হোম > বিশ্লেষণ

তেল সরবরাহে ইরানি বাধা যেভাবে ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

তেল সরবরাহে ইরানি বাধার কারণে ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ছবি: অ্যাক্সিওস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপদেষ্টারা সতর্ক করেছেন, যদি ইরান সরকার হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল করে দিতে পারে এবং তেলের দাম ট্রাম্পের সহনসীমার বাইরে ঠেলে দেয়, তাহলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, ‘ইরান যদি হরমুজ প্রণালি নিয়ে এমন ঝামেলা করে, তাহলে ট্রাম্প আরও অনড় হয়ে যাবেন।’

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, নৌবাহিনী এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলো ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করেন। তবে এখন যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্যের মতোই তেলের বাজারও তাঁর চিন্তার বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ব্রিফিংগুলো দেখেন। সংখ্যাগুলো দেখেন। আর সামরিক দিক থেকে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট।’ তিনি আরও বলেন, তবে ‘তেলের বিষয়টা আলাদা। কেউ আতঙ্কিত নয়, কিন্তু এটা উদ্বেগের বিষয়। তিনি সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তেলের ঘাটতি নেই। সমস্যা হলো সেটাকে বাজারে আনা।’

ট্রাম্প প্রকাশ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বাস্তবিক ঝুঁকি এবং যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব—দুটোকেই ছোট করে দেখিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় পদক্ষেপও নিচ্ছেন। গতকাল বুধবার তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি তেল মজুত ছাড়ার উদ্যোগ সমন্বয় করেন। বিশ্বজুড়ে মোট ৪০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুত (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ) থেকে ছাড়ানো হচ্ছে ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল।

ট্রাম্প একই সঙ্গে পরিকল্পনা করছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নৌবাহিনীর নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি এসব জাহাজের জন্য বীমা ব্যবস্থাও করা হবে। কারণ ঝুঁকি বিবেচনা করার সময় জাহাজ মালিকদের জন্য বীমা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

পরিস্থিতির জরুরি মাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে বুধবার সন্ধ্যায়, যখন পারস্য উপসাগরে দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটে। ইরাকের জলসীমায় একটি জাহাজে ভয়াবহ আগুন লাগার ভিডিও দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। রয়টার্স ইরাকের রাষ্ট্রীয় বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকাশ করা স্থিরচিত্র প্রকাশ করে, যেখানে একটি জাহাজকে আগুনে জ্বলতে দেখা যায়।

ট্রাম্প প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৫০ ডলারের আশপাশে রাখতে পছন্দ করেন। তবে তেল শিল্প চায় দাম অন্তত ৬০ ডলারের নিচে না নামুক। ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও বুধবার রাতে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর আগে সপ্তাহের শুরুতে তা ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল।

ইরান হুমকি দিয়েছে, তারা তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলার পর্যন্ত ঠেলে দিতে পারে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এতে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ৫ ডলার হয়ে যেতে পারে। বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পারস্য উপসাগর দিয়ে পরিবহন করা হয়। এর সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন ও ভারত। তবে এই সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে এর প্রভাব বিশ্বের প্রায় সব বড় অর্থনীতিতে পড়বে।

তেলের বাজারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার ইরানের প্রচেষ্টা মূলত বৈশ্বিক চাপ বাড়ানোর কৌশল। যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া বোমা হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এ পর্যন্ত উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলা উল্টো ওই অঞ্চলকে ইরানের বিরুদ্ধে একজোট করেছে। বুধবার জাতিসংঘে ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানিয়ে আনা প্রস্তাবে রেকর্ড ১৩৫টি দেশ সহ-প্রস্তাবক হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত অনুমোদন হার ঐতিহাসিক নিম্নস্তরের কাছাকাছি রয়েছে। আর জ্বালানির দাম—যা একসময় ট্রাম্পের অর্থনৈতিক সাফল্যের বড় প্রতীক ছিল—এখন তার জন্য সবচেয়ে দৃশ্যমান রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

ট্রাম্পের আরেক উপদেষ্টা বলেন, ‘এ পর্যন্ত অভিযানের সাফল্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট বেশ আশাবাদী। তার বিশ্বাস, সবকিছু শেষ হয়ে লক্ষ্য পূরণ হলে দেশ বুঝতে পারবে তিনি ঠিকই ছিলেন—সব সময়ের মতোই।’ জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে ওই উপদেষ্টা বলেন, ট্রাম্প ‘দামের এই উল্লম্ফনে মোটেও বিস্মিত নন, তিনি পুরোপুরি এটি প্রত্যাশা করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘হোয়াইট হাউসের অনেকের মতোই তিনি সত্যিই বিশ্বাস করেন, যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে—এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই যথেষ্ট সময় ধরে তা কম থাকবে, ফলে এটি কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে না।’ ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি—যিনি ফোনে তার সঙ্গে কথা বলেছেন—বলেন, ‘আমি বলব না যে তিনি কোনো প্রস্থান কৌশল খুঁজছেন। তবে তিনি চান না, এই যুদ্ধ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দীর্ঘ হোক।’

ইরান যুদ্ধ কি ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান থামিয়ে দেবে

চারদিকে শত্রু নিয়ে ট্রাম্পের যুদ্ধে কত দিন টিকবে ইরান

মোজতবা খামেনির উত্থান: রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব নাকি কঠোর শাসনের ধারাবাহিকতা

ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের পতনে জন্ম নিতে পারে ‘আইআরজিস্তান’

যেসব লক্ষ্য পূরণ হলে ইরান যুদ্ধ থামাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র

যেভাবে ‘আহত ইরান’ হয়ে উঠতে পারে আরও ভয়াবহ

যে ফাঁদ এড়িয়ে হাজার বছর টিকে ছিল বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য, ইরানে সেই ফাঁদে ট্রাম্প

ইরানের পর ট্রাম্পের কিউবা দখলের খায়েশ, খেসারত দিতে হবে খোদ আমেরিকাকেও

মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে, কিম কি এখন দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করবেন

তেলের দামের লাগাম হারাচ্ছেন ট্রাম্প, বিপদে পড়বে এশিয়ার দেশগুলো