হোম > বিশ্লেষণ

ইরান অভিযানের গোড়ায় গলদ, অন্ধকারে হাতড়াচ্ছেন ট্রাম্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসছিলেন ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ঠিক সেই মুহূর্তে আমেরিকা ও ইসরায়েল পূর্বপরিকল্পিত হামলা চালায়। তাদের লক্ষ্য ছিল এক আঘাতেই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া। হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের হিসেব ছিল, এই হামলার ফলে যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হবে, সেখানে ইরানেরই দ্বিতীয় সারির একদল নেতাকে বসিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে, যারা আমেরিকার প্রতি নমনীয় হবে এবং ইরানে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দফা হামলায় খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নিহত হন। কিন্তু যখন মাঠপর্যায়ের রিপোর্টগুলো আসতে শুরু করল, তখন দেখা গেল এক ভয়াবহ বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে যাদের কথা ভেবে রেখেছিল, সেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রায় সবাই এই ব্যাপক হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। ট্রাম্প নিজেও পরে স্বীকার করেছেন, তাঁদের পছন্দের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের অধিকাংশ মারা গেছেন এবং এখন যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁরাও হয়তো আর জীবিত নেই। এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি বিশাল অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কারণ, তাঁরা এখন কার সঙ্গে কথা বলবে বা কাকে ক্ষমতায় বসাবে, তা নিয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছে।

হোয়াইট হাউস শুরুতে এটি এক সপ্তাহের একটি সীমিত সামরিক অভিযান হবে ভেবেছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি এখন একটি অন্তহীন যুদ্ধে পরিণত হয়েছে; যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, অথচ আমেরিকা এই যুদ্ধ থেকে বেরোনোর কোনো সুনির্দিষ্ট পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরিবর্তে তারা আরও বেশি একতাবদ্ধ হয়েছে এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ইরান এখন পারস্য উপসাগরের তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যা সামাল দিতে ওয়াশিংটন রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে এই যুদ্ধকে একটি বিশাল সাফল্য হিসেবে প্রচার করছেন এবং যেকোনো মুহূর্তে বিজয়ের ঘোষণা দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে যুদ্ধের দুই সপ্তাহ পার হলেও প্রশাসনের ভেতরে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশল বা লক্ষ্য নির্ধারিত হয়নি। আমেরিকানদের মধ্যে এই যুদ্ধের প্রতি সমর্থন খুবই কম। প্রাথমিক জনমত জরিপগুলো বলছে, সাধারণ মানুষ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পক্ষে নয়। এখন পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং ১৪০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ব্যর্থতার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও কর্মকর্তারা এখনো বিভ্রান্ত যে কীভাবে এই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো যাবে।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট দাবি করেছেন, ট্রাম্প এবং তাঁর দল যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি সিএনএনকে বলেছেন, খামেনিকে হত্যার পর আরও কঠোর কোনো নেতা ক্ষমতায় আসতে পারেন, এমন ঝুঁকি সম্পর্কে ট্রাম্পকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। যদিও প্রশাসন একজন নমনীয় নেতা আশা করেছিল, তবুও বর্তমান পরিস্থিতি তাদের সম্পূর্ণ অজানা ছিল না। লেভিট আরও জানান, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা নিয়েও ট্রাম্পকে ব্রিফ করা হয়েছিল। গত বছর ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণ এবং কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার মতো পূর্ববর্তী সামরিক সাফল্যগুলো ট্রাম্পকে এই বিশ্বাস দিয়েছিল যে ইরান হয়তো খুব বেশি পাল্টা প্রতিরোধ গড়তে পারবে না। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক এক সফল অভিযান এবং ইরানের অভ্যন্তরে জানুয়ারি মাসের গণবিক্ষোভ মার্কিনিদের এই ধারণা দিয়েছিল যে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধের পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল বা এনএসসির যে সমন্বয়কারীর ভূমিকা থাকার কথা ছিল, তা এবার অনেকটাই দুর্বল ছিল। হোয়াইট হাউস গত এক বছরে এনএসসির পরিধি ছোট করে ফেলায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান ও সমন্বয়ে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা গেছে। পেশাদার আমলাদের পরামর্শের চেয়ে ট্রাম্প তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের আশাবাদী ধারণার ওপর বেশি নির্ভর করেছেন। যুদ্ধের শুরুতে প্রশাসনের মনোভাব ছিল অনেকটা ‘শক অ্যান্ড অউ’ বা শত্রুকে বড় আঘাত দিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার মতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানের সামরিক বাহিনী বা সাধারণ মানুষ কেউই মার্কিন শক্তির সামনে নতি স্বীকার করেনি। খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি দ্রুত সুপ্রিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নিয়েছেন। ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিদ্রোহের পরিবর্তে জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং ধর্মীয় উন্মাদনা বেড়েছে। তেহরানের বাসিন্দারা এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক স্থাপনায় মার্কিন বোমাবর্ষণের কঠোর নিন্দা জানাচ্ছেন।

যুদ্ধের প্রভাব কেবল ইরান বা আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশী দেশগুলো যারা এই যুদ্ধে জড়াতে চায়নি, তারাও এখন ইরানের পাল্টা হামলার শিকার হচ্ছে। নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনি সতর্ক করেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোকে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, অন্যথায় তাদেরও কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন মধ্যপ্রাচ্যে আটকে পড়া মার্কিন নাগরিকদের সরিয়ে নিতে ব্যস্ত। যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিন এই সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল ছিল। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট যখন নাগরিকদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়, ততক্ষণে অধিকাংশ বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই বিশৃঙ্খলা জার্মানির মতো ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্রদের মনেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার পর অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, এই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার কোনো যৌথ পরিকল্পনা আমেরিকার কাছে নেই।

অর্থনৈতিক ফ্রন্টে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি জ্বালানির দাম কমিয়ে আনবেন, কিন্তু যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আমেরিকার সাধারণ মানুষ এখন পেট্রলপাম্পে উচ্চমূল্যের ধাক্কা অনুভব করছে। রিপাবলিকান পার্টির জন্য এটি একটি রাজনৈতিক বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে জীবনযাত্রার ব্যয় একটি বড় ইস্যু হতে যাচ্ছে। পেন্টাগন হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে নৌবাহিনীর মাধ্যমে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা ভাবলেও তা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, ওই এলাকাটি এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক। ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের খাগ দ্বীপে বোমাবর্ষণ করেছেন এবং হুমকি দিয়েছেন, ইরান যদি জাহাজ চলাচলে বাধা দিলে তাদের তেলের অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান উভয় পক্ষের সদস্যরাই যুদ্ধের লক্ষ্য ও সময়সীমা নিয়ে প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাইছেন। স্টেট সেক্রেটারি মার্কো রুবিও ব্রিফিংয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন, যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন, চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে সব শেষ হবে। ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে ‘সাফল্য’ বলতে কী বোঝায়, তার কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। এমনকি কট্টর ইসরায়েলপন্থী ডেমোক্র্যাটরাও এখন হোয়াইট হাউসের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন। রিপাবলিকানরা এখন পর্যন্ত ট্রাম্পকে সমর্থন দিলেও মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ধৈর্যের বাঁধও ভেঙে যেতে পারে। যুদ্ধের ভয়াবহতা কেবল সামরিক ক্ষেত্রে নয়, বরং মানবিক দিক থেকেও ফুটে উঠেছে। ইরানের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন হামলায় ১৬৮ জন শিশুর মৃত্যু এক গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের এই ইরান অভিযান একটি অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ পথে অগ্রসর হচ্ছে। যদিও ট্রাম্প তাঁর সহজাত আশাবাদ নিয়ে বলছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে এবং আমেরিকা চূড়ান্ত বিজয় লাভ করবে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারকে এক দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলে দিয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারাও এখন ভয় পাচ্ছেন যে সামরিক বিজয় হয়তো আসবে, কিন্তু এর পরে ইরানের নেতৃত্বে কারা আসবে এবং তারা আমেরিকার প্রতি কতটা শত্রুভাবাপন্ন হবে, তা এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ। যুদ্ধের তৃতীয় সপ্তাহে পা দিয়েও ট্রাম্প প্রশাসন এখনো কোনো কার্যকর প্রস্থান কৌশল বা ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ তৈরি করতে পারেনি, যা এই যুদ্ধকে একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যয়বহুল সংঘাতে পরিণত করার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। ফল এটি স্পষ্ট যে ট্রাম্পের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অন্ধকার কূপের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সিএনএন থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা কৌশলে আক্রমণাত্মক মোড়

‘কাজ না করলে না খেয়ে মরব’—মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন

ইরান যুদ্ধ যেভাবে আরও জটিল, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে

হরমুজ প্রণালি এত সহজে কীভাবে বন্ধ করতে পারল ইরান

নিজের শুরু করা সংঘাত ট্রাম্পের গলার কাঁটা, এখন বন্ধ করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্য হারাবে যা

ইরানের অল-আউট গেমপ্ল্যান: লক্ষ্য বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসরোধ করে মার্কিন অহংকারকে নতজানু করা

ইরানে ইসলামিক রিপাবলিক ২.০ আসছে, কেমন হবে এটি

ইরান যুদ্ধের সাতপাকে আটকে গেছে ট্রাম্পের জয়

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ক্লাস্টার ওয়ারহেড, চ্যালেঞ্জের মুখে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ইরান থেকেই কি শুরু হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ