ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশু বেচাকেনা ও জবাইয়ের সময় অসাবধানতার কারণে দেশজুড়ে দুর্ঘটনা ও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। ২৪ মে থেকে আজ শুক্রবার ঈদের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে পশুর শিংয়ের গুঁতা ও লাথিতে তিনজন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া পশুর আক্রমণ ও মাংস কাটার সময় অসাবধানতাবশত ধারালো অস্ত্রের আঘাতে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা হাসপাতাল ও বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, পশুর হাটে ও বাড়িতে পশু সামলাতে গিয়ে জামালপুরে দুজন এবং কুমিল্লায় এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে।
এ ছাড়া ২৫ মে কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় কোরবানির হাটে নিজের পালিত গরুর শিংয়ের গুঁতায় আমেনা বেগম (৫৫) নামের এক গৃহবধূ নিহত হন। তিনি উপজেলার ওমরাবাদ গ্রামের আবুল হাশেমের স্ত্রী।
হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পরিবারের কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এর আগে ২৪ মে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার সানন্দবাড়ী কোরবানির পশুর হাটে একটি মহিষের আক্রমণে রুহুল আমিন নামের এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। একই ঘটনায় গুরুতর আহত আরেক ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন ২৫ মে মারা যান। নিহত রুহুল আমিনের বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলায়।
ঈদের দিন সকাল থেকে শুরু করে আজ বিকেল পর্যন্ত সারা দেশের হাসপাতালগুলোতে আহত ব্যক্তিদের ভিড় লক্ষ করা গেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহত ব্যক্তিদের বড় অংশই পশুর লাথি ও শিংয়ের আঘাতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। অন্যরা অসাবধানতাবশত নিজের ছুরি বা চাপাতির আঘাতে জখম হয়েছেন।
রাজধানীর প্রধান দুটি হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের রোগীর নিবন্ধন খাতা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ১৭৪ জন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১১৯ জন।
নিটোরের অর্থোপেডিক, স্পাইন অ্যান্ড ট্রমা সার্জন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট নির্মল কান্তি বিশ্বাস বলেন, হাসপাতালে আসা রোগীদের বেশির ভাগই ধারালো অস্ত্রের আঘাত (কাটিং ইনজুরি) এবং পশুর ধাক্কায় হাড় ভাঙা বা মচকানোর মতো আঘাত নিয়ে এসেছেন।
এ ছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট ও অন্যান্য বিভাগেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরী ও বিভিন্ন জেলায় অন্তত ৪০০ মানুষ চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালেই ১৫০ জনের বেশি চিকিৎসা নিয়েছেন।
আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক নিঝুম শীল বলেন, ‘আমাদের জরুরি বিভাগে অন্তত ৩৫ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে গেছেন। তবে আহসান (১৩) নামের এক কিশোরের গলায় ছুরির গুরুতর আঘাত থাকায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালেও শতাধিক ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সিলেটে পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানোর কাজ করতে গিয়ে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আনোয়ার জামান বলেন, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩০ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরলেও অন্য ২০ জন গুরুতর জখম নিয়ে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছেন।
এ ছাড়া বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহে অন্তত এক হাজার মানুষ আহত হয়ে স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর কোরবানির ঈদে পশু নামানোর সময় ও মাংস কাটার অভিজ্ঞতার অভাবে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁরা মনে করেন, পশু নিয়ন্ত্রণে দক্ষ লোকবল ব্যবহার করা এবং ধারালো সরঞ্জাম ব্যবহারের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করলে এই ধরনের আহতের সংখ্যা অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।