হোম > বিশ্লেষণ

নতুন স্বার্থ হাসিল নয়, ইরানের পরাজয় ঠেকাতে কাজ করছেন এরদোয়ান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ছবি: আল-জাজিরা

ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু হওয়ার পর থেকে আঙ্কারার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে ইরানের সঙ্গে তুরস্কের ৩৩০ মাইলের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, অপরদিকে দেশটি ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ফলে এই যুদ্ধে এক জটিল অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে তুরস্ক। প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিতে হচ্ছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের তুরস্ক প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা ডেফনে আরসালানের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তুরস্ক এই যুদ্ধ থেকে কোনো নতুন স্বার্থ হাসিলের চেয়ে বরং আসন্ন বিপদগুলো ঠেকানোর চেষ্টা করছে।

তুরস্কের জন্য বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম হলো নতুন এক শরণার্থী সংকট। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৩৫ লক্ষ সিরীয় শরণার্থী অবস্থান করছে এবং চলতি বছরের শুরু থেকেই তুরস্কের অর্থনীতি ৩১ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চাপে জর্জরিত। এই অবস্থায় ইরান থেকে যদি কয়েক লক্ষ নতুন শরণার্থী তুরস্কের দিকে আসতে শুরু করে, তবে তা দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্য এক চরম অস্তিত্ব সংকটে পরিণত হবে। আঙ্কারার নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ইতিমধ্যে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে, কারণ তারা জানে যে একবার শরণার্থী প্রবেশ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

নিরাপত্তা ঝুঁকির আরেকটি বড় দিক হলো কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ। তুরস্কের আশঙ্কা, তেহরানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে উত্তর-পশ্চিম ইরানে পিজেএকে-এর মতো সশস্ত্র কুর্দি গোষ্ঠীগুলো নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে। এটি সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলের মতো আরেকটি অস্থিতিশীল ফ্রন্ট তৈরি করতে পারে, যা তুরস্কের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই তুরস্কের ঘোষিত লক্ষ্য হলো ইরানের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং কোনোভাবেই যেন দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বা নৈরাজ্য ছড়িয়ে না পড়ে সেটি নিশ্চিত করা।

অর্থনৈতিকভাবে তুরস্ক ইরানের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। বিশেষ করে তুরস্কের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ ইরান থেকে সরবরাহ করা হয়। যুদ্ধের কারণে তাবরিজ-আঙ্কারা পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া মানেই তুরস্কের শিল্প ও আবাসিক খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় তুরস্কের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং লিরার মানের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে তুরস্ক শুরু থেকেই একটি কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আসছে।

কূটনৈতিক ময়দানে তুরস্ক বর্তমানে এক কঠিন ভারসাম্যের খেলা খেলছে। ন্যাটো সদস্য হিসেবে তাঁরা মার্কিন স্বার্থের অংশীদার হলেও আঙ্কারা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, দেশটির ইনজিলিক বা কুরেচিক বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে প্রতিবেশীদের ওপর কোনো আক্রমণ চালাতে দেওয়া হবে না। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে কথা বলেছেন এবং নিজেকে একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তুরস্কের লক্ষ্য হলো আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে একটি ‘ব্যাক-চ্যানেল’ হিসেবে কাজ করা, যাতে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী না হয়।

তাই এটি স্পষ্ট যে, তুরস্ক এই যুদ্ধ থেকে কোনো ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেয়ে বরং নিজের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই বেশি আগ্রহী। ইরানের শাসনব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন বা অস্থিতিশীলতা তুরস্কের জন্য কোনো সুসংবাদ নয়। বরং তারা একটি স্থিতিশীল কিন্তু নিয়ন্ত্রিত ইরান চায়, যার মাধ্যমে এই অঞ্চলে তুরস্কের কূটনৈতিক নেতৃত্ব বজায় থাকে। তবে যুদ্ধের মোড় কোন দিকে যায় এবং ওয়াশিংটন আঙ্কারার ওপর কতটা চাপ প্রয়োগ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে তুরস্কের আগামী দিনের রাজনৈতিক ভাগ্য।

আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

বল এখন ইরানের আম জনতার কোর্টে, তাঁরা কি পারবেন ইতিহাস গড়তে

‘লিবিয়া মডেল’ কাজ করছে না ইরানে, বুমেরাং হলো খামেনি হত্যা

যুদ্ধে ইরান হারলে কপাল পুড়বে পুতিনেরও

যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের চোরাবালিতে আটকে রাখতে চায় চীন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে হামলায় কী অর্জন করতে চায় ইরান, যুদ্ধ চলবে তেহরানের মর্জিমাফিক

ইরানের গোপন ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ এবং আরও যা যা আছে

খামেনি হত্যাও টলাতে পারবে না ইরানকে, আঘাতের মূল অস্ত্র হবে ড্রোন

ইরানে রেজিম পরিবর্তনে ট্রাম্পের জুয়া—অতীতের চেয়ে আলাদা যেখানে, সফল হবে কি

ইরান হামলায় ট্রাম্পকে গোপনে উসকানি দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ ও নেতানিয়াহু

খামেনির উত্থান ও মৃত্যু, একটি যুগের সমাপ্তি