পারস্য উপসাগরে যখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বাজছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন এবং তেহরান থেকে আসছে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বার্তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন যে পর্দার আড়ালে অত্যন্ত ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে এবং ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ঐকমত্য হয়েছে। অন্যদিকে ইরান একে ‘ভুয়া খবর’ এবং ‘বাজার নিয়ন্ত্রণের কৌশল’ বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। এই পরস্পরবিরোধী দাবি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক রহস্যময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্প কেন আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছেন?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরান নিজেই আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে তাঁর কাছে এসেছে। তাঁর এই আত্মবিশ্বাসী অবস্থানের পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত কারণ থাকতে পারে:
১. মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ: আলোচনার দাবি তুলে ট্রাম্প ইরানের অভ্যন্তরে জনমত ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে চাচ্ছেন। বিশেষ করে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বেঁচে থাকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তিনি তেহরানের নেতৃত্বকে চাপে ফেলেছেন।
২. সময়ক্ষেপণ ও সামরিক প্রস্তুতি: কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দার আল-এতাইবি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল পরিমাণ মার্কিন মেরিন সেনা মোতায়েন করার জন্য ট্রাম্প হয়তো আলোচনার কথা বলে সময় ক্ষেপণ করছেন।
৩. বাজার নিয়ন্ত্রণ: ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি চান তেলের দাম স্থিতিশীল থাকুক। আলোচনার খবরে তেলের বাজার শান্ত হয়, যা মার্কিন অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।
৪. ঘরোয়া রাজনীতি ও কুশনারের ভূমিকা: জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মতো ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ প্রতিনিধিদের আলোচনায় যুক্ত করা প্রমাণ করে যে ট্রাম্প একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক জয় খুঁজছেন। ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে তিনি আমেরিকান ভোটারদের আশ্বস্ত করতে চাচ্ছেন।
ইরান কেন অস্বীকার করছে?
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই আলোচনার খবর অস্বীকার করেছেন। তাঁদের এই অনড় অবস্থানের কারণগুলো হতে পারে:
আদর্শিক অবস্থান: সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য এবং ‘আগ্রাসনকারীদের শাস্তি’ দেওয়ার যে অঙ্গীকার ইরান করেছে, আলোচনার খবর তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভীত প্রদর্শন: ইরান মনে করছে, আলোচনার দাবি মেনে নেওয়া মানে যুদ্ধের মুখে নতি স্বীকার করা। তারা প্রমাণ করতে চায় যে তারা ‘চাপের মুখে’ কোনো সমঝোতা করবে না।
বিপরীত বার্তা: ইরান দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের ‘চোরাবালিতে’ আটকে পড়েছে এবং তারা বের হওয়ার পথ খুঁজছে। ‘মেহর’ নিউজ এজেন্সির মতে, তেহরান কেবল তখনই আলোচনায় বসবে যখন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ইসরায়েলের ‘বক্সিং ফাইট’ তত্ত্ব
এই দ্বন্দ্বের মাঝে তৃতীয় পক্ষের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব পক্ষই দ্রুত একটা টেকসই সমাধান চায়। কিন্তু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতায় নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার দিকটিও তারা নিশ্চিত করতে চাইবে।
ব্রিটিশ সমর্থন: প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার দাবি করেছেন, তাঁর দেশ এই আলোচনার বিষয়ে অবগত। ব্রিটেনের মতে, যেকোনো চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর এমন কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে যা পুনরায় লঙ্ঘন করা অসম্ভব।
জিসিসি দেশগুলোর উৎকণ্ঠা: অধ্যাপক আল-এতাইবি মনে করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এই আলোচনা নিয়ে আনন্দিত হলেও তারা সন্দিহান। যদি শুক্রবারের মধ্যে কোনো যুদ্ধবিরতি না হয়, তবে এই অঞ্চলে সংঘাতের এক বিশাল বিস্ফোরণ দেখা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে জিসিসি দেশগুলো বিকল্প রুটের (হরমুজ প্রণালির বিকল্প) সন্ধান এবং প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বহুগুণ বাড়াতে বাধ্য হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ইসরায়েল। নেতানিয়াহু সরকার মনে করে, ইরানকে পূর্ণরূপে পরাজিত না করে আলোচনা শুরু করা মানে তাদের পারমাণবিক হুমকিকে টিকিয়ে রাখা। অধ্যাপক আল-এতাইবির মতে, ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত না করে কোনো চুক্তি হলে এই যুদ্ধ অনেকটা ‘বক্সিং ফাইট’-এর মতো অন্তহীন রাউন্ডে চলতেই থাকবে। ইসরায়েলের নতুন বিমান হামলা ট্রাম্পের ‘শান্তি বার্তার’ প্রতি তাদের অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
সর্বোপরি ট্রাম্পের ৫ দিনের হামলা স্থগিতের ঘোষণা এখন সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতা নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে ‘স্বয়ংক্রিয় রেজিম চেঞ্জ’ ঘটে গেছে। এখন তিনি হরমুজ প্রণালি ‘যৌথভাবে’ পরিচালনা করতে চান। যদি এই ৫ দিনের মধ্যে আলোচনার কোনো দৃশ্যমান ফলাফল না আসে, তবে ট্রাম্পের ‘আলোচনার দাবি’ কেবল একটি রাজনৈতিক স্টান্ট হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে, ইরান যদি শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসে, তবে সেটি হবে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক বিশাল মোড়।
বর্তমানে বিশ্ব কূটনীতি কেবল সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বে নয়, বরং কার কৌশল কার ওপর জয়ী হয়—সেই হিসাব-নিকাশে আবর্তিত হয়।
তথ্যসূত্র: সিএনএন, আল-জাজিরা, মেহর নিউজ এজেন্সি, আইআরএনএ এবং হোয়াইট হাউস বিবৃতি