হোম > বিশ্লেষণ

সুয়েজ খালে ডুবেছিল ব্রিটিশরা, হরমুজে মার্কিনদের জন্য কী অপেক্ষা করছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আলোচনার টেবিলে ইরানই আপাতত এগিয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ছবি: সংগৃহীত

সাম্রাজ্যগুলোর পতন শুরুর কিছু নির্দিষ্ট কারণ আছে। সাম্রাজ্যের পতন তখনই শুরু হয়—যখন তাদের সামরিক বিস্তার রাজনৈতিক কৌশলকে ছাড়িয়ে যায়, যখন অর্থনৈতিক ভিত দুর্বল হয় এবং যাদের দমন করতে চায়, তারা দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থেকে সেই প্রভাবশালী শক্তিকেও অতিক্রম করে যায়।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট ছিল সেই মোড়। সুয়েজ খালের জাতীয়করণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দেখা দেয়। এই সংকট ব্রিটেনের আর্থিক দুর্বলতা উন্মোচন করে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে পাউন্ড স্টার্লিংয়ের ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয় এবং বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে অবস্থান হারিয়ে ফেলে এটি। এবং শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পশ্চাদপসরণকে ত্বরান্বিত করে।

সত্তর বছর পর, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকান শক্তির জন্য তেমনই একটি মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই তুলনাগুলো কেবল ওপরে ওপরে মিল বা আলংকারিক নয়। উভয় ক্ষেত্রেই, প্রতিষ্ঠিত একটি সাম্রাজ্যিক কাঠামো এমন এক আঞ্চলিক শক্তির মুখোমুখি হয়েছে, যে নতি স্বীকারে অনিচ্ছুক। অতীতে সাম্রাজ্য অবস্থান ধরে রাখতে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের গতিবিধি দিয়ে নয়, বরং গভীর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের মাধ্যমে।

১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট

মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের ১৯৫৬ সালের জুলাইয়ে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু মিসরের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভিত্তিকেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। বাণিজ্যিক পথের বাইরে, এই খাল ছিল ব্রিটেনের অবশিষ্ট উপনিবেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী কৌশলগত ধমনি এবং সাম্রাজ্যবাদী মর্যাদার প্রতীক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে মিসরে আক্রমণ চালায়। এই ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসনের লক্ষ্য ছিল জাতীয়করণ বাতিল করা, নাসেরকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং পুনরায় সাম্রাজ্যিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। সামরিকভাবে এই অভিযান প্রাথমিক সাফল্য অর্জন করে। অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনী দ্রুত অগ্রসর হয় এবং ইসরায়েলি বাহিনী সিনাই উপদ্বীপ দখল করে নেয়। কিন্তু এই অগ্রগতি রাজনৈতিক বিজয়ে রূপ নেয়নি।

নির্ণায়ক ভূমিকা শুধু মিসরের সামরিক ও জনসাধারণের প্রতিরোধ ছিল না, যদিও সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আসল বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ—যারা তখন দ্বিমেরু বিশ্ব ব্যবস্থার দুই কেন্দ্রীয় শক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডুইট ডি আইজেনহাওয়ার পরিস্থিতির উত্তেজনা বৃদ্ধির ঝুঁকি এবং ব্রিটেনকে পাশ কাটানোর সুযোগ—দুটিই অনুধাবন করে লন্ডনকে স্পষ্ট চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দেন।

ওয়াশিংটন আর্থিক প্রতিশোধের হুমকি দেয়, ব্রিটিশ পাউন্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা সীমিত করার উদ্যোগ নেয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এমন এক সময়ে, যখন ব্রিটেন আমদানি ব্যয় মেটানো এবং নিজস্ব মুদ্রার মান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছিল। আর এই চাপই হয়ে ওঠে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবশিষ্টাংশের পতনের চূড়ান্ত আঘাত। ব্রিটেনকে অপমানজনকভাবে পিছু হটতে বাধ্য হতে হয়, আক্রমণ ভেঙে পড়ে, আর নাসের রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।

এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বহিরাগত শক্তি হিসেবে ব্রিটেন যুগের চূড়ান্ত অবসান ঘটায়। এর জায়গা নেয় যুক্তরাষ্ট্র, যারা আঞ্চলিক আধিপত্যের দায়িত্ব গ্রহণ করে। লন্ডন বুঝতে পারে, আমেরিকার সম্মতি ছাড়া তারা আর তাদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না। ফলে মিত্র ও প্রতিপক্ষ উভয়ই ব্রিটিশ শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা নতুন করে সাজিয়ে নেয়। সুয়েজ সংকট দেখিয়ে দেয়, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পারে না। যুদ্ধক্ষেত্রে স্পষ্ট সুবিধা থাকলেও, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং কৌশলগত অতিরিক্ত বিস্তার শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরাজয় ডেকে আনতে পারে।

সে সময় ব্রিটেন, এখন আমেরিকা

১৯৫৬ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এবং আজকের যুক্তরাষ্ট্র—উভয়ই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর তুলনায় বিপুল সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিল। তবু, এই শক্তি তাদের সীমাহীন স্বাধীনতা দেয়নি। ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতাই তাদের হাত বেঁধে রেখেছিল।

অর্থনৈতিক দিক থেকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ব্রিটেন ছিল ঋণের ভারে ন্যুব্জ। ১৯৫৬ সাল নাগাদ দেশটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭ বিলিয়ন পাউন্ডে (আজকের হিসাবে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার)। এর সঙ্গে ছিল শিল্প প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া এবং বাইরের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা। আজকের যুক্তরাষ্ট্রও প্রায় একই রকম সংকটে আবদ্ধ। ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জাতীয় ঋণ, স্থায়ী বাজেট ঘাটতি—সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্রমশ দুর্বল অর্থনীতি এবং ডলার-ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার ধীরে ধীরে ক্ষয়ের কাছে বন্দী হয়ে পড়ছে।

ব্রিটেনের মতোই, যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে অতুলনীয় সামরিক উপস্থিতি। কিন্তু এই শক্তি ছড়িয়ে আছে বহু ফ্রন্টে—পূর্ব ইউরোপ থেকে শুরু করে ইন্দো-প্যাসিফিক পর্যন্ত। মধ্যপ্রাচ্য, যা একসময় মার্কিন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, এখন বহু যুদ্ধ এবং ব্যয়বহুল, অনির্ণীত সংঘাতের পর শুধু একটি ক্ষেত্র মাত্র। মনোযোগ ও সম্পদের এই বিচ্ছুরণ যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী রাখলেও, তাকে চূড়ান্ত ফল নির্ধারণের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে।

রাজনৈতিকভাবে, ব্রিটেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থানকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিল এবং ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করেছিল। আজকের যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অঞ্চলের মুখোমুখি, যা বহু দশকের সংঘাতের ফলে বদলে গেছে। এখানে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি, আঞ্চলিক ক্ষমতা এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় নেটওয়ার্কগুলো ঐতিহ্যগত নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে ক্ষয় করে দিয়েছে।

যেভাবে সুয়েজ সংকট ব্রিটিশ পতনের সূচনা চিহ্নিত করেছিল, একই সঙ্গে তা মার্কিন উত্থানের পথও প্রশস্ত করেছিল। উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের বিরোধিতা নয়, বরং ইউরোপীয় মিত্রদের স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ নেওয়া ঠেকানো এবং নিজেকে অঞ্চলের নির্ণায়ক ও অপরিহার্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল আইজেনহাওয়ার প্রশাসনের হস্তক্ষেপের মূল কৌশল।

ওয়াশিংটন উত্তরাধিকারসূত্রে ব্রিটেনের প্রভাববলয়ের কাঠামো গ্রহণ করে—সামরিক ঘাঁটির বিস্তার, জোট শক্তিশালীকরণ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের গভীরতা বৃদ্ধি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রধান বহিরাগত শক্তিতে পরিণত হয়। সামরিক ঘাঁটির জাল, অস্ত্র বিক্রি, তেল চুক্তি, পেট্রোডলার ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক বহু দেশের সঙ্গে বিস্তৃত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক—বিশেষত ধনী উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে—এর মাধ্যমে তারা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

যুক্তরাষ্ট্র মিসর, জর্ডান ও মরক্কোর মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা, ঋণের চাপ, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনকে সমর্থনের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাববলয়ে নিয়ে আসে। যেসব দেশ একসময় আরব জাতীয়তাবাদী জোটের অংশ ছিল—যেমন ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়া—সেখানে মার্কিন নীতি বিভাজন ও অস্থিরতা তৈরি করতে ভূমিকা রাখে। এর ফলে দুর্বল রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়, যারা মার্কিন আধিপত্য বা ইসরায়েলি নীতির বিরুদ্ধে বড় কোনো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সক্ষম নয়।

সাম্রাজ্যের পতন কখনোই একা আসে না। সাধারণত এর সঙ্গে নতুন কোনো আধিপত্যের কাঠামো গড়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে—ব্রিটেনের জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র যেমন এককভাবে উঠে এসেছিল, তেমনভাবে এখনো কোনো একক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করতে প্রস্তুত নয়। বরং উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থা খণ্ডিত এবং বহুমেরুকেন্দ্রিক।

হরমুজের বাঁক

বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। এই পথকে হুমকির মুখে ফেলতে ইরানের সক্ষমতা নির্ভর করে তার ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক শক্তি, অসম যুদ্ধকৌশল এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার ওপর।

১৯৫৬ সালের মিসরের তুলনায়—যা মূলত নিরপেক্ষ জোটের নেতৃত্ব এবং ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে থাকার কারণে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতে পারত—ইরানের হাতে এখন আরও বিস্তৃত উপায় রয়েছে। এর মধ্যে আছে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করার ক্ষমতা। ক্রমশ অঞ্চলটি উপলব্ধি করছে, আমেরিকান-জায়োনিস্ট জোটের যুদ্ধ-নির্ভর নীতিই অস্থিরতার অন্যতম চালিকাশক্তি।

বর্তমান সংঘাত নিয়ে ইরান একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তুলে ধরেছে। তাদের শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধ, যুদ্ধের দায় স্বীকার, ভবিষ্যতে আক্রমণ না করার নিশ্চয়তা, অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ, ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি পরিচালনার জন্য নতুন কাঠামো প্রস্তাব করেছে তারা, যা তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে প্রতিফলিত করবে। পাশাপাশি, গাজা, লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং যুদ্ধাপরাধের জবাবদিহিতাসহ বৃহত্তর আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। অমীমাংসিত থেকে গেছে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের পারমাণবিক একচেটিয়া আধিপত্যের বিষয়টি—বিশেষ করে যখন গাজায় তাদের যুদ্ধ তৃতীয় বছরে প্রবেশ করেছে। তারা বারবার সীমা অতিক্রম করে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে অপ্রতিহত শক্তি প্রয়োগ করেছে, আন্তর্জাতিক আইন বা চুক্তির তোয়াক্কা না করেই।

ইরানের জন্য সব লক্ষ্য অর্জন করা জরুরি নয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তেহারনকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে না পারে, শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে না পারে, কিংবা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করতে ব্যর্থ হয়—তাহলে ইরানের মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ টিকে থাকা, ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়ে গেছে।

আমেরিকার সীমাবদ্ধতা

যুক্তরাষ্ট্র আজ এক দ্বিধার মুখে দাঁড়িয়ে—১৯৫৬ সালে ব্রিটেন যে সংকটে পড়েছিল, তারই এক জটিলতর প্রতিচ্ছবি। উত্তেজনা বাড়ানোর পথ বিপজ্জনক। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে, বা জ্বালানি প্রবাহে স্থায়ী বিঘ্ন ঘটলে, বৈশ্বিক অর্থনীতি কেঁপে উঠবে। জ্বালানির দাম বাড়বে, আর চাপ বাড়বে আমেরিকার মিত্রদের ওপর।

অন্যদিকে, ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন ছাড়া যদি উত্তেজনা কমিয়ে আনা হয়, তাহলে সেটি উন্মোচন করবে আমেরিকার জবরদস্তিমূলক শক্তির সীমা। এতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কাছে বার্তা যাবে—সহ্যশক্তি থাকলে, সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তিকেও নিষ্ক্রিয় করা যায়। এই টানাপোড়েন আসলে এক বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন—সাম্রাজ্যিক অতিরিক্ত বিস্তার। যুক্তরাষ্ট্রকে একসঙ্গে বহু অঞ্চলে প্রতিশ্রুতি সামলাতে হয়, একই সঙ্গে ধরে রাখতে হয় অভ্যন্তরীণ সমর্থন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এই তিনটিকেই চাপে ফেলে।

বর্তমান এই সংঘাত বোঝার জন্য কৌশলগত (ট্যাকটিক্যাল) ও কাঠামোগত (স্ট্রাকচারাল) সুবিধার মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। আমেরিকান-জায়োনিস্ট অক্ষের কাছে স্পষ্ট সামরিক কৌশলগত সুবিধা রয়েছে। তাদের আছে আকাশশক্তি, নৌ সক্ষমতা, গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং উন্নত প্রযুক্তি। কিন্তু এসব শক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক ফলাফল নিশ্চিত করে না।

অন্যদিকে ইরান কাজ করে কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতার জায়গা থেকে। তার ভৌগোলিক গভীরতা, বিকেন্দ্রীকৃত সামরিক নীতি এবং আঞ্চলিক জোট তাকে দীর্ঘস্থায়ী চাপ সহ্য ও প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তার লক্ষ্য সীমিত এবং অর্জনযোগ্য।

এই অসমতাই এখানে নির্ণায়ক। আমেরিকান-জায়োনিস্ট অক্ষ চায় ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আঞ্চলিক কাঠামো বদলে দিতে। ইরান চায় টিকে থাকতে এবং প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখতে। এমন অসম লক্ষ্য নিয়ে সংঘাতে, সাধারণত যাদের লক্ষ্য সীমিত, তারাই শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকে।

এক যুগের অবসান

আমেরিকার প্রভাব দুর্বল হলে, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর জন্য আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততাও বাড়বে, যদিও তা সরাসরি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার রূপ নাও নিতে পারে।

আঞ্চলিক পর্যায়ে, ইরানের টিকে থাকা ও শক্তিশালী অবস্থান, এবং প্রতিরোধ অক্ষের স্থায়িত্ব—শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে। ইসরায়েলের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক আধিপত্যের ধারণা ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। আমেরিকার নিরাপত্তা গ্যারান্টি নতুন করে মূল্যায়িত হবে, আর নতুন জোট গড়ে উঠতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, ফিলিস্তিন প্রশ্নের গুরুত্ব হয়ে ওঠে গভীর ও নির্ধারক।

আমেরিকার আধিপত্য দুর্বল হওয়ার অর্থ হলো—ইসরায়েলের কৌশলগত মূল্যও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়া। এত দিন দেশটির সামরিক আধিপত্য নির্ভর করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনের ওপর। সেই সমর্থন যত ব্যয়বহুল ও বিতর্কিত হবে, ততই তার ক্ষমতার কাঠামোগত ভিত্তি ক্ষয় হতে শুরু করবে। ফলাফল তাৎক্ষণিক পতন নয়, বরং ধীরে ধীরে তার বর্ণবাদী কাঠামো ও তাকে টিকিয়ে রাখা ব্যবস্থার ভাঙন।

সামরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হবে। রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা বাড়বে। অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য তীব্র হবে। এই পরিস্থিতিতে, ফিলিস্তিনি সংগ্রাম আবারও অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে উঠবে। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—যে বসতি-উপনিবেশ প্রকল্পগুলো সাম্রাজ্যিক পৃষ্ঠপোষকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেই পৃষ্ঠপোষকতা সরে গেলে তারা টেকে না। জায়োনিস্ট কাঠামোর ভাঙন এখন আর ‘হবে কি না’ সেই প্রশ্ন নয়, বরং ‘কখন’ হবে সেই প্রশ্ন।

যদি সুয়েজ সংকট এক সাম্রাজ্যের অবসান ও আরেকটির উত্থান চিহ্নিত করে থাকে, তাহলে হরমুজ হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে ভিন্ন এক বাস্তবতার—প্রতিস্থাপন নয়, বরং সাম্রাজ্যিক আধিপত্যের ধীরে ধীরে ক্ষয়। ইতিহাসের শিক্ষা একই থাকে। সাম্রাজ্য একদিনে ভাঙে না। তারা ভাঙে তখনই, যখন শক্তিকে আর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তর করতে পারে না। সেই অর্থে, এই সংঘাতের পরিণতি হয়তো ইতিমধ্যেই নির্ধারিত।

মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

হরমুজ আর ইরানের দ্বীপগুলো নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের যেসব বাণী ফলে যাচ্ছে

ব্যাপক হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দমানো সম্ভব নয় যেসব কারণে

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে কেন ব্যর্থ ইসরায়েল

ইরানের হামলায় ধ্বংস ‘ই-৩জি সেন্ট্রি’—যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কত বড় ক্ষতি

ইরানে মার্কিন স্থল আগ্রাসনের সম্ভাবনা কেন বেশি—ব্যাখ্যা করলেন ড. ডুমখ্যাত রুবিনি

পৃথিবীকে অবশ্যম্ভাবী পরমাণু যুদ্ধ থেকে বাঁচানো এক অজানা নায়ক

বিশ্ববাণিজ্যের ধমনি শুধু হরমুজ নয়, পানামা-মালাক্কাও সংকটের মুখে

চার কারণে জয়ের পথে ইরান

মাটিতে নামলে মার্কিন সেনাদের পাখির মতো গুলি করবে ইরান, আছে আরও যত চ্যালেঞ্জ

খারগ দ্বীপের দখলে ভেঙে পড়বে আইআরজিসি, শেষ হবে যুদ্ধ: হোয়াইট হাউস