হোম > বিশ্লেষণ

ইরান যুদ্ধে ‘ইয়ো-ইয়ো’ নীতি: শুরু থেকে যেসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

ইরানে মার্কিন হামলার প্রায় এক মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে খোদ হোয়াইট হাউসের ভেতরেই চরম বিভ্রান্তি লক্ষ করা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান কখনো ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’, আবার কখনো ‘সমঝোতার আভাস’—এই দুই মেরুর মধ্যে দুলছে। বিশ্লেষকেরা এই অনিশ্চিত রণকৌশলকে ‘ইয়ো-ইয়ো’ নীতির সঙ্গে তুলনা করছেন, যা মার্কিন মিত্রদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’: এক যুদ্ধ কতবার জেতা যায়?

যুদ্ধের শুরু থেকেই ট্রাম্প একাধিকবার ‘বিজয়’ ঘোষণা করেছেন, যা নিয়ে খোদ পেন্টাগনেই বিস্ময় তৈরি হয়েছে। গত তিন সপ্তাহের জনসমক্ষে দেওয়া বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে এক অদ্ভুত চিত্র ফুটে ওঠে:

৭ মার্চ: ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে জিতে গেছি।’ ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর কথা ভাবছিল, তখন ট্রাম্প অনেকটা ‘ধন্যবাদ, তবে দরকার নেই’ ভঙ্গিতে তাদের প্রত্যাখ্যান করেন।

৯ মার্চ: দুই দিন পরেই এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সুর পাল্টে বলেন, ‘আমরা সামরিক লক্ষ্য অর্জনে বড় পদক্ষেপ নিচ্ছি। কেউ কেউ বলতে পারেন কাজ প্রায় শেষ।’

১১ মার্চ: কেনটাকির হেব্রন র‍্যালিতে তিনি চূড়ান্ত ঘোষণা দেন, ‘আমরা জিতে গেছি। প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ হয়ে গিয়েছিল।’

অথচ গতকাল মঙ্গলবার ওভাল অফিসে বসে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, যুদ্ধ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে এবং কেবল ‘ফেক নিউজ’ মিডিয়াই এটিকে জিইয়ে রাখতে চাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ১ হাজার মার্কিন সেনা নতুন করে মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ বনাম ‘চুক্তি’

৬ মার্চ ট্রাম্প ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছিলেন। সেই সময় ধারণা করা হয়েছিল, মার্কিন হামলায় ইরানি শাসনব্যবস্থা ধসে পড়বে। কিন্তু শাসনব্যবস্থা টিকে থাকায় ট্রাম্প এখন আলোচনার টেবিলে বসার ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

গত সোমবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ইরানিরা খুব করে একটা চুক্তি করতে চাচ্ছে। আমরাও চাচ্ছি।’ তিনি আগামী পাঁচ দিনের একটি আলটিমেটাম দিয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘এই পাঁচ দিনে যদি কাজ হয়, তবে সব মিটে যাবে, নয়তো আমরা “মনের সুখে” বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাব।’

সময়সীমা ও কৌশলগত অনিশ্চয়তা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার দাবি করছেন, তাঁরা ‘সময়ের চেয়ে এগিয়ে’ আছেন। তবে এই সময়সীমা নিয়ে খোদ প্রশাসনের মধ্যেই মতভেদ স্পষ্ট:

শুরুর ভবিষ্যদ্বাণী: ২ মার্চ ট্রাম্প বলেছিলেন যে পুরো অপারেশনটি বড়জোর চার সপ্তাহ লাগবে। সেই অনুযায়ী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে সব শেষ হওয়ার কথা।

বর্তমান অবস্থান: ১৬ মার্চ পিবিএস নিউজ যখন তাঁকে নির্দিষ্ট তারিখ জিজ্ঞেস করে, তখন ট্রাম্প উত্তর দিতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তারিখ বলতে চাই না। কারণ, দুই দিন দেরি হলেই আপনারা সমালোচনা শুরু করবেন।’

প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ পেন্টাগনে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, যুদ্ধের স্থায়িত্ব তিন থেকে আট সপ্তাহ হতে পারে। তবে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, এটি ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো ‘অন্তহীন যুদ্ধে’ রূপ নেবে না।

ট্রাম্পের ‘ওয়ার্স্ট কেস’ সিনারিও

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিহত হওয়ার পর নেতৃত্ব নিয়ে সংকট ঘনীভূত হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। ট্রাম্প চেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার মতো ইরানেও একজন অনুগত নেতা খুঁজে বের করবেন।

তবে ট্রাম্প যেমনটি আশঙ্কা করেছিলেন, সেটিই সত্য হয়েছে—‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে। খামেনির ছেলে মোজতাবা খামেনিকে পরবর্তী নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। ট্রাম্প মোজতাবাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যদিও গত সোমবার তিনি রহস্যজনকভাবে মন্তব্য করেন, মোজতাবা আদৌ জীবিত আছেন কি না, তিনি নিশ্চিত নন। এ ছাড়া ইরানে আর কেউ নিহত হোক, সেটিও চান না বলে জানান।

স্থলসেনা মোতায়েন: কৌশলগত অস্পষ্টতা

ট্রাম্প প্রশাসন সব সময় দাবি করেছে, তারা ‘অনন্ত যুদ্ধে’ জড়াবে না। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার সিএনএন নিশ্চিত করেছে, ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের ১ হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের জন্য প্রস্তুতি চলছে।

স্থলসেনা পাঠানোর বিষয়ে ফক্স নিউজের ব্রায়ান কিলমিড বা অন্য সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করলে ট্রাম্প তাঁদের ‘বোকা’ বলে গালি দিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন। এই ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ আসলে ইরানে একটি বড় মাপের স্থল অভিযানের ইঙ্গিত কি না, তা নিয়ে সামরিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস আসলে পেছনের দরজা দিয়ে একটি সম্প্রসারিত যুদ্ধকে মার্কিন জনগণের কাছে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ট্রাম্পের অসংলগ্ন বক্তব্য এবং ঘনঘন জয়ের দাবি আসলে রণক্ষেত্রের প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করার একটি কৌশল হতে পারে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ইউক্রেনে রাশিয়ার কৌশল যেভাবে কাজে লাগাচ্ছে মিয়ানমার জান্তা

যুদ্ধ থেকে ইরান কী চায়, অর্জন কতটা সম্ভব—তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের নিবন্ধ

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা কি সত্যিই শুরু হয়েছে

ধাতুর বাজার থেকে উধাও ২ ট্রিলিয়ন ডলার, সোনার ওপর আস্থা তলানিতে কেন

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কূটনৈতিক খেলোয়াড় হয়ে উঠল পাকিস্তান, ৬ চ্যালেঞ্জের মুখে ‘বিশ্বগুরু’ মোদি

ট্রাম্পের আচরণে ইসরায়েলে অস্বস্তি ও বিভ্রান্তি: ঘরে-বাইরে চ্যালেঞ্জের মুখে নেতানিয়াহু

আলোচনা বনাম অস্বীকার: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক রশি টানাটানির নেপথ্যে কী?

বিশ্ববাজারে কেন সোনা-রুপার দাম কমছে, আরও কত কমবে

স্যামসন অপশন: ইসরায়েলের পরমাণু ডকট্রিন কেন বিশ্বের জন্য হুমকি

ইরান ফাঁদে পা দিয়ে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ডোবাচ্ছেন ট্রাম্প