২০২৬ সালের মার্চ মাস বিশ্ব ইতিহাসের এক সংকটময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ বাহিনীর মধ্যে চলমান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রই বদলে দিচ্ছে না, বরং বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের সামরিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতিকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু এবং সামরিক অবকাঠামোর ধস, অন্যদিকে একটি নতুন ‘মাঝারি পাল্লার যুদ্ধের’ ফাঁদে পা দিয়েছে আমেরিকা—সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে পৃথিবী।
আমেরিকা ইতিমধ্যে এই যুদ্ধে অনেকখানি সফল, কারণ তারা ইরানের মূল শক্তির জায়গাগুলোতে (ক্ষেপণাস্ত্র, পারমাণবিক স্থাপনা এবং নেতৃত্ব) বড় ধরনের আঘাত হানতে পেরেছে। তবে কোন সব লক্ষ্য পূরণ হলে মার্কিনরা যুদ্ধ থামাতে পারেন, তা নিয়ে একটি বিশ্লেষণ দিয়েছেন আটলান্টিক কাউন্সিলের স্কোক্রফট সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির অধীনে ‘অ্যাড্রিয়েন আরশট ন্যাশনাল সিকিউরিটি রেজিলিয়েন্স ইনিশিয়েটিভ’-এর পরিচালক অ্যান্ড্রু এল. পিকে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় জয় হলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা এবং পারমাণবিক প্রকল্পের গতি কমিয়ে দেওয়া। যদি যুদ্ধ এমনভাবে শেষ হয়, যেখানে ইরান তার এই সক্ষমতাগুলো অদূর ভবিষ্যতে আর পুনর্গঠন করতে না পারে, তবে সেটি হবে ওয়াশিংটনের জন্য একটি বড় কৌশলগত বিজয়।
ইরান বর্তমানে তেলের বাজার অস্থির করতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু পিকের মতে, ইরানের নিজেরও তেল বিক্রি করে রাজস্ব প্রয়োজন। তাই যদি কোনো বড় ধরনের সংঘাত ছাড়াই প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়া যায় এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়, তবে সেটি হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধের একটি গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছু পরিস্থিতি ‘বিপজ্জনক’ হয়ে উঠতে পারে, যা যুদ্ধের সাফল্যকে ম্লান করে দেবে। যদি ইরানে একটি বড় ধরনের বিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধে এবং শাসকগোষ্ঠী তা নিষ্ঠুরভাবে দমন করে, তবে সেটি আমেরিকার জন্য নৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করবে। যদি এই যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে বা বিদেশে কোনো বড় ধরনের প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা ঘটে, তবে যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং ওয়াশিংটনকে আরও বড় কোনো সামরিক অভিযানে জড়াতে বাধ্য হতে পারে।
ইরান যদি সরাসরি যুদ্ধের বদলে দীর্ঘমেয়াদি ‘গেরিলা’ বা ‘প্রক্সি’ যুদ্ধের পথে হাঁটে, তবে সেটি হবে আমেরিকার জন্য একটি ‘মিডল-সাইজড ওয়ার’ বা মাঝারি পাল্লার যুদ্ধের ফাঁদ।
সহজ কথায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য সমাপ্তি হলো, ইরানকে এতটাই দুর্বল করে দেওয়া যাতে সে আর আঞ্চলিক হুমকি হতে না পারে, কিন্তু দেশটিকে এমনভাবে ধ্বংস না করা যাতে সেখানে চরম অরাজকতা তৈরি হয় বা আমেরিকাকে সরাসরি ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি দায়ভার নিতে হয়।
আটলান্টিক কাউন্সিল থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ