প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মার্কিন নেতারা, এমনকি সম্ভবত জনগণও ইরানকে ‘হাড়ে মজ্জায় দুষ্ট রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখে এসেছে। তেহরানের অপরিবর্তিত আমেরিকাবিরোধী আদর্শ এবং ধর্মীয় কঠোর নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কল্পনায় একে অন্য কঠিন প্রতিপক্ষদের থেকেও আলাদা করে তুলেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দীর্ঘদিনের গৎবাঁধা এক ধারণা তুলে ধরে দেশটির শাসকদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এঁরা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় খাঁটি ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিতে। এভাবেই তারা সিদ্ধান্ত নেয়। তাই ইরানের সঙ্গে চুক্তি করা কঠিন।’
ওয়াশিংটনে ইরান সম্পর্কে আলোচনায় এ ধরনের বক্তব্য এতটাই সাধারণ ছিল যে প্রায় কেউই তা খেয়াল করেনি। কিন্তু ওয়াশিংটনের গভীরে প্রোথিত এই প্রবল ইরানবিরোধী মনোভাবই ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করতে সাহায্য করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আংশিকভাবে তৈরি হয়েছে ইরানের কয়েক দশকের কর্মকাণ্ড থেকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের সময় তেহরানে মার্কিন কূটনীতিকদের জিম্মি করার ‘আদি পাপ’ থেকে শুরু করে, পুরো অঞ্চলে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দীর্ঘদিনের সমর্থন এবং বিশ্বজুড়ে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড পর্যন্ত; যার সবকিছুই ২০০০ সালের শুরুর দিকে শুরু হওয়া পারমাণবিক অচলাবস্থার কারণে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
তবে বর্তমান যুদ্ধকে কেবল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শত্রুতার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায় না। গভীর বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও, আগের কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট এত দূর যাননি। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি মূলত নিয়ন্ত্রণ বা ‘কনটেইনমেন্ট’-এর দিকেই ঝুঁকেছে। সেখানে যুদ্ধের বদলে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক প্রতিরোধের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের পরপর প্রশাসনই ইরানের সঙ্গে মতপার্থক্য মেটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় জায়গার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বারবার স্থায়ী অগ্রগতির সম্ভাবনা নষ্ট করেছে। আগের প্রশাসনগুলো সামরিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করেছে, ঝুঁকি বেশি এবং ফলাফল অনিশ্চিত বলে মনে করে। এখন পর্যন্ত তাই ছিল।
কূটনীতির বদলে যুদ্ধকে বেছে নেওয়ার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত একদিকে দীর্ঘদিনের সংঘাতমুখী মনোভাব ও নীতির ধারাবাহিকতা। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো এটি একটি মৌলিক বিচ্যুতি, যা যুক্তরাষ্ট্রকে এমন এক পথে নিয়ে যাচ্ছে যা দিয়ে ইরান সমস্যার ‘সমাধান’ করার সম্ভাবনা কম। ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি এমন কাজ করেছেন যা কোনো আগের প্রেসিডেন্টের ‘সাহস’ ছিল না। কিন্তু তাঁর এই বাড়াবাড়ি গৌরব নয়, কুখ্যাতিই বয়ে আনবে এবং এর ভয়াবহ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিণতি তাঁর প্রেসিডেন্সির চেয়েও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার আগে কয়েক মাস ধরে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার যুদ্ধ এড়াতে সত্যিকারের কোনো কূটনৈতিক চুক্তির চেষ্টা করছিলেন—এমনটা মনে হয় না। গত জুনে ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে কূটনৈতিক আলোচনার মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নজির চুক্তির সম্ভাবনার জন্য ভালো লক্ষণ ছিল না। তার ওপর পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র ইস্যুতে অবস্থানের বিশাল ফারাক এবং ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ দাবিগুলো পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। এসব দাবি ছিল—এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে যে, জুনের যুদ্ধের পর ইরান এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে আগে অসম্ভব বলে মনে হওয়া শর্ত—যেমন শূন্য পর্যায়ে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ—মেনে নিতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের আলোচক দলের কারিগরি দক্ষতার অভাব, এমনকি পারমাণবিক ফাইলের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কেও প্রাথমিক ধারণার ঘাটতি, আলোচনার গুরুত্ব নিয়ে আরও সন্দেহ সৃষ্টি করে। জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভের পর ট্রাম্পের সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি এবং ‘সহায়তা আসছে’ ধরনের প্রতিশ্রুতি আলোচনার সময় জুড়ে দ্ব্যর্থক বার্তা পাঠায়, যা ইঙ্গিত দেয় তাঁর লক্ষ্য হয়তো কেবল পারমাণবিক বা বিস্তৃত চুক্তি নয়, বরং শাসন পরিবর্তন।
ইরানের সঙ্গে কূটনীতির প্রতি ট্রাম্পের অনাগ্রহ প্রতিশ্রুতি নজিরবিহীন নয়। এটি ইরানিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বিধা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ‘স্বাভাবিক’ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না—এই মানসিকতার ধারাবাহিকতা। প্রকৃতপক্ষে ইরানকে অস্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখার ন্যারেটিভ এবং দেশটিকে ‘অশুভ’ ও ‘উন্মাদ’ বলে চিহ্নিত করার ভাষা—ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি তৈরি করে। রুবিও একা নন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আগের বক্তব্য ও লেখায় কূটনীতি সম্পর্কে একই ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন এবং কোনো ইরানি নেতাকে মধ্যপন্থী হিসেবে দেখার ধারণাকেও প্রত্যাখ্যান করেছেন। গত ৪০ বছরে ইরান সম্পর্কে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা অপরিবর্তিত রয়েছে তা বোঝাতে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ক্যাসপার ওয়েনবার্গ একবার মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইরানে একমাত্র মধ্যপন্থীরা...কবরস্থানে রয়েছে।’
মার্কিন সরকারের সবাই ইরানকে কেবল ইসলামি আদর্শে চালিত এক অযৌক্তিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখেননি। বহু বছরের গোয়েন্দা মূল্যায়নে বরং ইরানের আচরণকে যুক্তিবাদী—যদিও বিপজ্জনক ও চরমপন্থী—আচরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিন্তু জনপরিসরের আলোচনা, যা প্রায়ই নীতিনির্ধারণী বিতর্কেও প্রতিফলিত হয়, ঘুরপাক খায় ইরানের অযৌক্তিকতা ও উগ্রতার ধারণাকে কেন্দ্র করে। এমন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে প্রশ্ন জাগে, কূটনীতির সম্ভাবনা যাচাই করতে গিয়ে কেন মার্কিন নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক পুঁজি খরচ করবেন? ইরান সম্পর্কে এই বিস্তৃত ধারণাই ব্যাখ্যা করে কেন জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি জুড়ে ট্রাম্প খুব সামান্য অভ্যন্তরীণ বিতর্ক বা উল্লেখযোগ্য প্রতিবাদ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পেরেছিলেন, এমনকি ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতাদের কাছ থেকেও তেমন প্রতিরোধ আসেনি।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ঠিক এই রাজনৈতিক পরিবেশই ব্যাখ্যা করে কেন কূটনীতি বারবার ব্যর্থ হয়েছে। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনায় প্রলুব্ধ হয়েছিলেন, যেন ‘নিক্সন চীনে যাচ্ছেন’ ধরনের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু সেই মুহূর্ত আর আসেনি। এর পেছনে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইরানের বৈরী অবস্থান ও কূটনীতিকে দুর্বল করে দেওয়া তার সামরিক নীতিই দায়ী নয়; ওয়াশিংটনের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতাও নতুন সুযোগ পরীক্ষা করার পরিসর সংকুচিত করেছে। ইরানকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষ বাষ্প শুরু হয়েছিল জিম্মি সংকট ও কার্টার প্রশাসনের ব্যর্থ উদ্ধার অভিযানের সময় থেকে। আর রিগ্যানের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর তা আরও গভীর হয়। ওই কেলেঙ্কারির রাজনৈতিক অভিঘাত ভবিষ্যতে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলেছিল।
এরপর, ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অধীনে স্বাক্ষরিত ইরান পারমাণবিক চুক্তি, যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের গতানুগতিক ধারা ভাঙতে সবচেয়ে দূর পর্যন্ত এগিয়েছিল। কিন্তু মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে এটি এতটাই বিতর্কিত ছিল এই চুক্তিকে কেউ কেউ মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ‘ওবামাকেয়ার’ বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন। এটিও সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারেনি। চুক্তির সমর্থক ডেমোক্র্যাটরাও ইরানের বিরুদ্ধে ‘কঠোর অবস্থান’ বজায় রাখার প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন এবং ইরানের ওপর অব্যাহত চাপ বজায় রাখতে সমর্থন দেন, যা শেষ পর্যন্ত ইরান যে নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার সুবিধা প্রত্যাশা করেছিল সেটিকে সীমিত করে দেয়।
প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের ইরান নীতি দীর্ঘদিনের মার্কিন অবস্থান থেকে মৌলিকভাবে খুব বেশি বিচ্যুত হয়নি। অবশ্যই তিনি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে আসেন। এই চুক্তিকে তিনি ‘সবচেয়ে খারাপ চুক্তি’ বলেন। এই সিদ্ধান্ত ছিল এক বড় ধাক্কা, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনার অবসানের সূচনা ঘটায়। তাঁর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি পূর্বসূরিদের তুলনায় আরও কঠোর ছিল। বিশেষ করে কঠোরভাবে গৌণ নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করে ইরানের তেল রপ্তানির সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। তবু ট্রাম্পও তাঁর পূর্বসূরিদের মতোই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করার ধারণায় মুগ্ধ ছিলেন। তাঁর প্রেরণা হয়তো আগের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় বেশি ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ছিল। কারণ তিনি বারবার দাবি করতেন যে তিনি ওবামার চেয়ে ‘ভালো’ চুক্তি করতে পারবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর আগ্রহ বাস্তব কোনো চুক্তি নয়, কেবল আলোচনার কথাবার্তায় সীমাবদ্ধ ছিল, আর এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়েই চলেছিল।
তবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-ইরান মুখোমুখি অবস্থানে একটি বড় সীমা অতিক্রম করেন ২০২০ সালে ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে। যদিও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হামলাটি চালানো হয়েছিল ইরানের ভূখণ্ডে নয়, ইরাকে অবস্থানকালে। এই অর্থে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের নীতিগুলো মূলত আগের প্রশাসনগুলোর মতোই ইরানের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা এড়িয়ে চলার প্রবণতা বজায় রেখেছিল এবং দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক প্রতিরোধভিত্তিক কৌশলই অনুসরণ করেছিল। অর্থাৎ, শাসন পরিবর্তন বা সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মতো মৌলিক রূপান্তরমূলক লক্ষ্য তখনো বাস্তবসম্মত ছিল না।
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও একইভাবে দীর্ঘদিনের মার্কিন নিয়ন্ত্রণ নীতি বজায় রাখেন। যদিও তাঁর ক্ষমতার শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল তিনি ট্রাম্পের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত উল্টে দেবেন। অভ্যন্তরীণ অগ্রাধিকারগুলো ইরানের সঙ্গে কূটনীতি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে যায়। পরে যখন মার্কিন কর্মকর্তারা আলোচনায় ফিরে আসেন, তখন তারা নতুন চুক্তি আরও অনুকূল শর্তে আদায় করার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব কতটা সীমিত তা বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হন, বিশেষ করে ২০২১ সালের জুনের নির্বাচনের পর ইরানে আরও কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটে।
এরপর ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ শুরু হওয়া এবং ইরানে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের উত্থান কূটনীতির প্রতি রাজনৈতিক আগ্রহ আরও কমিয়ে দেয়। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমিত উত্তেজনা প্রশমনের আলোচনা ব্যাহত করে এবং ২০২৪ সালের এপ্রিল ও অক্টোবরে ইসরায়েল-ইরান পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে দুই দেশকে সরাসরি সংঘাতে ঠেলে দেয়। তবে এসব ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা মূলত ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তায় সীমাবদ্ধ ছিল; বাইডেন প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক যুদ্ধ শুরু করতে আগ্রহী ছিল না।
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এসে সবকিছু বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতিকে আগের অবস্থায় ফেরানোর বদলে, ট্রাম্প নজির ভেঙে ২০২৫ সালের জুনে প্রথমে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালান এবং পরে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণে অংশ নেন। এতে শুরু হয় চলমান যুদ্ধ, যার লক্ষ্য খোলা-মেলা এবং অস্পষ্ট। যুদ্ধের প্রথম ধাক্কাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ও শীর্ষ নেতৃত্ব নিহত হন। একই সঙ্গে যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের বক্তব্যে প্রথমবারের মতো ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য নীতিতে পরিণত হয়। এমনকি জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের কট্টরপন্থী নব্য-রক্ষণশীলরাও এত উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নিতে সাহস করেননি।
এখন ট্রাম্প এমন কিছু অর্জনের চেষ্টা করছেন, যা আগে অসম্ভব বলে ধরা হতো—বাইরের সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করা। সম্ভাব্য শেষ পরিণতি হিসেবে তিনি বারবার ভেনেজুয়েলা মডেলের কথা বলেছেন। অর্থাৎ কম খরচের যুদ্ধ, যার ফলে এমন অনুগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, তারা গণতান্ত্রিক হোক বা না হোক। কিন্তু প্রায় তিন সপ্তাহের যুদ্ধের পর স্পষ্ট যে ইরানের মতো দেশে এই মডেল কাজ করবে না। সেখানে ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব ও সামরিক বাহিনী অনেক বেশি প্রোথিত এবং শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পাশাপাশি তাদের বদলে ক্ষমতা নেওয়ার মতো কোনো ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শক্তিও নেই। এই পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য যেন সরে এসে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা, বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন শক্তি কমিয়ে ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের জন্য হুমকি কমানো।
এমন অস্পষ্ট লক্ষ্য সাফল্য মাপা প্রায় অসম্ভব করে তোলে। তবুও ট্রাম্প যুদ্ধকে সফল ঘোষণা করেছেন, যদিও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে—এখনো অনেক কিছু করার বাকি। ইরানের নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোর ও অবাধ্য বলে মনে হচ্ছে। তারা বলছে, যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা ওয়াশিংটন ঠিক করবে না। তারা পুনরায় হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা চায় এবং নিজেদের দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিরোধক্ষমতা পুনর্গঠনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর বড় মূল্য চাপিয়ে দিতে আগ্রহী হতে পারে। ট্রাম্প যদি ইরানের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধও করেন, তবু ইসরায়েল সম্ভবত লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর আক্রমণ থামাবে না। সংক্ষেপে, এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে তা যেমন অনিশ্চিত, তেমনি ট্রাম্প কেন এটি শুরু করেছিলেন তার কারণও অস্পষ্ট। নিশ্চিত শুধু একটি বিষয়: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এড়িয়ে চলার দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতি তিনি ভেঙে দিয়েছেন।
প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন দেখতে চাইতেন, কিন্তু কেন আগের কেউ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনুমোদন দেননি তার কারণ আছে। বিশেষ করে এমন যুদ্ধ, যা তেহরানের কাছে শাসনব্যবস্থা উৎখাতের প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি ইরানের জনগণ নিজেরাই সরকারকে উৎখাত করত, সেটি ভিন্ন বিষয় হতো। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে এবং বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে যে বাইরের সামরিক শক্তি দিয়ে কোনো শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা, বিশেষ করে কেবল আকাশ শক্তি ব্যবহার করে, সাধারণত কার্যকর হয় না এবং বিপজ্জনক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এই ঝুঁকিগুলো বহুদিন ধরেই জানা ছিল এবং দশকের পর দশক ধরে তা নিয়ে লেখা ও আলোচনা হয়েছে। আরও কট্টর নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসতে পারে। শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে গৃহযুদ্ধ ও সশস্ত্র লড়াই শুরু হতে পারে, যা ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়বে। ইরানের পাল্টা আক্রমণ পুরো অঞ্চলকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যাহত করতে পারে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। সংঘাত বাড়তে বাড়তে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষরা এই অস্থিরতা থেকে লাভবান হতে পারে। এসব সম্ভাব্য ঝুঁকির অনেকগুলোই এখন বাস্তবে ঘটতে শুরু করেছে।
কিন্তু ট্রাম্প ও তাঁর শীর্ষ উপদেষ্টারা এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করেছেন। তারা বিশ্বাস করেছিলেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে ইসরায়েলের ধারাবাহিক আঘাতে তেহরান ও তার মিত্ররা দুর্বল ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে। ফলে ইরান আসলে কাগুজে বাঘে পরিণত হয়েছে। শাসনব্যবস্থা পতনের দাবিতে ইরানের নজিরবিহীন গণবিক্ষোভ এবং বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্মম দমনপীড়নকেও তারা এমন প্রমাণ হিসেবে দেখেছিলেন যে সরকার টালমাটাল অবস্থায় আছে এবং বাইরে থেকে সামান্য চাপ দিলেই চূড়ান্ত ধাক্কায় পড়ে যাবে।
এই যুদ্ধের উচ্চ ব্যয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে অজনপ্রিয় এবং পুরো অঞ্চল ও বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে, বিপজ্জনক মাত্রার অতিরিক্ত প্রসারতার ইঙ্গিত দেয়। যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবে এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে, তবে ট্রাম্প সম্ভবত আগের প্রেসিডেন্টদের মতোই এক বাস্তবতায় ফিরে যাবেন—কঠিন এক দেশের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্কের নেতিবাচক প্রভাব মেনে নিয়ে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা। বর্তমান নেতৃত্ব টিকে থাকলে সেই দেশ এখন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। দুঃখজনকভাবে, সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হোক বা বৈরী শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত অবসান ঘটানো হোক, কোনো পথই এখন আগের মতোই অধরা বলে মনে হচ্ছে।
অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান