৬ মার্চ ট্রাম্প প্রশাসন বহুল প্রতীক্ষিত ‘জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশল’ প্রকাশ করেছে। এটি সাইবার স্পেসে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা এবং বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব বজায় রাখার এক উচ্চাভিলাষী রূপরেখা। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের বিস্তারিত কৌশলের তুলনায় এবারের দস্তাবেজটি আকারে কিছুটা সংক্ষিপ্ত হলেও এতে আগের পদ্ধতির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে এবং সেই সঙ্গে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনও দেখা গেছে। এই কৌশলে ছয়টি ভাগের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতের সাইবার যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো মার্কিন সাইবার কৌশলে আক্রমণাত্মক বা ‘অফেনসিভ’ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ।
এমনটি মনে করছেন দিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের রিসার্চ অ্যানালিস্ট রোহিত কুমার শর্মা।
শর্মা মনে করেন, এই কৌশলের প্রথম ভাগেই স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, শত্রুপক্ষকে নিবৃত্ত করতে বা তাদের হামলার জবাব দিতে আমেরিকা এখন সরাসরি আক্রমণাত্মক সাইবার অভিযান পরিচালনা করবে। আমেরিকা শুধু শত্রুর ওপর বড় ধরনের ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যই নির্ধারণ করেনি, বরং মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে মিলে সম্মিলিত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও জোর দিয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখন থেকে সাইবার অভিযান শুধু ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; একে প্রথাগত সামরিক শক্তি এবং অন্যান্য অসামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ‘ক্রস-ডোমেইন’ অপারেশন হিসেবে পরিচালনা করা হবে। শত্রুপক্ষের জন্য বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকেও এই ধরনের আক্রমণাত্মক অভিযানে সম্পৃক্ত করার এক সাহসী প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
কৌশলের অন্যান্য ভাগে সাইবার রেগুলেশন আধুনিকীকরণ, ফেডারেল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; বিশেষ করে কোয়ান্টাম-পরবর্তী ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং এআইচালিত সাইবার সমস্যার সমাধানগুলো একীভূত করার কথা বলা হয়েছে। চতুর্থ ভাগে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং প্রতিকূল দেশগুলোর পণ্য ও বিক্রতাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান যুগে এআইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে এই কৌশলে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নেটওয়ার্ক সুরক্ষায় স্বয়ংক্রিয় বা ‘এজেন্টিক এআই’ ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং দক্ষ জনশক্তিকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সঙ্গে বর্তমান কৌশলের প্রধান পার্থক্য হলো এর ভাষায়। আগেরবার সাইবার অভিযানকে জাতীয় ক্ষমতার অন্যতম সাধারণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়েছিল, কিন্তু এবার সরাসরি ‘আক্রমণাত্মক সাইবার অপারেশন’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করে আমেরিকার আক্রমণাত্মক মেজাজ প্রকাশ করা হয়েছে। বেসরকারি খাতের ভূমিকাকে এখন শুধু তথ্য বিনিময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সরাসরি শত্রুর অবকাঠামো ধ্বংস করার কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে বিতর্কিত ‘হ্যাক ব্যাক’ বা পাল্টা হ্যাকিংয়ের ধারণাটি ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বীকৃত হওয়ার পথ প্রশস্ত হচ্ছে। তবে এটি আইনি ও ব্যবহারিক দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে; কারণ, প্রথাগতভাবে সাইবার যুদ্ধ শুধু রাষ্ট্রের একচ্ছত্র অধিকার। বেসরকারি কোম্পানিগুলো যদি এই যুদ্ধে জড়ায়, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন ও তাদের নিজস্ব নিরাপত্তার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে; বিশেষ করে যখন সিআইএসএর মতো সংস্থার জনবল কমানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে, তখন বেসরকারি খাতের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কৌশলটিতে আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বা দ্বিমুখী নীতির প্রকাশ। আমেরিকা যেমন নিজেদের বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে আক্রমণাত্মক সাইবার কাজে উৎসাহিত করছে, তেমনি বিদেশি স্পাইওয়্যার উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও বলছে। এ ছাড়া অতীত অভিযানের উদাহরণ দিয়ে (ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা বা ভেনেজুয়েলার মাদুরোকে তুলে নিয়ে যাওয়া) বোঝানো হয়েছে যে আক্রমণাত্মক সাইবার সক্ষমতা এখন মার্কিন সামরিক ও আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাম্প্রতিক ইরান-ইসরায়েল যৌথ সাইবার হামলা এই কৌশলেরই বাস্তব প্রতিফলন। জেনারেল ড্যান কেইন যেমন জানিয়েছেন, সাইবার কমান্ড এখন প্রথাগত যুদ্ধের আগেই শত্রুর সক্ষমতা ধ্বংস করতে ‘সিনক্রোনাইজড’ বা সমন্বিত আঘাত হানছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে দেখা গেছে, বছরের পর বছর ধরে চালানো সাইবার নজরদারির মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই নিখুঁত ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্ভব হয়েছে। তেহরানের ট্রাফিক ক্যামেরা হ্যাক করা বা মোবাইল নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করে লক্ষ্যবস্তুর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার তথ্য সংগ্রহ করা এখন সাইবার অপারেশনের নিয়মিত অংশ। একে বলা হচ্ছে ‘লেয়ারিং’, যেখানে প্রথাগত যুদ্ধের আগে সাইবার হামলা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মাধ্যমে শত্রুকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বা পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতগুলো প্রমাণ করছে, সাইবার সক্ষমতা এখন যুদ্ধের পূর্বে, চলাকালে এবং যুদ্ধ শেষের পরেও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এই রণকৌশলকে জাতীয় নীতি হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মাধ্যমে আমেরিকা আসলে সাইবার স্পেসের প্রচলিত নিয়মকানুন ও সুশাসনের ধারণাকে এক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মনোহর পারিকর ইনস্টিটিউট থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ