হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

সংসদের প্রথম অধিবেশন ও আগামীর পূর্বাভাস

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ ছিল ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ছবি: পিআইডি

ইতিহাসের চাকা ঘুরে আবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এল, যখন রক্তক্ষয়ী জুলাইয়ের স্মৃতি আর নতুন সূর্যের আবাহন নিয়ে যাত্রা শুরু করল বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে কেবল একটি তারিখ নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাবিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অস্থিরতার অবসান ঘটিয়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের সেই বিশাল অট্টালিকাটি যেন ঘটন-অঘটনের এক পুনর্জন্মের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংসদকক্ষের ভেতরে প্রবেশ করতেই সবার নজর কেড়েছিল স্পিকারের সেই শূন্য চেয়ার। একটি আসন যখন শূন্য থাকে, তখন তা কেবল আসবাবের অভাব বোঝায় না, বরং একটি যুগের অবসান ও নতুনের আহ্বান নির্দেশ করে। গণতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে এই শূন্যতা যেন গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পালাবদলের এক নীরব ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রকৃতি যেমন শূন্যস্থান পছন্দ করে না, রাজনীতিও তেমনই কোনো শূন্যতা দীর্ঘস্থায়ী হতে দেয় না। এই শূন্য আসনটি যেন চিৎকার করে বলছিল যে ১৮ মাসের পুরোনো সব জঞ্জাল মুছে ফেলে এখন সময় হয়েছে নতুন কোনো দূরদর্শী নেতৃত্বের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার।

অধিবেশনের শুরুতেই গ্যালারি ও সংসদ সদস্যদের আসনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা বিরাজ করছিল, যা একপর্যায়ে ‘কার্ড’ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত রূপ নেয়। ফুটবল মাঠে রেড কার্ড মানে যেমন চিরতরে মাঠ থেকে বিদায়, সংসদের ভেতরে এই প্রতীকী প্রদর্শন ছিল এক চূড়ান্ত ধিক্কার। সংসদ সদস্যরা কার্ড উঁচিয়ে যেন সেই বার্তাটিই দিচ্ছিলেন যে জুলাইবিরোধী কোনো শক্তিকে এ মাটিতে আর ঠাঁই দেওয়া হবে না।

সংসদীয় ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ ‘ওয়াকআউট’ প্রথম দিনেই তার উপস্থিতি জানান দিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে মতভিন্নতা থেকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের কক্ষ ত্যাগ করার ঘটনাটি গণতন্ত্রের প্রাণবন্ত রূপকেই ফুটিয়ে তোলে। এ ঘটনায় ভিন্নমতের একটি গণতান্ত্রিক বহিঃপ্রকাশ হলো। এই ওয়াকআউট যেন কবি জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার সেই বিপন্ন বিস্ময়ের মতো, যেখানে মানুষ তার অধিকারের প্রশ্নে অবিচল থেকে প্রতিবাদ জানায়। সংসদীয় বিতর্ক যে একপেশে হবে না এবং বিরোধী কণ্ঠস্বর যে প্রবল বিক্রমে ফিরে এসেছে, এটি ছিল তারই এক বলিষ্ঠ সংকেত। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন ওয়াকআউট যথেষ্ট ছিল, আগে থেকে প্ল্যাকার্ড নিয়ে আসার প্রয়োজন ছিল না।

নবীন সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের সরব উপস্থিতি অধিবেশন কক্ষে এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিল। তারুণ্যের এই জয়গান যেন নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সেই উদ্ধত শিরের প্রতিচ্ছবি, যা সব বাধা ডিঙিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে। এই তরুণ প্রতিনিধিরা যখন তাঁদের প্রথম বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন সেখানে অভিজ্ঞতার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছিল স্বপ্ন পূরণের তাড়না। রাজনীতিতে এই নতুন রক্তের প্রবাহ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন এমন এক প্রজন্মের হাতে, যারা আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতা আর অতি আবেগের এক

অপূর্ব মিশেলে বেড়ে উঠেছে।

অধিবেশনের অন্যতম আইনি কার্যক্রম ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অসংখ্য অধ্যাদেশ পেশ করা। আইন ও বিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে তার ভিত্তি হতে হয় মজবুত। এই অধ্যাদেশগুলো সেই ভিত হিসেবেই কাজ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সভার সভাপতিত্ব নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা দূর করে যখন প্যানেল স্পিকারের মাধ্যমে অধিবেশন পরিচালিত হচ্ছিল, তখন তা ছিল এক অনন্য মুহূর্ত। কে বসবেন সেই আসনে, তা নিয়ে যে জল্পনা ছিল তার অবসান ঘটে এক বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন ঘিরে সংসদের ভেতরে একধরনের গম্ভীর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। নিরপেক্ষতা আর প্রজ্ঞার মিশেলে তাঁরা সংসদকে কতটুকু কার্যকর রাখতে পারেন, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর স্থিতিশীলতা। জন স্টুয়ার্ট মিলের লিবার্টি তত্ত্ব অনুযায়ী, যেখানে প্রত্যেকের কথা বলার সমান সুযোগ থাকে, সেখানেই প্রকৃত গণতন্ত্র বিকশিত হয়। নতুন মনোনীত এই অভিভাবকেরা সেই সুযোগটি কতটুকু নিশ্চিত করবেন, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি।

তবে রাজনৈতিক মেরুকরণের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ডেপুটি স্পিকার পদ প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে। এই প্রত্যাখ্যান সংসদীয় রাজনীতিতে একধরনের ভারসাম্য রক্ষা করবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি যে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যখন তাঁর ভাষণে গত সরকারের তীব্র সমালোচনা করলেন, তখন পুরো সংসদ স্তম্ভিত হয়ে শুনছিল। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে এ ধরনের কঠোর সমালোচনা সচরাচর দেখা যায় না। তার এই বক্তব্য যেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের সেই সংগ্রামের মতো, যেখানে পরাজয়ের পুরোনো ইতিহাস ও গ্লানি মুছে নতুনকে মেনে নেওয়ার সাহস দেখানো হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ ছিল এই অধিবেশনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। দীর্ঘ নির্বাসন আর রাজনৈতিক সংগ্রামের পর তাঁর এই বক্তব্য ছিল অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও দিকনির্দেশনামূলক। কোনো প্রতিহিংসার পথে না গিয়ে বরং জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি এক নতুন নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

অধিবেশনের একটি উল্লেখযোগ্য বিতর্ক ছিল ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে যে সনদটি প্রস্তাব করা হয়েছে, তা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে যুক্তিতর্ক ছিল দেখার মতো।

এবারের সংসদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ‘আওয়ামী লীগবিহীন’ এক দৃশ্যপট। দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বড় দলটির অনুপস্থিতি সংসদের চেহারাই বদলে দিয়েছে। এটি যেমন এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, তেমনি এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতারও ইঙ্গিত দেয়। ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো বড় শক্তির পতন বা অনুপস্থিতি নতুন শক্তির উত্থান ঘটায়।

সংসদের সমালোচনাসূচক বক্তব্যগুলো ছিল অত্যন্ত ধারালো। অধিকাংশ বক্তব্য একপেশে হলেও, একাধিক সংসদ সদস্যকে কোনো ভুলকে আড়াল করার চেষ্টা না করে বরং তা সাহসের সঙ্গে স্বীকার করে নেওয়ার এক সংস্কৃতি দেখা গেল। এই সমালোচনাগুলো ছিল অনেকটা সার্জনের ছুরির মতো, যা পচনশীল অংশ বাদ দিয়ে শরীরকে সুস্থ করার চেষ্টা করে।

অধিবেশন কক্ষে যখনই কোনো প্রস্তাব আসছিল, মনঃপূত হলেই সংসদ সদস্যরা তখন টেবিল চাপড়ে সেটিকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। এই ‘ডেস্ক থাম্পিং’ বা টেবিল চাপড়ানো ছিল সমর্থনের এক ধ্বনিময় প্রকাশ। তবে আগামী দিনগুলোতে বোঝা যাবে যে এই সংসদ সদস্যদের জনগণের প্রতি সমর্থন কতটুকু, তারা জনগণের নাড়ির স্পন্দন বুঝতে সক্ষম কি না।

প্রবীণ ও নবীনদের এই মেলবন্ধন সংসদকে করেছে সমৃদ্ধ। তাদের বিজ্ঞ পরামর্শ ও সমর্থন তরুণ এমপিদের উৎসাহ দিচ্ছিল। সংসদ এখন অভিজ্ঞতার আলো আর তারুণ্যের তেজ মিলে এক নতুন জ্যোতিষ্ক তৈরি করেছে, যা আগামীর অন্ধকার পথকে আলোকিত করবে কি না, তা ভবিষ্যতে ফয়সালা হবে।

শোকপ্রস্তাব উত্থাপনের সময় পুরো সংসদে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এসেছিল। জুলাই বিপ্লবে যারা প্রাণ দিয়েছে, তাদের স্মরণে এই শ্রদ্ধা নিবেদন ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। তবে এই শোকপ্রস্তাব অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে বিতর্কিত বিষয় ছিল, যা গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে বেড়াচ্ছে।

এই অধিবেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রের এক নতুন যাত্রাপথে পা রাখল। দীর্ঘ বিরতি ও ১৮ মাসের বৈরী পরিবেশের পর এই সংসদীয় পরিবেশটি ছিল অনেকটা মরুভূমিতে বৃষ্টির মতো। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল বলেছিলেন, ‘মানুষ জন্মগতভাবেই রাজনৈতিক জীব।’ সেদিন সংসদের প্রতিটি কার্যক্রমে সেই রাজনৈতিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

প্রেসিডেন্ট, ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি অ্যালকোহল

শ্রীলঙ্কা: ঘুরে দাঁড়ানো অপূর্ব গল্পের দেশ

এনসিপির বক্তব্যে আলোড়িত হতে পারেনি মানুষ: আসিফ মোহাম্মদ শাহান

রাষ্ট্র কি নিজের দায়িত্ব এড়াচ্ছে

শিশুদের ডেটা প্রোফাইলিং ব্যবসা: মেটা কেন ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশে অযাচিত চাপ দিয়েছে

ইরান যুদ্ধ এবং দেশের সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ

ভবদহের জলাবদ্ধতার সমাধান যে উপায়ে

‘আমরা’ আর ‘ওরা’র ঐতিহ্য কি চালু থাকবে

মীমরা হয়ে উঠুক বাবা ও মায়ের ‘চোখের হারাই’

নেপালে তরুণদের জয় যে বার্তা দিচ্ছে

বিশ্ব অর্থনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব