ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও তেলের বাজারের অস্বাভাবিক ওঠানামা নিয়ে উদ্বেগজনক এক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, এই পরিস্থিতিতে গোপন রাষ্ট্রীয় তথ্য ব্যবহার করে বিপুল অর্থ লাভের ঘটনা ঘটতে পারে, যা শুধু ইনসাইডার ট্রেডিং নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের শামিল।
বিশ্লেষণধর্মী গণমাধ্যম ‘স্লেট’-কে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ক্রুগম্যান বলেন, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে একধরনের ‘দ্বৈত অবস্থান’ নেন। প্রথমে তিনি হুমকি দেন, হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করা হবে। এ জন্য তিনি ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমাও নির্ধারণ করেন। কিন্তু সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসেন। সরে আসার ঠিক আগমুহূর্তে তেলের বাজারে অস্বাভাবিক লেনদেনের উল্লম্ফন দেখা যায়, যা ক্রুগম্যানের মতে সন্দেহজনক।
ক্রুগম্যান ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে এমন পরিস্থিতিতে কেউ বিপুল অর্থ আয় করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যদি কেউ আগেভাগে জেনে যায়, বড় কোনো ঘোষণা আসছে, তাহলে সে উচ্চ দামে তেলের ফিউচার বিক্রি করে পরে কম দামে কিনে নিতে পারে। এতে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কোটি কোটি ডলার লাভ করা সম্ভব। তাঁর ধারণা অনুযায়ী, প্রায় ৫৮০ মিলিয়ন ডলারের লেনদেনে যদি ১০ শতাংশ মূল্য ওঠানামা ঘটে, তাহলে অন্তত ৫৮ মিলিয়ন ডলার লাভ করা সম্ভব।
ক্রুগম্যানের মতে, এই ধরনের লেনদেন প্রমাণ করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তিনি বলেন, যথাযথ তদন্ত এবং আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করলে ব্রোকারদের মাধ্যমে লেনদেনকারীদের পরিচয় বের করা সম্ভব। তবে বাস্তবে এসব তদন্ত সব সময় হয় না; বিশেষ করে যদি রাজনৈতিক প্রভাব থাকে।
এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, এটি শুধু ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের বিষয় নয়। কারণ, এখানে যে তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত সংবেদনশীল জাতীয় নিরাপত্তা-সম্পর্কিত। কোনো করপোরেট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্যের চেয়ে এই তথ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই ধরনের তথ্য ব্যবহার করে লাভ করা আসলে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য বিক্রির কাছাকাছি।
ক্রুগম্যান আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বৈশ্বিক শক্তিগুলো; যেমন রাশিয়া, সৌদি আরব বা চীন—এই ধরনের বাজারের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তাঁর মতে, বড় অঙ্কের এমন হঠাৎ লেনদেন অনেক সময় আগেভাগেই বড় কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিতে পারে, যা কোনো সরকারি ঘোষণার চেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য হতে পারে।
ক্রুগম্যান মনে করেন, এই ঘটনার পেছনে সরাসরি হোয়াইট হাউসের কেউ জড়িত না-ও থাকতে পারে; বরং ক্ষমতার কাছাকাছি কেউ গোপন এসব তথ্য আর্থিক বাজারের বড় কোনো খেলোয়াড়ের কাছে পাচার করেছে, এমন সম্ভাবনা বেশি।
সবশেষে ক্রুগম্যান বলেন, এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করা কঠিন হলেও এর প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শক্তিশালী। মাত্র ১৫ মিনিট আগে বিপুল অঙ্কের লেনদেন হওয়া নিছক কাকতালীয় হতে পারে, তবে সেটি যেমন অস্বাভাবিক, তেমনি সন্দেহজনকও। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক ঘটনা, যা ‘ঘটতে পারে, কিন্তু হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম’—আর সেখানেই মূল উদ্বেগ।