূল উৎস।
কেন এই নেটওয়ার্কের আকার, আকৃতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত করা হয়নি? কারণ সংঘ এটি এভাবেই রাখতে চায়। আরএসএস কোনো এনজিও, ধর্মীয় ট্রাস্ট বা অন্য কোনো আইনি সংস্থা হিসেবে নিবন্ধিত নয়। ভারতীয় ম্যাগাজিন ‘দ্য ক্যারাভান’-এর জুলাই মাসের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ‘দ্য আরএসএস ডাজ নর্থ এক্সিস্ট’ দেখিয়েছিল, কাগজে-কলমে এই অস্তিত্বহীনতা তাদের দিল্লির কেন্দ্রে সদর দপ্তর স্থাপন করার সুযোগ করে দিয়েছে। তাঁদের ফান্ডের উৎস বা সদস্যদের পরিচয় প্রকাশ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আরএসএস প্রক্সি বা ছদ্মনামের মাধ্যমে কাজ করলেও এই প্রক্সিগুলো ঠিক কী এবং তাদের সঙ্গে সংঘের সম্পর্ক কেমন, তা কখনোই স্পষ্ট করেনি।
প্রকৃতপক্ষে, আরএসএসের বিভিন্ন প্রচারপত্রে এই সংগঠনগুলোর বর্ণনায় এক গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়। যেমন, রাকেশ সিনহার ২০১৯ সালের বই ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং আরএসএস’-এ সংগঠনগুলোকে ‘সহযোগী’, ‘অঙ্গ’, ‘মুখপাত্র’ বা ‘সন্তান’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রতন শারদার বইয়েও তাদের ‘সংঘ অনুপ্রাণিত’, ‘সিস্টার অর্গানাইজেশন’ বা ‘সহযোগী সংগঠন’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সংঘ দ্বারা ‘পরিচালিত’ হয়।
এই অস্পষ্ট ভাষার কারণে সংঘ নিয়ে অধিকাংশ গবেষণা বা সাংবাদিকতা কেবল তাদের মতাদর্শ বা বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো দৃশ্যমান সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এর ফলে সংঘ কী বলে, তা নিয়ে আলোচনা হলেও তারা আসলে কী করে, সেই যান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি অজানাই থেকে গেছে। ফলে আরএসএসকে জবাবদিহি করতে হয় না।
এমনকি হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের মধ্যেও সব সংগঠন আরএসএসের অধীনে নয়। যেমন ইয়াতি নরসিংহানন্দের সঙ্গে আরএসএসের কোনো দৃশ্যমান যোগসূত্র নেই এবং তিনি প্রায়ই সংঘের সমালোচনা করেন। আরএসএস এই অস্বচ্ছতার সুবিধাগুলো খুব ভালো করেই জানে। এতে তারা আইনি জটিলতা এড়াতে পারে, কাজগুলো অন্যের মাধ্যমে করিয়ে দায় অস্বীকার করতে পারে এবং বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে বিভিন্ন ধরনের বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।
সংঘের এই রহস্যময়তা তাদের আকার সম্পর্কে একটি অতিরঞ্জিত ধারণা তৈরি করতেও সাহায্য করে। এটি এমন এক ধারণা দেয়, যেন আজকের হিন্দু ডানপন্থীদের রাজনৈতিক ক্ষমতা কোনো জৈবিক বা নিচুতলার স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানের ফসল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি একটি সুপরিকল্পিত আমলাতান্ত্রিক নেটওয়ার্কের ফসল।
ছয় বছর ধরে চালানো একটি বিশেষ তদন্তে দেখা গেছে, আরএসএস কোনো বিচ্ছিন্ন সংগঠন নয়, বরং এটি ২ হাজার ৫০০-এর বেশি সংগঠনের একটি সুসংবদ্ধ নেটওয়ার্ক। এই সংগঠনগুলো একই ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়, একই ঠিকানা ব্যবহার করে এবং তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি অর্থের লেনদেন হয়।
জম্মু-কাশ্মিরে আরএসএস
ক্যারাভানের গবেষণায় দেখা গেছে, জম্মুর আম্ফাল্লা এলাকার একটি ঠিকানায়ই আরএসএসের ২০টির বেশি সংগঠন রয়েছে। ১৯১৬ সালে এই জমি বেদ প্রচারের জন্য দেওয়া হলেও বর্তমানে এটি সংঘের একটি স্নায়ুকেন্দ্র। এখানে বৃদ্ধাশ্রম, গোশালা, অনাথ আশ্রম, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারি এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রাক্তনী সংগঠনের অফিস রয়েছে।
এখানে বৃদ্ধ ও অসহায়দের জন্য রয়েছে ‘হোম ফর দ্য এজড অ্যান্ড ইনফর্ম’। শিশুদের জন্য রয়েছে তিনটি পৃথক অনাথ আশ্রম—ছেলেদের জন্য ‘বেদ মন্দির বালনিকেতন’, মেয়েদের জন্য ‘বেদ মন্দির বালিকা নিকেতন’ এবং ‘কেসর বেন ভেলজি পোপাট ভবন’। এ ছাড়া স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের জন্য সেবা ভারতী পরিচালিত ‘জনক মদন গার্লস হোস্টেল’ এবং কাটরার ‘দিশা ছাত্রাবাস’-এর অফিসও এখান থেকেই পরিচালিত হয়।
বেদ পাঠের জন্য রয়েছে ‘মহারাজা প্রতাপ সিং বেদ বিদ্যালয়’ এবং অনাথ আশ্রমের শিশুদের জন্য ‘বেদ মন্দির পাঠশালা’। কারিগরি শিক্ষার জন্য রয়েছে ‘বেদ মন্দির ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার’। এছাড়া আরএসএসের শিক্ষা শাখা বিদ্যা ভারতীর আঞ্চলিক ইউনিট ‘ভারতীয় শিক্ষা সমিতি’-র অফিসও এই একই চত্বরে অবস্থিত। ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক চর্চার জন্য রয়েছে ‘শান্তি সাধনা আশ্রম’।
দাতব্য চিকিৎসার জন্য এখানে রয়েছে ‘স্বামী বিবেকানন্দ মেডিকেল মিশন’, একটি ‘হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারি’ এবং প্রাকৃতিক উপায়ে রোগ নিরাময়ের জন্য ‘ইনস্টিটিউট অব ন্যাচারাল হাইজিন’।
সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত ‘জম্মু কাশ্মীর সহায়তা সমিতি’ এবং সঙ্ঘের মূল সেবা শাখা ‘সেবা ভারতী’র জম্মু-কাশ্মীর অফিস এখানে অবস্থিত। এ ছাড়া রয়েছে তীর্থযাত্রীদের জন্য লজ পরিচালনাকারী ‘মাতা বৈষ্ণো লোক কল্যাণ সংস্থা’ এবং সঙ্ঘের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘ভারত বিকাশ পরিষদ’-এর জম্মু শাখা।
গো-রক্ষার জন্য রয়েছে ‘জম্মু ও কাশ্মীর গৌ রক্ষা সমিতি’। হিন্দু জাতীয়তাবাদী সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যদের জন্য কাজ করে আরএসএস অনুমোদিত ‘অখিল ভারতীয় পূর্ব সৈনিক সেবা পরিষদ’ এবং কারগিল যুদ্ধের বীরদের সহায়তায় নিয়োজিত এনজিও ‘জয় কারগিল জয় ভারত কোষ ট্রাস্ট’।
এই সংগঠনগুলোকে আলাদাভাবে দেখলে খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু একত্রে দেখলে আরএসএসের পরিকল্পনা ফুটে ওঠে। ১৯১৬ সালে ডোগরা রাজা প্রতাপ সিং বৈদিক শিক্ষার প্রসারে যে জমিটি দিয়েছিলেন, তা কালক্রমে সঙ্ঘের দখলে চলে যায়। বর্তমানে জম্মু-কাশ্মীরে সঙ্ঘের মোট সাংগঠনিক উপস্থিতির প্রায় অর্ধেকই এই একটি ঠিকানা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সংগঠনগুলো পরিচালনা করেন হাতেগোনা কয়েকজন ব্যক্তি, যারা একেকজন একাধিক সংগঠনের শীর্ষপদে রয়েছেন। প্রতিটি সংগঠনের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিরা আসলে আরএসএসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। যেমন, বেদ মন্দির বালনিকেতনের সভাপতি গৌতম মেঙ্গি, তিনি একই সঙ্গে জম্মুর আরএসএসের সংঘচালক বা সমন্বয়ক। এই নেটওয়ার্ক কেবল ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমেরিকা ও কানাডা থেকে আসা বিদেশি ফান্ডের সঙ্গেও যুক্ত।
এই বেদ মন্দির কমপ্লেক্স আসলে পুরো রাজ্যে আরএসএসের কাজের কেন্দ্রীয় বিন্দু। স্থানীয় প্রকাশনায় একে ‘কেশব ভবন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং এখানে মোহন ভগবতের মতো শীর্ষ নেতারা বৈঠক করেন। সংঘ একে একটি ‘অবিভক্ত হিন্দু পরিবার’ বললেও বাস্তবে এটি একটি কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্র, যেখানে একই মানুষ বিভিন্ন নামে একই কাজ করে যাচ্ছেন।
এই তদন্ত সংঘের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। সাতটি সংগঠন একই কাজ (স্কুল ও হোস্টেল চালানো) করছে এবং তারা অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ করছে। এই গোলকধাঁধা তৈরি করাই সংঘের লক্ষ্য।
যদি জম্মু-কাশ্মীরে সংঘের অর্ধেকের বেশি উপস্থিতি কেবল একটি নির্দিষ্ট ঠিকানা থেকেই পরিচালিত হয়, তবে তাদের তথাকথিত ‘স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ’-এর তত্ত্বটি পুনরায় বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমাদের বুঝতে হবে যে, এটি কোনো জাদুর মতো তৈরি হওয়া নেটওয়ার্ক নয়, বরং একটি পরিকল্পিত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সংঘকে বুঝতে হলে আমাদের এই সুক্ষ্ম নেটওয়ার্কের গভীরে প্রবেশ করতে হবে।
ক্যারাভান সংঘের আন্তসংযোগগুলো নিয়ে অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছে, জম্মুর বেদ মন্দির কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। জম্মুর ঘটনা সংঘের ৪৬টি রাজ্যের প্রায় সবগুলোর বেলায়ই প্রযোজ্য। প্রতিটি প্রদেশ বা ‘প্রান্ত’ একদল আমলাতান্ত্রিক পদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যাদের নেতৃত্বে থাকেন প্রচারক, কার্যবাহ ও সংঘচালক। প্রতিটি প্রান্তের নিজস্ব সহযোগী সংগঠন রয়েছে; যেমন পাঞ্জাবে বিদ্যা ভারতী হয়ে যায় ‘সর্বহিতকারী শিক্ষা সমিতি’, কর্ণাটকে সেবা ভারতী পরিচিত হয় ‘হিন্দু সেবা প্রতিষ্ঠান’ নামে এবং ঝাড়খন্ডে বনবাসী কল্যাণ আশ্রম কাজ করে ‘বনবাসী কল্যাণকেন্দ্র’ হিসেবে।
এই সহযোগী সংগঠনগুলোর প্রতিটিকে আবার নতুন নতুন শাখা সংগঠন তৈরি করতে উৎসাহিত করা হয়, যারা পরে নিজস্ব আরও শাখা খোলে। ক্যারাভান উত্তরাখন্ডের সিতারগঞ্জের একটি ছোট হোস্টেল ‘বরাহ রানা স্মারক ছাত্রাবাস’-এর উৎস খুঁজতে গিয়ে তিনটি ধাপ পেরিয়ে আরএসএসের সন্ধান পেয়েছে। এই হোস্টেল ‘বরাহ রানা স্মারক সমিতি’ দ্বারা পরিচালিত, যা মূলত ‘সেবা প্রকল্প সংস্থান’ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এই সংস্থান আবার বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের প্রাদেশিক ইউনিট, যা আরএসএসের স্বীকৃত তিন ডজন সংগঠনের একটি। একটি বিস্তৃত সিভিল সোসাইটি নেটওয়ার্ক তৈরির এই পদ্ধতি সাধারণ রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক থেকে একেবারেই আলাদা। এটি বিদ্যমান সংগঠনগুলোর সঙ্গে জোট তৈরির বদলে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অধীনে থেকে নতুন নতুন সংগঠন জন্ম দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রভাষক ফেলিক্স পাল বলেন, ‘আমি একে ‘‘সাংগঠনিক ব্যাপন’’ হিসেবে অভিহিত করেছি, যা প্রক্সি বা ছদ্মনামী সংগঠনের মাধ্যমে একটি সূক্ষ্ম কর্মবণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলে।’
সীমানা ছাড়িয়ে
এই সাংগঠনিক বিস্তৃতি সংঘের জন্য একটি ‘স্নোবল ইফেক্ট’ বা ক্রমবর্ধমান প্রভাব তৈরি করে। নেটওয়ার্কটি ক্রমাগত প্রসারিত হলেও তা সংঘের কর্তৃত্বের অধীনে থাকে। বেঙ্গালুরুতে ‘অভ্যুদয়’ বা ‘কেশব কৃপা সংবর্ধনা সমিতি’ একই ঠিকানায় ‘ইউথ ফর সেবা’, ‘বিদ্যা চেতনা’ এবং স্থানীয় ‘সেবা ভারতী’র সঙ্গে অফিস শেয়ার করে। আকোলার ‘আদর্শ সংস্কার মণ্ডল’ তাদের অফিস শেয়ার করে ‘ডক্টর হেডগেওয়ার রক্তপেড়ি’র সঙ্গে। কখনো কখনো এই সংযোগ একেবারেই স্পষ্ট; যেমন চিন্না ভান্ডারা জনাকাম্মা সঞ্জীব রাও এডুকেশনাল চ্যারিটেবল পাবলিক ট্রাস্ট বা দেশা সেবা সমিতি কাদাতানাদ সরাসরি স্থানীয় আরএসএস কার্যালয়ের ভেতর থেকেই কাজ পরিচালনা করে।
আশ্চর্যজনকভাবে এই ধরন হাজার হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনেও একই রকম। সেখানে ‘স্টার পাইপ প্রোডাক্টস’-এর একটি গুদামঘর ‘কেশব স্মৃতি’ নাম ধারণ করেছে, যার মালিক যুক্তরাষ্ট্রে আরএসএসের একটি প্রভাবশালী পরিবার ‘ভুটাদা’। এই কেশব স্মৃতি হলো আরএসএসের বিদেশি শাখা ‘হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ’ বা এইচএসএসের দক্ষিণ-পশ্চিম হিউস্টন অফিস। রমেশ ভুটাদা দীর্ঘকাল ধরে এইচএসএসের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই ঠিকানা আবার ‘ভিএইচপি অব আমেরিকা’র সদর দপ্তর হিসেবেও তালিকাভুক্ত, যা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বৃহত্তম হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীকে আসলে একটিই অভিন্ন সত্তা হিসেবে প্রমাণ করে।
তাদের ঠিকানার জট আরও গভীর। ৪০১৮ ওয়েস্টহলো পার্কওয়ে আরও অন্তত অর্ধডজন গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহৃত হয়; যার মধ্যে রয়েছে স্বামী বিবেকানন্দ যোগ অনুসন্ধান সংস্থান বা এসভিওয়াইএএসএ, ‘হিন্দুস অব গ্রেটার হিউস্টন’-এর সদর দপ্তর এবং এইচএসএস ও ভিএইচপির বিভিন্ন যুব ক্যাম্প। এমনকি ‘সেবা ইন্টারন্যাশনাল’, যা সাধারণ দাতাদের কাছ থেকে লাখ লাখ ডলার অনুদান সংগ্রহ করে (যার মধ্যে ২০২১ সালে টুইটার নির্বাহী জ্যাক ডরসির দেওয়া ২৫ লাখ ডলারের অনুদানও রয়েছে), সেই সংস্থাও এই একই ঠিকানা ব্যবহার করে ভারতের সংঘের কাছে অর্থ পাঠায়। ভুটাদা পরিবারের প্রভাব ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত। রাজকোটে তাদের মালিকানাধীন ‘স্টার পাইপ ফাউন্ড্রি’ আরএসএস-সংশ্লিষ্ট থিংকট্যাংক ‘ভিশন ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’-এর অন্যতম প্রধান স্পনসর। এ ছাড়া তাদের অর্থ মার্কিন রাজনীতিতে ‘হিন্দু আমেরিকান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি’ (হাপাক)-এর মাধ্যমেও ব্যয় হয়, যা সংঘঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদদের সহায়তা করে।
ভুটাদা পরিবারের এই প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্রের একক কোনো উদাহরণ নয়। সংগৃহীত তথ্য বলছে, প্রচারকদের মতো গুটিকয়েক ব্যক্তিই এই বিশাল প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করেন। যেমন ‘ভারতীয় মজদুর সংঘ’-এর (বিএমএস) অস্তিত্বের মূলে রয়েছেন প্রচারক দন্তোপন্ত থেঙ্গাদি। কেরালায় প্রচারক পি পরমেশ্বরন পঁচিশ বছর ধরে ‘বিবেকানন্দ কেন্দ্র’ পরিচালনা করেছেন এবং সংঘের মুখপাত্র ‘কেশরী’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠায় মূল ভূমিকা রেখেছেন।
‘সংঘ সমাজ বনেগা’
এসব উদাহরণ এবং তাদের গভীর সংযোগগুলো একটি অভিন্ন সত্য উন্মোচন করে, সংঘ বরাবরই একটি রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে কাজ করেছে, যদিও এর নেতৃত্ব সব সময় বিপরীত দাবি করে এসেছে। নাম থেকে শুরু করে নেতৃত্ব ও বিদেশি অর্থায়ন, সব ক্ষেত্রেই সংঘের ছাপ স্পষ্ট। আরএসএস নিজেও জানে, তারা আসলে কী। তাদের অভ্যন্তরীণ প্রকাশনাগুলোতে বারবার বলা হয়েছে, এই সমস্ত সহযোগী গোষ্ঠী আরএসএস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সংঘ নিজেকে সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখে, যেখানে সংখ্যালঘু বা ‘বিদেশিরা’ হলো একধরনের ‘অস্বাভাবিক’ উপাদান, যাদের বর্জন করা প্রয়োজন। গোলওয়ালকর বা হেডগেওয়ারের মতো নেতারা সব সময় চেয়েছেন সংঘ যেন সমাজের ভেতরের কোনো সংগঠন না হয়ে স্বয়ং সমাজেই রূপান্তরিত হয়। ‘সংঘ সমাজ বনেগা’—এই মূলনীতির মাধ্যমেই তারা একটি সংগঠিত হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পথে এগোচ্ছে। যখন সমগ্র সংঘ নেটওয়ার্ককে একটি একক সাংগঠনিক ইউনিট হিসেবে দেখা হয়, তখনই এর প্রকৃত শক্তি ও কর্মপদ্ধতি বোঝা সম্ভব হয়।
ক্যারাভান আরএসএসের মানচিত্র তৈরির বদলে সংগঠনটির সেসব বস্তুগত ও সাংগঠনিক সংযোগের মানচিত্র তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বজায় রাখে। কেননা, কট্টর ডানপন্থীদের শনাক্ত করতে কেবল তাদের প্রকাশ্যে ঘোষিত মতাদর্শ যথেষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, জম্মুর বেদ মন্দির কমপ্লেক্সের অধিকাংশ সংগঠনই হয়তো কেবল মতাদর্শিক লিটমাস টেস্টে উগ্রপন্থী হিসেবে ধরা পড়বে না, কিন্তু বাস্তবে তারা সবাই আরএসএসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশেই পরিচালিত হয়।
গবেষক দল মতাদর্শের পরিবর্তে বস্তুগত সম্পর্কের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। তাঁরা সংগঠনের কর্মী, স্থাবর সম্পদ, অর্থায়ন ও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। সংঘের স্বীকৃত সংগঠনগুলোর নথিপত্র, আত্মজীবনী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ঘেঁটে তাঁরা অসংখ্য ছদ্মনামী বা দ্বিতীয় স্তরের সংগঠনের সন্ধান পেয়েছেন। এই তথ্যগুলো নিশ্চিত করতে তাঁরা সরকারি নথি, আর্থিক বিবরণী এবং সংঘের নিজস্ব প্রকাশনার সাহায্য নিয়েছেন। কোনো একটি সংগঠন সংঘের মূল কাঠামোর সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত, তা নির্ধারণ করতে গবেষকেরা একটি বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি তৈরি করেছেন। সেখানে সংগঠনের বিবৃতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে একই ব্যক্তি একাধিক সংগঠনে আছেন কি না, একই অফিস ব্যবহার করা হচ্ছে কি না এবং তাদের মধ্যে আর্থিক লেনদেন কীভাবে হচ্ছে।
ফরিদাবাদের দনি পোলো ছাত্রাবাসের উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, সেখানে গোলওয়ালকর বা হেডগেওয়ারের ছবি থাকা এবং সংঘের নেতাদের নিয়মিত যাতায়াত প্রমাণ করে যে, এটি সংঘের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একইভাবে মালয়েশিয়ার হিন্দু সেবাই সঙ্গম নামের একটি সংগঠনকে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও তাদের কার্যবাহ বা সংঘচালক পদবির ব্যবহার এবং সংঘের আদলে শাখা পরিচালনার তথ্য থেকে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন, এটি আসলে হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘেরই একটি রূপ। ডক্টর আবাজী থাত্তে সেবা ও অনুসন্ধান সংস্থার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, এর শীর্ষ কর্মকর্তারা সংঘের উচ্চপদস্থ নেতা এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরাও তাঁদের অনুষ্ঠানে অংশ নেন, যা এর সংঘসংশ্লিষ্টতাকে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করে।
ক্যারাভানের গবেষণায় আরএসএসের সঙ্গে যুক্ত ২ হাজার ৫০০টি সংগঠনের সন্ধান পাওয়া গেছে। সংঘের এই কাঠামো মূলত একটি কেন্দ্র ও প্রান্তিক মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কেন্দ্রের দিকে রয়েছে বিজেপি, ভিএইচপি বা সেবা ভারতীর মতো প্রভাবশালী সংগঠনগুলো এবং বিশাল অঙ্কের ফান্ড সংগ্রহকারী এনজিওগুলো। সংঘের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের নেপথ্যে মূল কারিগর হলেন প্রচারকেরা, যাঁরা কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সংঘের সিদ্ধান্তগুলো তৃণমূলের বিভিন্ন শাখায় বাস্তবায়ন করেন।
চার স্তরের কাঠামো
সংঘের মূল লক্ষ কেবল শাসনভার দখল নয়, বরং ভারতীয় সমাজের আমূল রূপান্তর ঘটানো। সংঘের এই বিচিত্র সংগঠনগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমটি হলো ক্যাডার সংগঠন, যেমন আরএসএস, এবিভিপি বা বজরং দল, যারা মাঠপর্যায়ে জনবল জড়ো করে আন্দোলন বা প্রচার চালায়। দ্বিতীয়টি হলো সমন্বয়কারী সংগঠন, যেমন বিদ্যা ভারতী বা সেবা ভারতী, যারা আমলাতান্ত্রিক কর্মবণ্টনের মাধ্যমে তথ্য ও অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। এই মধ্যস্থতাকারী সংগঠনগুলো না থাকলে সংঘের প্রায় অর্ধেক অংশই মূল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। তৃতীয়ত রয়েছে ক্যাম্পেইন সংগঠন, যেগুলো কোনো সুনির্দিষ্ট ইস্যু বা আইন পরিবর্তনের জন্য সাময়িকভাবে তৈরি করা হয় এবং কাজ শেষে বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়।
চতুর্থত সংঘ ফ্রন্ট বা ছদ্মবেশী সংগঠনের মাধ্যমে কৌশলী প্রতিলিপি তৈরি করা হয়। যেখানে মূল সংগঠনের সঙ্গে তাদের কোনো পার্থক্য থাকে না। শুধু আইনি সুবিধা বা পরিচিতির প্রয়োজনে আলাদা নাম ব্যবহার করা হয়। এর বাইরে রয়েছে অত্যন্ত গোপন সংগঠন, যারা আরএসএসের উগ্রবাদী বা বিতর্কিত কাজগুলো সম্পন্ন করে, যাতে মূল সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়। সবশেষে আরএসএসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কিছু প্রদর্শনী বা শো-পিস সংগঠন, যেগুলো মূলত সংঘের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে এবং সমাজের সব স্তরে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হয়।
‘শো-পিস’ অঙ্গসংগঠন
প্রদর্শনী বা ‘শো-পিস’ সংগঠনগুলোর প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো সংঘ সম্পর্কে বিশেষ একটি ধারণা তৈরি করা। এই সংগঠনগুলো প্রায়শই ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত অগভীর। সংঘের বিরুদ্ধে জাতিভেদ প্রথা, সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দু আধিপত্যবাদের যে অভিযোগ রয়েছে, তা খণ্ডন করতে এবং আরও বেশি মানুষকে নিজেদের বলয়ে টানতেই এগুলো তৈরি করা হয়। যেমন ১৯৮১ সালে মীনাক্ষীপুরমে দলিতদের ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৮৩ সালে ‘সামাজিক সমরসতা মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একইভাবে শিখধর্মের সঙ্গে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সামঞ্জস্য প্রমাণের জন্য ১৯৮৬ সালে বিধ্বংসী শিখবিরোধী সহিংসতার পর ‘রাষ্ট্রীয় শিখ সঙ্গত’ গঠন করা হয়। আবার ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার মাত্র কয়েক মাস পরেই ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মূলত একটি ভাবমূর্তি রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এটি বোঝাতে যে, আরএসএস আসলে মুসলমানদের ঘৃণা করে না।
আরএসএস নেটওয়ার্কের মধ্যে এই শো-পিস সংগঠনগুলোর অবস্থান অনেকটা সসীম, অর্থাৎ অন্য অনেক সংগঠনের মতো এগুলো থেকে নতুন কোনো শাখা সংগঠন জন্ম নেয় না। এগুলো সাধারণত আরএসএসের সরাসরি সন্তানতুল্য সংগঠন এবং এখানে শক্তিশালী ‘প্রচারক’ উপস্থিত থাকেন। বড় কোনো সাংগঠনিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে এই প্রদর্শনী সংগঠনগুলোকে দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, দুই দশক আগে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চের বাইরে সংঘের মুসলিমসংশ্লিষ্টতা আর না বাড়ার বিষয়টি প্রমাণ করে, এটি সংঘের কাছে আসলে নগণ্য।
গবেষণায় একগুচ্ছ ‘প্রশিক্ষণ সংগঠন’ও চিহ্নিত করা হয়েছে। শতবর্ষ আগে প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ হিসেবে সংঘ প্রচারিত হয়ে আসছে। এটি মূলত মানুষের শারীরিক গঠন, স্বভাব, বিশ্বাস ও পরিচয়কে হিন্দু রাষ্ট্রের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার একটি প্রক্রিয়া। বিষয়টি আলোচিত হলেও আরএসএস কেবল একা এই কাজ করে না; সংঘ এমন অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করেছে, যেগুলো সাধারণ মানুষকে সংঘে ঢোকায় এবং প্রসারের যন্ত্র হিসেবে কাজ করে। ‘রামভাউ মহালগি প্রবোধিনী’ রাজনৈতিক নেতা তৈরি করে, ‘সেন্ট্রাল হিন্দু মিলিটারি এডুকেশন সোসাইটি’ তৈরি করে সংঘী সৈনিক, যাতে ভবিষ্যতে তাঁরা সংঘী জেনারেল হতে পারেন। আবার ‘স্বামী বিবেকানন্দ যোগ অনুসন্ধান সংস্থান’ এমন যোগ শিক্ষক তৈরি করে, যাঁরা সারা বিশ্বে হিন্দু জাতীয়তাবাদী যোগব্যায়ামের ‘সফট পাওয়ার’ ছড়িয়ে দিতে পারেন।
থিংকট্যাংক
এই প্রশিক্ষণ সংগঠনগুলোর পাশেই রয়েছে ‘জ্ঞান উৎপাদনকারী সংগঠন’, যারা এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সংঘের অন্যান্য সংগঠনের কর্মকাণ্ড বৈধতা পায়। যেমন ‘ফোরাম ফর ইন্টিগ্রেটেড ন্যাশনাল সিকিউরিটি’, ‘জম্মু কাশ্মীর স্টাডি সেন্টার’ ও ‘বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন’ জাতীয় নিরাপত্তার বিভিন্ন নীতি নিয়ে কাজ করে।
দ্য ক্যারাভানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন কাশ্মীরে সামরিক হস্তক্ষেপের বিস্তারিত প্রস্তাবনা প্রকাশ করে। পরে সরকারি কর্মকর্তারা ওই অঞ্চলকে সংযুক্ত করার যৌক্তিকতা হিসেবে ওই প্রস্তাবনা ব্যবহার করেন।
এই শ্রেণির মধ্যে গবেষকেরা সংঘের বিভিন্ন থিংকট্যাংক ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছেন। ‘দীনদয়াল শোধ সংস্থান’ ও ‘সেন্টার ফর পলিসি স্টাডিজ’ অর্থনৈতিক ও গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে; ‘ভারতীয় বিচার কেন্দ্র’ কাজ করে সভ্যতার অর্জন নিয়ে। এ ছাড়া জেন্ডার ইস্যু নিয়ে ‘দৃষ্টি স্ত্রী অধ্যয়ন প্রবোধন কেন্দ্র’, শিক্ষা নিয়ে ‘সংবিত রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ এবং আদিবাসী বিষয় নিয়ে ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর কালচারাল স্টাডিজ’ কাজ করে থাকে। প্রায়শই এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ সংঘের বিরুদ্ধে ওঠা সেই সমালোচনার জবাব হিসেবে দেখা হয়—যেখানে বলা হয় যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের কোনো বড় বুদ্ধিজীবী নেই বা তারা কেবল অশিক্ষিত লোকদেখানো ভিড়। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বা ২০০০-এর দশকের শুরুতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ঠিক যখন সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার দায়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তীব্র সমালোচনার মুখে ছিল।
সবশেষে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংঘের ‘লাস্ট-মাইল’ সংগঠনগুলো, যা আরএসএসের সম্পদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার চূড়ান্ত সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। এগুলো হলো ছোট ছোট চক্ষু ক্লিনিক, ব্লাড ব্যাংক, গ্রামের স্কুল, অনাথ আশ্রম বা কুষ্ঠ নিরাময় কেন্দ্র। আরএসএস যে সম্প্রদায়গুলোর কাছে পৌঁছাতে চায়, এই সংগঠনগুলো সেখানেই সেবা দেয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক বিস্তৃতি এবং তাদের দেওয়া প্রয়োজনীয় সেবার কারণে আরএসএসের পক্ষে খুব সহজেই বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
আরএসএসের নেটওয়ার্ক কাঠামোতে এগুলো মূলত প্রান্তিক পর্যায়ে থাকে এবং এগুলো কোনো শক্তিশালী মতাদর্শিক আবহে কাজ না করে বরং অত্যন্ত নিরীহ ও স্বাভাবিক পন্থায় নতুন সমর্থকদের জন্য সংঘের বিশাল নেটওয়ার্কে ঢোকার পথ তৈরি করে দেয়। তৃণমূল পর্যায়ের এই সেবা আরএসএসের আত্মপরিচয় ও প্রচারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে এগুলো ধর্মান্তরকরণ এবং মনস্তাত্ত্বিক কন্ডিশনিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবেও কাজ করে। উল্লেখ্য যে, প্রবাসী সংঘীদের পাঠানো অনুদান বা চ্যারিটি ফান্ডের একটি বড় অংশ এই সংগঠনগুলোর মাধ্যমেই প্রবাহিত হয়।
কয়েক দশক ধরে আরএসএস সম্পর্কে দুটি সমান্তরাল ধারণা প্রচলিত ছিল। প্রথমটি অনুযায়ী, আরএসএসের বিভিন্ন অংশ কেবল একটি সাধারণ মতাদর্শিক লক্ষ্যে বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করে এবং আরএসএস কেবল বিভিন্ন সংগঠনকে ‘অনুপ্রেরণা’ দেয়। দ্বিতীয় ধারণা অনুযায়ী, আরএসএস আসলে কোনো দৃশ্যমান মতাদর্শের চেয়েও একটি সুসংবদ্ধ আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ই প্রধান কাজ। এই দ্বিতীয় ধারণায় আরএসএস বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সামনে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করলেও এটি পরিষ্কার যে, এসব রূপের রহস্য এক এবং একক অস্তিত্ব বজায় রাখতে আরএসএস প্রচুর সম্পদ ব্যয় করে।
মনে রাখা প্রয়োজন, আরএসএস নিজেই এই দুটি ধারণাকে উৎসাহিত করেছে। তবে কৌশলটি হলো, একটি কাঠামো বারবার জনসাধারণের সামনে তুলে ধরা হয় আর অন্যটি কেবল সংঘের অভ্যন্তরীণদের জন্য সংরক্ষিত থাকে।
ভারতীয় ম্যাগাজিন ‘দ্য ক্যারাভান’ থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ