হোম > বিশ্লেষণ

শুধু জ্বালানি তেল নয়, খাদ্যসংকট তৈরির হাতিয়ারও ইরানের হাতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

হরমুজ প্রণালির কাছে ইরানি নৌবাহিনীর মহড়া। ফাইল ছবি

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, বরং আধুনিক বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য এক মহাবিপৎসংকেত। এই ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত জলপথটি কেন বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক অপরিহার্য ধমনি এবং এর পতনে কেন পুরো বিশ্ব থমকে যেতে পারে, সেটি নিয়েই এখানে একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে:

১. অ্যাওর্টিক ভালভ ও বৈশ্বিক উৎপাদন চক্র

হরমুজ প্রণালিকে কেবল জ্বালানি করিডর হিসেবে দেখা একটি বড় ভুল। এটি আধুনিক বৈশ্বিক উৎপাদনের ‘অ্যাওর্টিক ভালভ’। যখন এই ভালভ বা কপাটটি বন্ধ হয়, তখন পুরো সঞ্চালন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

প্রণালিটি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ৬০% জ্বালানি (তেল ও গ্যাস) বহন করলেও বাকি ৪০% বহন করে আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি। সার তৈরির কাঁচামাল ইউরিয়া, অবকাঠামোর জন্য অ্যালুমিনিয়াম এবং সেমিকন্ডাক্টরের জন্য হিলিয়াম—সবই এই পথ দিয়ে নেওয়া হয়।

খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি: বিশ্বের ৩০% অ্যামোনিয়া এবং ৫০% ইউরিয়া বাণিজ্য এই পথ দিয়ে হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে উত্তর গোলার্ধে সার প্রয়োগের যে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে, মার্চের এই সংকট সরাসরি সেপ্টেম্বরের ফসল উৎপাদন কমিয়ে দেবে। অর্থাৎ, আজকের যুদ্ধ আগামী শরতের দুর্ভিক্ষের কারণ হতে পারে।

২. ফ্যান্টম ব্লকেড: বিমা যখন আধুনিক নৌবাহিনী

১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় পাঁচ শতাধিক জাহাজে হামলা হলেও বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সংকট ভিন্ন। এবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিমা কোম্পানিগুলো তাদের সেবা স্থগিত করে দিয়েছে। এটিকে বলা হচ্ছে ‘ফ্যান্টম ব্লকেড’ বা ছায়া অবরোধ।

ভৌগোলিক বা সামরিক বাধার চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিমার অনুপস্থিতি। বিমা ছাড়া কোনো বাণিজ্য জাহাজ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে চলতে রাজি নয়। ফলে প্রণালিটি আপাত মুক্ত থাকলেও আর্থিকভাবে এটি এখন রুদ্ধ।

৩. এশিয়ার বিকল্পহীনতা ও কয়লার প্রত্যাবর্তন

এশিয়ার দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জ্বালানি আমদানির জন্য হরমুজের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল।

জাপানের ইউটার্ন: এত দিন পরিবেশ রক্ষার কথা বলে কয়লা থেকে দূরে সরলেও জাপান এখন দ্রুত তাদের কয়লা নীতি শিথিল করছে। এটি প্রমাণ করে, সংকটকালে ‘গ্রিন এনার্জি’ বা সবুজ জ্বালানির চেয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা দেশগুলোর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের জ্বালানি সুরক্ষা: চীন ২০২১ সাল থেকেই রেকর্ড পরিমাণ কয়লা মজুত ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়েছিল, যা তাদের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কিছুটা সাহায্য করছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এটি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রাকে হুমকির মুখে ফেলছে।

৪. উপসাগরীয় দেশগুলোর কাঠামোগত ভঙ্গুরতা

আরব দেশগুলো আর্থিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ হলেও তারা কাঠামোগতভাবে এই একটি মাত্র জলপথের ওপর নির্ভরশীল।

সৌদি আরব ও কাতার: সৌদি আরব তাদের খাদ্যের ৮০% এবং কাতার ৮৫% আমদানি করে। টাকা থাকলেও যদি পরিবহন পথ বন্ধ থাকে, তবে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব। ওমানের সালালাহ বা দুকম বন্দরকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হলেও ড্রোন হামলা সেই পথকেও অনিরাপদ করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট তিনটি বড় শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে:

১. হরমুজ প্রণালিকে কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং ‘গ্লোবাল ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বহুজাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

২. তেলের পাশাপাশি সার ও ধাতব পদার্থের কৌশলগত মজুত গড়ে তুলতে হবে।

৩. একক কোনো ভৌগোলিক পথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

‘হরমুজ’ এখন চরম বিশৃঙ্খলার কেন্দ্রবিন্দু। এই সংকট প্রমাণ করেছে, বিশ্বায়ন যখন কেবল খরচে সাশ্রয়ের দিকে মনোযোগ দেয়, তখন তা পদ্ধতিগত ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে। হরমুজের এই ‘স্ট্রেস টেস্ট’ বা অগ্নিপরীক্ষায় বিশ্ব অর্থনীতি কতটুকু টিকে থাকবে, তা নির্ভর করবে দেশগুলোর দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার ওপর।

খারগ দ্বীপের দখলে ভেঙে পড়বে আইআরজিসি, শেষ হবে যুদ্ধ: হোয়াইট হাউস

ইরান যুদ্ধ যেভাবে ধসিয়ে দিতে পারে পেট্রোডলারের একাধিপত্য

জ্বালানি সংকটে ফের কয়লায় ঝুঁকছে এশিয়া

কূটনীতি ব্যর্থ হলে যুদ্ধ পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে হিলিয়াম সংকট—ব্যাহত হতে পারে এমআরআই সেবা

বাংলাদেশ যে কারণে এশিয়ার উন্নয়ন মডেলের সর্বশেষ উদাহরণ হতে পারে

মধ্যপ্রাচ্যে কোন ধরনের সেনা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, তাদের কাজ কী

আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থানে কে—ইরান না যুক্তরাষ্ট্র?

ইউক্রেনে রাশিয়ার কৌশল যেভাবে কাজে লাগাচ্ছে মিয়ানমার জান্তা

ইরান যুদ্ধে ‘ইয়ো-ইয়ো’ নীতি: শুরু থেকে যেসব পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন ট্রাম্প