অনেক সময় অন্যায্যভাবে যদি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র অন্যের ওপর জোরজবরদস্তি করতেই থাকে, একসময় সেই ব্যবস্থার পতন হবে। একসময় না একসময় এর জবাব দিতে হবেই। তাই তো কথায় আছে, ‘দিনে দিনে যত বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ’। প্রিয় পাঠক, আপনারা বুঝতেই পারছেন আজকে কী বিষয়ে আলোকপাত করব। অবশ্যই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সম্পর্কে। সচরাচর যেসব খবর আমরা পাই এগুলো আমরা সবাই জানি, তবে এই যুদ্ধের পেছনে অন্য যে সূত্রগুলো কাজ করছে, আমি চাইব সেগুলোর দিকে আলোকপাত করতে।
যুদ্ধ শুরুর দিন আমি আমার ফেসবুকে লিখেছিলাম—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে অনেক। ইসরায়েল এবার বুঝবে কত ধানে কত চাল। পয়লা মার্চ পোস্ট দেওয়ার পর টেলিফোনে অনেক বন্ধু বলেছিলেন, যেভাবে যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র, তাতে এক সপ্তাহ ইরান টিকতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। আমি তাঁদের বলেছিলাম, এই যুদ্ধের পেছনে অনেক প্রস্তুতি আছে। ইরান ৪০ বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে এই আশঙ্কায় যে, যেকোনো মুহূর্তে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় ধরনের আঘাত আসবে ইরানের ওপর। তাই তো গোপনে গোপনে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা নিউক্লিয়ার বোমা বানানোর জন্য হয়তো একটা ব্যবস্থার প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। মূলত তলে তলে বিভিন্ন ধরনের মিসাইল, ড্রোন বানানোর দিকে তারা মন দিয়েছে। ইরান বুঝে গেছে বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী দিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলকে মোকাবিলা করতে পারবে না। তাদের বাঁচতে হলে মিসাইল বা ড্রোনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। এই মিসাইল ও ড্রোনব্যবস্থা যাতে একেবারে পিন পয়েন্টে আঘাত করতে পারে, সেই ব্যাপারেই তারা মনোযোগ দিয়েছিল বেশি। এখানে আমার ধারণা হয়েছিল, এই পিন পয়েন্টে আঘাত করার পেছনে রাশিয়ার সহযোগিতা আছে। এত নিখুঁতভাবে ইরান যে ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটির ওপর, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর আঘাত করতে পারে, এটা বিশ্বের ধারণা ছিল না।
সবার জ্ঞাতার্থে একটি কথা বলে রাখা ভালো—রাশিয়া যাকে বন্ধু মনে করে সে সারা জীবনের তরে রাশিয়ার বন্ধু। এটা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতি। যুক্তরাষ্ট্রের বেনিয়াদের মতো রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নীতি ব্যবসায়ী না। এই কথাটি বললাম এই কারণে—ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সময় রাশিয়াকে প্রচুর পরিমাণে ড্রোন দিয়ে সাহায্য করেছিল ইরান। রাশিয়া সেটা এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাবে, এই কথা হয়তো আমার মতো অনেকেই বিশ্বাস করবেন না। রাশিয়ার বৈদেশিক নীতি, রাষ্ট্রীয় নীতি যাঁরা জানেন তাঁরাও বিশ্বাস করবেন না। রাশিয়া বিশ্বাসঘাতক রাষ্ট্র না। রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে একটি কথা বলে রাখা দরকার। রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে ছয়টি ডিভিশন আছে—প্রথম হলো সশস্ত্র যোদ্ধা, আমরা যেটাকে ইনফেন্টরি আর্মি বা সশস্ত্র বাহিনী বলি; আছে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, মহাকাশ বাহিনী। মহাকাশ বাহিনী মহাকাশ থেকে কীভাবে যুদ্ধ করতে হয়, সেই টেকনিক রপ্ত করে। এই বাহিনীতে রাশিয়া প্রচুর ইনভেস্ট করেছে, এর সক্ষমতা আছে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের যেকোনো জায়গাকে সঠিকভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে আঘাত হানতে পারার। আরও আছে নিউক্লিয়ার ওয়ার হেড পরিচালনা বাহিনী। অর্থাৎ অ্যাটম বোমা বানানো, রক্ষণাবেক্ষণ ও এটা পরিচালনা করার জন্য সম্পূর্ণ আলাদা বাহিনী আছে। আরও একটি যে বাহিনী আছে সেটা হলো নিউক্লিয়ার সাবমেরিন পরিচালনা বাহিনী।
আমার মনে হয় রাশিয়ার মহাকাশ যুদ্ধ পরিচালনা বাহিনী থেকে ইরান সাহায্য নিয়েছে। অন্যভাবে বলতে পারেন, রাশিয়া এই টেকনিক দিয়ে ইরানকে সাহায্য করেছে। যেটা যুক্তরাষ্ট্র গত তিন-চার দিন আগে অভিযোগ করেছে যে, রাশিয়া সামরিক দিক দিয়ে ইরানকে সাহায্য করছে, চীনকেও যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে ইরানের পক্ষ নেওয়ার কথা বলছে। সবকিছু বিশ্লেষণ করলে এটা দাঁড়ায়, অন্তত নিখুঁতভাবে মিসাইল বা ড্রোন নিক্ষেপের ব্যাপারে ইরানের সক্ষমতা সবার ধারণা পাল্টে দিয়েছে। যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
এখন যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, এই যুদ্ধ শেষ হতে কয়েক মাস বা বছর লাগতে পারে। আবার আধা ঘণ্টায় শেষ হতে পারে। আধা ঘণ্টায় শেষ হওয়ার অর্থ বুঝতে পেরেছেন? সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানে অ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করা। যদি আধা ঘণ্টায় শেষ করতে হয়, এর কনসিকোয়েন্স কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? যুক্তরাষ্ট্র যদি এই কাজটি করে তাহলে কেউ পাল্টা অ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করবে না—এর নিশ্চয়তা কোথায়? এদিকে উত্তর কোরিয়ার নেতা সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছেন। এটা অন্তত পৃথিবীর মানুষ জানে যে, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন কখন কী করবেন, তার মতিগতি বোঝা ভার।
এখানে যে জিনিসটা লক্ষণীয়—যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে তাকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য তার সব শক্তি নিয়োগ করছে। এই প্রথমবার ইরান ইসরায়েল ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা, তেল শোধনাগার ও সামরিক ঘাঁটিতে সঠিকভাবে আঘাত করছে। এই আঘাতের সীমানায় রয়েছে গালফ দেশগুলো। ইতিমধ্যে বাহরাইনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানছে। ওমান, কাতার, কুয়েত আছে ইরানের মিসাইল ও ড্রোনের আওতায়। সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে ড্রোন নিক্ষেপ করে ইরান জানান দিয়েছে যে, যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে তারা নিখুঁতভাবে আঘাত করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে, তেলের সরবরাহ কমে যাচ্ছে, সারা বিশ্বে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। তাহলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে কি ইরানও তেল সরবরাহ করতে পারবে না? দেখুন, ইরানের উত্তর দিকে কাস্পিয়ান সাগর আছে, এই সাগর দিয়ে তারা সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা আছে। অতএব ইরানের জন্য ভিন্ন পথ খোলা আছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও তেল রপ্তানির জন্য। আপৎকালে ইরান অবশ্যই এটা ব্যবহার করবে।
ইতিমধ্যে সবাই লক্ষ করেছেন গালফ দেশগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করছে যে যুক্তরাষ্ট্র শুধু ইসরায়েলকে রক্ষা করছে, আমাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক স্বার্থে শুধু ঘাঁটি গেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘাঁটির জন্য আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। আমাদের রক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না তারা। ধীরে ধীরে এই মুসলিম দেশগুলো টের পাবে, তাদের দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি বানানোর কোনো প্রয়োজনই ছিল না। নিজস্ব শক্তিতে যেটুকু পারত সেটুকু তাদের করা উচিত ছিল, আর উচিত ছিল ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ ইরানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। ইরান অবশ্যই এই মুসলিম দেশগুলোকে প্রটেকশন দিত, আগ্রাসী ভূমিকা পালন করত না তাদের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের কূটচালে পড়ে তাদের রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য ও বিলাসী জীবনযাপনের জন্য তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। তাদের তেল, সম্পদ বিক্রি করবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে; যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাহায্য দেবে, তারা শুধু জীবনটাকে উপভোগ করবে—এটাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এ রকম চলতে থাকলে তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হবে না, আবার তাদের উট চড়াতে হবে মরুভূমিতে, তাদের সামনে অন্ধকার জীবন; যদি এখনই তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাতা ফাঁদ থেকে বেরিয়ে না আসে।
যুক্তরাষ্ট্র সারা পৃথিবীকে একচ্ছত্রভাবে তার ছত্রচ্ছায়ায় নিতে চেয়েছিল যেন এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার; তার নিজেরটা যেটা সেটা তো তারই, অন্যের যা আছে সেটাও তার—এই নীতি নিয়ে সে এগিয়ে যাচ্ছিল। পৃথিবীর কোনো শক্তিই তার কাছে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিল না। সেটা মাথায় রেখেই ইরান তার শক্তি বৃদ্ধি করেছিল বহুগুণ। তাই হয়তো রাশিয়া ও চীন কৌশল করছে যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘটিয়ে দেওয়ার। তারা সময় গুনছে, কখন পাপে সের পূর্ণ হবে, সেই সময় টুঁটি চেপে ধরবে যুক্তরাষ্ট্রের। টুঁটি চেপে ধরার সময় হয়তো এসে গেছে।
পশ্চিম ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আরব দেশগুলো তো মহা খ্যাপা। যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ জনগণ এই যুদ্ধের পক্ষে নয়। ন্যাটো এই যুদ্ধে জড়াবে বলে মনে হয় না। এবার হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ শোধ করতে হবে—গত ৪০ বছরের ঋণ শোধ করতে হবে এখনই। অথবা আর কখনো নয়। এই অন্যায় যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, এই অসম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় যদি হয়, তাহলে হয়তো বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন থেকে মুক্তি পেলেও পেতে পারে।
লেখক: প্রকৌশলী