টানা দুই সপ্তাহের বিধ্বংসী আক্রমণের পর ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্র তার ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত হয়েছেন। দেশটির নৌবাহিনী ধ্বংসপ্রাপ্ত, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মাটির নিচে চাপা পড়েছে। এমনকি দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সদর দপ্তরও এখন ধ্বংসস্তূপ।
কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্র দুর্বল হলেও দম এখনো ফুরিয়ে যায়নি। খামেনির কট্টরপন্থী ছেলে মোজতবা খামেনিকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়ে ইসলামিক রিপাবলিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে ইরান। এই ‘আহত ইরান’ এখন আগের চেয়েও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।
ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বর্তমান লক্ষ্য অত্যন্ত সাধারণ, কিন্তু অর্জনযোগ্য, টিকে থাকা। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানি জনগণকে বিদ্রোহ করার আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু শুধু বিমান হামলার মাধ্যমে আইআরজিসি বা বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর মতো তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা নেটওয়ার্ককে নির্মূল করা সম্ভব নয়।
১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইরান যেভাবে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছিল, এবারও তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। আইআরজিসি তার হারানো মর্যাদা ফিরে পেতে এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করতে আরও উগ্র হয়ে উঠতে পারে।
ইরান জানে যে তারা সামরিকভাবে আমেরিকা বা ইসরায়েলকে পরাজিত করতে পারবে না। তাই তারা তাদের পুরোনো এবং পরীক্ষিত কৌশল আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদে ফিরে যেতে পারে। তৃতীয় কোনো দেশে অবস্থানরত আমেরিকান, ইসরায়েলি বা ইউরোপীয় নাগরিকেরা সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনায় ইহুদি কেন্দ্রে হামলা কিংবা ২০১২ সালে বুলগেরিয়ায় ইসরায়েলি পর্যটকদের ওপর হামলার মতো ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্য কোনো শক্তিশালী নৌবাহিনী বা মিসাইল প্রোগ্রামের প্রয়োজন হয় না, কেবল ‘ইচ্ছা’ এবং ‘লক্ষ্য’ থাকলেই চলে।
আলী খামেনির একটি ধর্মীয় ফতোয়া ছিল যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। কিন্তু খামেনির মৃত্যুর পর সেই ফতোয়া এখন আর বাধ্যতামূলক নয়। নতুন নেতা মোজতবা খামেনি তার শাসনের অস্তিত্ব রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্রকেই একমাত্র ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’ হিসেবে বেছে নিতে পারেন। সামরিকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়া একটি দেশ যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখন তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত ঝুঁকি নিতে দ্বিধা করে না।
নিজের আকাশসীমা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে তেহরান এখন পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। পারস্য উপসাগরের দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে এবং তেলের সরবরাহ ব্যাহত করে ওয়াশিংটনকে পিছু হটতে বাধ্য করাই তাদের কৌশল। যদিও ড্রোন ও মিসাইলের সংখ্যা সীমিত, তবুও অল্প কিছু সফল হামলা বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামানোর জন্য যথেষ্ট।
ইরানের সামনে একটি বিকল্প পথও আছে, ওয়াশিংটনের সাথে চুক্তি করে নিজেদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করা এবং নিষেধাজ্ঞার কবল থেকে মুক্তি পাওয়া। কিন্তু মোজতবা খামেনি, যার পরিবারের সদস্যরা এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁর পক্ষে এই আপস করা প্রায় অসম্ভব।
প্রজ্ঞা বা দূরদর্শিতা কখনোই এই ধর্মতান্ত্রিক শাসনের বৈশিষ্ট্য ছিল না। তারা জনগণের মঙ্গলের চেয়ে নিজেদের আদর্শিক অ্যাজেন্ডাকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। ফলে এই যুদ্ধ শেষে ইরান হয়তো একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশ হবে, কিন্তু তার নেতৃত্বে থাকা ক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধপরায়ণ গোষ্ঠীটি বিশ্বকে আরও অন্ধকার এবং বিপজ্জনক পথে নিয়ে যেতে পারে।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ