দেশে হাম এবং হামের মতো উপসর্গ নিয়ে শিশুরোগীদের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে অনেককে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। যারা আগে থেকে দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছে, মূলত তাদেরই হাসপাতালবাস দীর্ঘ হচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, আগে থেকে স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভোগা শিশুদের জন্য হাম মারাত্মক হতে পারে। হাসপাতালে অন্য জীবাণুর সংক্রমণও তাদের জটিলতার মাত্রা বাড়াতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, হামের ভাইরাস শিশুদের শরীরের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। এমনিতেও বড়দের চেয়ে শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কম থাকে। অপুষ্টিসহ বিভিন্ন কারণে কিছু শিশুর রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষমতা তুলনামূলক আরও কম হতে পারে। হামে আক্রান্ত এ ধরনের শিশুদের মধ্যে তাই বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের তথ্যমতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত একটি রোগ। শিশুদের ৬ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে এটি মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। হামের ভাইরাস প্রধানত শ্বাসনালি ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আক্রমণ করে।
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের ২ বছর ১০ মাস বয়সী শিশু তারেক (ছদ্মনাম) দেড় মাস ধরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। বর্তমানে সে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জ্বর ও পেট ফোলা নিয়ে তারেককে এই হাসপাতালে প্রথম নেওয়া হয়েছিল। তবে শয্যা না থাকায় তখন ভর্তি করানো যায়নি। কিছুদিন কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পর ২ মার্চ তাকে আবার বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়। সাত দিন আগে হাম শনাক্ত হওয়ায় তাকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। জ্বর কমলেও তার পেট ফোলা এখনো আছে। তারেককে ২০২৪ সালের মার্চ ও সেপ্টেম্বরে হামের টিকার দুই ডোজ দেওয়া হয়েছিল।
তারেকের বাবা আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছেন, চিকিৎসক বলেছেন, ছেলের রক্তে সংক্রমণ রয়েছে। যকৃৎ (লিভার) স্বাভাবিকের থেকে কিছুটা বড়। অবস্থার উন্নতি হলে বায়োপসি এবং অন্যান্য পরীক্ষা করা হবে।
এই হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে এক সপ্তাহ আগে ভর্তি হয়েছে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থেকে আসা ৫ মাস বয়সী শিশু মিহিরিমা (ছদ্মনাম)। গত মাসে এক সপ্তাহের বেশি সময় সে ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিউমোনিয়াজনিত সমস্যায় চিকিৎসাধীন ছিল। শিশু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়। গত সোমবার ৮ মাস বয়সী তাসনিয়া (ছদ্মনাম) কাশিজনিত সমস্যা নিয়ে একই ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। এর আগে ২২ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুটির ডায়রিয়া ও জ্বরের চিকিৎসা চলছিল। সে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার এক দিন পর শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় তাকে শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ শিশু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আজকের পত্রিকাকে জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২০৯টি শিশু হামজনিত রোগ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে মার্চে ভর্তি হয়েছে ১৩০ এবং এপ্রিলের ৬ দিনে ৭১টি শিশু। বর্তমানে ৬১ শিশু ভর্তি রয়েছে। এ পর্যন্ত হামজনিত জটিলতায় ৪ শিশু মারা গেছে।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এটি প্রধানত শিশুদের দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে হচ্ছে।’
রাজধানীর মহাখালীতে ডিএনসিসির ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে হামে আক্রান্ত শিশু রূপা (ছদ্মনাম)। ১৩ মাস বয়সী নারায়ণগঞ্জের এই শিশু ১৬ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত খিঁচুনি ও মস্তিষ্কের প্রদাহের কারণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। সেখান থেকে ছাড়া পাওয়ার পর জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাকে ২ এপ্রিল মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল হয়ে ৩ এপ্রিল ডিএনসিসি হাসপাতালে নেওয়া হয় রূপাকে। আইসিইউর প্রয়োজনে তাকে সেখানে নেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ডা. আসিফ হায়দার বলেন, তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া হাম রোগী এবং হামজনিত উপসর্গযুক্ত অনেক রোগী টিকা নেয়নি। অনেকের টিকা নেওয়ার বয়সও হয়নি।
আসিফ হায়দার বলেন, হামের ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, চোখের সমস্যা এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ হয়ে থাকে। হাম অনেক শিশুর আগের শারীরিক জটিলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার কম রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে নতুন জটিলতাও দেখা দিচ্ছে।
দেশে চলমান হামের সংক্রমণে ভর্তি রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। এখানে জানুয়ারি থেকে হাম ও হামজনিত উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত ৭৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। হামজনিত উপসর্গ নিয়ে ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুর কারণ হাম বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফ এ আসমা খান জানিয়েছেন, মৃতদের সিংহভাগই নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতায় ভুগছিল।
দীর্ঘ হাসপাতালবাসের কারণ
হামে আক্রান্তদের হাসপাতালে দীর্ঘ সময় ভর্তি থাকার প্রধান কারণ হলো আনুষঙ্গিক জটিলতাগুলোর চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ। এ ছাড়া হাসপাতালে থাকা অন্যান্য জীবাণু থেকে সংক্রমণ এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাও অনেক সময় চিকিৎসার সময় দীর্ঘায়িত করে।
জার্মানভিত্তিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী স্প্রিংগার নেচার উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মরক্কোতে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের নিয়ে গত মাসে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘মিজেল্স আউটব্রেক ইন চিল্ড্রেন: এক্সপেরিয়েন্স অব দ্য চিল্ড্রেন’স হসপিটাল অব রাবাত’ শিরোনামের ওই গবেষণায় ২০২৪-২৫ এ হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের ওপর অনুসন্ধান করা হয়। এ গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশু এক বছরের কম বয়সী এবং তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো টিকা নেয়নি। ৫৬ শতাংশ শিশুর মধ্যে মূলত নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা গেছে। টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে জটিলতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। গড়ে ছয় দিন হাসপাতালে থাকা স্বাভাবিক হলেও গুরুতর জটিলতার ক্ষেত্রে এর সময় বেড়েছে। কিছু শিশুকে আইসিইউতে নিতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণাটি থেকে বোঝা যায়, হাম শুধু একটি সাধারণ সংক্রামক রোগ নয়; বরং তা দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এটি দীর্ঘমেয়াদি হাসপাতালবাসের বড় কারণ হতে পারে।
দীর্ঘদিন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা করছেন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট আরিফুল বাশার। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘অন্য কোনো জটিলতা না থাকলে হামে আক্রান্ত শিশু সাধারণত ১০ দিনে সুস্থ হয়ে যায়। তবে শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়ার চার দিন পরও জ্বর থাকলে তা সতর্কতার সংকেত। তখন ধরে নিতে হবে, অন্য কোনো জটিলতা; যেমন ফুসফুসের সমস্যা, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হৃদ্রোগ থাকতে পারে।’
ডা. আরিফুল বাশার আরও বলেন, হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতার দুর্বলতা দুই থেকে তিন বছর থাকতে পারে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ করা হামবিষয়ক তথ্যে জানা গেছে, গতকাল মঙ্গলবার সকাল আটটা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত ও ভাইরাসজনিত লক্ষণ নিয়ে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে ২১ জন এবং হামের লক্ষণ নিয়ে ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।