আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যখনই ইরানের সামরিক সক্ষমতার বিষয়টি নিয়ে কথা ওঠে, তখনই আলোচনা গিয়ে ঠেকে একটি নামেই—কুদস ফোর্স। নামটি পরিচিত, দৃশ্যমান এবং তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাব বোঝাতে সুবিধাজনক। কিন্তু যখন দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থেকে হঠাৎ স্বল্পমেয়াদি সংঘর্ষের প্রসঙ্গে আলোচনা ঘুরে যায়, তখন এই কাঠামোটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে আড়ালে ফেলে।
ইরানে যদি কোনো সীমিত আক্রমণ ঘটে, ধরা যাক কোনো দ্বীপ, বন্দর কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর, তখন প্রথমে উপস্থিত হবে না কুদস ফোর্স। বরং যে ইউনিটগুলো প্রথম প্রতিক্রিয়া দেখাবে এবং প্রথম কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতির গতিপথ নির্ধারণ করবে, সেগুলো অনেক কম পরিচিত। আর সেটি এই কারণে নয় যে তারা (কুদস ফোর্স) নেই, বরং কারণ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামরিক কাঠামো কখনো একটি একক এলিট বাহিনীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেনি।
এর বদলে রয়েছে একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো, যা একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এখানে ‘স্পেশাল ফোর্স’ কোনো ব্র্যান্ড নয়, বরং একটি কার্যগত ধারণা।
এই কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি), বিশেষ করে এর স্থলবাহিনী। এর ভেতরে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এবং প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা হয়, তা হলো ‘সাবেরিন।’ এটিকে অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট ইউনিট হিসেবে বর্ণনা করা হয়, কিন্তু বাস্তবতা তার চেয়ে জটিল। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি শ্রেণি বা সক্ষমতার সেটের মতো কাজ করে, যা বিভিন্ন ইউনিটে ছড়িয়ে থাকা বিশেষ অভিযানের দক্ষতাকে নির্দেশ করে।
এই ইউনিটগুলো প্রশিক্ষিত হয় হঠাৎ হামলা, হেলিকপ্টার থেকে নামানো অভিযান এবং কঠিন ভূখণ্ডে লড়াইয়ের জন্য। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলো ইরানের বিভিন্ন প্রাদেশিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। পূর্ববর্তী প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাবেরিন ধরনের ইউনিটগুলো আঞ্চলিক কর্পস পর্যায়ে কাজ করে এবং বিভিন্ন অপারেশনাল অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়—উত্তর-পশ্চিমে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে, দক্ষিণ-পূর্বে বিদ্রোহী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে।
এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ ইরানের এলিট সামরিক সক্ষমতা একটি নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত নয়, যেখানে তারা মোতায়েনের অপেক্ষায় থাকে। বরং তারা ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে, স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে এবং বিচ্ছিন্ন ও নিম্ন-তীব্রতার সংঘর্ষে অভ্যস্ত।
এটি পশ্চিমা বিশেষ বাহিনীর মডেল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে বাহিনী সাধারণত দূরবর্তী স্থানে গিয়ে অভিযান চালায় এবং ফিরে আসে। ইরানের কাঠামো গড়ে উঠেছে উপস্থিতি ধরে রাখার জন্য। সাবেরিনের পাশাপাশি আইআরজিসি স্থলবাহিনীর ভেতরে আরও কিছু নির্দিষ্ট ইউনিট রয়েছে, যেমন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সালমান ফারসি ব্রিগেড বা অন্যান্য বিশেষ ব্রিগেড, যেগুলো মহড়া ও অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়।
তাদের প্রকাশ্য পরিচিতি সীমিত হলেও তাদের ভূমিকা স্পষ্ট। তারা স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী এবং উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত ইউনিটের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে—দুর্বল জায়গাগুলোকে শক্তিশালী করে এবং হঠাৎ উদ্ভূত হুমকির জবাব দেয়।
ইরানের বিশেষ অভিযান সক্ষমতা শুধু আইআরজিসির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত সেনাবাহিনী, অর্থাৎ আরতেশের ভেতরেও একটি ভিন্ন ঐতিহ্য বিদ্যমান—পুরোনো, তুলনামূলকভাবে প্রচলিত, কিন্তু এখনো প্রাসঙ্গিক। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ইউনিট হলো ৬৫তম এয়ারবোর্ন স্পেশাল ফোর্স ব্রিগেড, যা ‘নোহেদ’ নামে পরিচিত।
আইআরজিসির অন্য ইউনিটগুলোর তুলনায় নোহেদ অনেক বেশি ক্ল্যাসিক্যাল বিশেষ বাহিনীর মতো—এয়ারবোর্ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, গোয়েন্দা কার্যক্রম ও সরাসরি অভিযানে দক্ষ এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য। নোহেদকে বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করে তোলে শুধু এর প্রশিক্ষণ নয়, বরং সীমিত হলেও বিদেশে এর কার্যক্রম। ২০১৬ সালে সিরিয়ায় তাদের মোতায়েনের খবর ইঙ্গিত দেয় যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ইরানের এই তুলনামূলকভাবে প্রচলিত বাহিনীও বহির্মুখী অভিযানে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবু শুধু স্থলবাহিনীর দিকে তাকালে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। ইরানের বিশেষ অভিযান সক্ষমতা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় সামুদ্রিক ক্ষেত্রে।
আইআরজিসি নৌবাহিনী একটি বিশেষ ইউনিট পরিচালনা করে, যাকে প্রায়ই ‘সেপাহ নেভি স্পেশাল ফোর্স-এসএনএসএফ’ বলা হয়। পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন দ্বীপে, যেমন ফরুর দ্বীপে, এই ইউনিটগুলো যুদ্ধ ডাইভিং, উভচর হামলা এবং জাহাজে ওঠার অভিযানের প্রশিক্ষণ পায়। স্থলভিত্তিক অনেক ইউনিটের তুলনায় এই নৌবাহিনীর কার্যক্রম বেশি দৃশ্যমান। তারা এডেন উপসাগরে জলদস্যুবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ জব্দ বা বাধা দেওয়ার সক্ষমতার সঙ্গে জড়িত বলে মনে করা হয়।
এটি একটি কৌশলগত বাস্তবতা তুলে ধরে। বহিরাগত শক্তির সঙ্গে সংঘাতে ইরান বড় আকারের প্রচলিত যুদ্ধের চেয়ে সীমিত ও ভৌগোলিকভাবে নির্দিষ্ট অভিযানে, বিশেষ করে সমুদ্রপথে, বেশি আগ্রহী।
এখানেই পশ্চিমা তুলনার একটি বড় সীমাবদ্ধতা সামনে আসে। ইরানের জন্য নেভি সিল টিম সিক্স বা ডেলটা ফোর্সের মতো একটি সমতুল্য ইউনিট খোঁজা আসলে ভুল পদ্ধতি। ইরানের কাঠামো একটি একক, দৃশ্যমান এলিট বাহিনী তৈরি করার জন্য নয়; বরং এটি এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে স্থল, সমুদ্র এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রে দ্রুত, স্থানীয় এবং সমন্বিত প্রতিক্রিয়া দেওয়া যায়।
এই প্রেক্ষাপটে বাসিজ বাহিনীর কথাও গুরুত্বপূর্ণ, যেটিকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। যদিও বাসিজের বড় অংশ জনসমাবেশ ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়, তবে এর কিছু ইউনিট, যেমন ফাতেহিন উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং সিরিয়ার মতো বাইরের সংঘর্ষেও ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাসিজ ইউনিটগুলো কৌশলগত পর্যায়ে আইআরজিসির সঙ্গে একীভূতভাবে কাজ করে। তারা শক্তিবৃদ্ধি, স্থানীয় জ্ঞান এবং জনবল সরবরাহ করে। বাস্তব পরিস্থিতিতে তারা প্রথম প্রতিক্রিয়াকারীদের মধ্যেই থাকবে, এলিট কমান্ডো হিসেবে নয়; বরং একটি স্তরভিত্তিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে, যা আরও বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর কার্যক্রমকে সমর্থন ও বিস্তৃত করে।
সবকিছু একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায় কেন ইরানের বিশেষ বাহিনীকে চিহ্নিত করা এবং তুলনা করা এত কঠিন। এগুলো দৃশ্যমান হওয়ার জন্য তৈরি নয়। তারা কোনো একক কমান্ড কাঠামোর অধীনে সংগঠিত নয়। তারা পশ্চিমা বিশেষ বাহিনীর মতো হাইপ্রোফাইল বৈশ্বিক অভিযানে নিজেদের সংজ্ঞায়িত করে না।
তাদের অভিজ্ঞতা গড়ে উঠেছে অপেক্ষাকৃত নীরব ক্ষেত্রগুলোতে—সীমান্ত সংঘর্ষ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অভিযান এবং সিরিয়া ও ইরাকে সীমিত মোতায়েনের মাধ্যমে। এই অভিজ্ঞতা হয়তো নাটকীয় নয়, কিন্তু তা তুচ্ছও নয়। এটি অভিযোজন ক্ষমতা, ভূখণ্ড সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং বৃহত্তর ব্যবস্থার ভেতরে কাজ করার দক্ষতাকে গুরুত্ব দেয়। ফলে কোনো সীমিত বাইরের আক্রমণের জবাবে প্রতিক্রিয়া আসে একটি নির্দিষ্ট ইউনিট থেকে নয়, বরং একটি ধারাবাহিক স্তরভিত্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে—যা নির্ভর করে অবস্থান, সক্ষমতা এবং উত্তেজনার মাত্রার ওপর।
প্রথমে স্থানীয় আইআরজিসি ও বাসিজ ইউনিটগুলো দ্রুত এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। এরপর সাবেরিন ধরনের ইউনিটগুলো ভ্রাম্যমাণ ইউনিট হিসেবে শক্তিবৃদ্ধির কাজ করে। একই সময়ে যদি সামুদ্রিক পরিস্থিতি থাকে, আইআরজিসি নৌবাহিনীর বিশেষ ইউনিটগুলো সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ বা বিঘ্নিত করার জন্য এগিয়ে আসে। আর প্রয়োজনে, উত্তেজনা বাড়লে নোহেদের মতো ইউনিটগুলো উচ্চতর স্তরের বাড়তি শক্তি হিসেবে যুক্ত হতে পারে।
এই পুরো ব্যবস্থা স্তরভিত্তিক, যার উদ্দেশ্য ধাক্কা সামলানো, দুর্বলতা পূরণ করা এবং ধারাবাহিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখা। এটাই মূল উপলব্ধি। ইরানের বিশেষ অভিযান সক্ষমতা কম দৃশ্যমান, এটা তাদের দুর্বলতার কারণে নয় কিংবা অতিরিক্ত গোপনীয়তার কারণেও নয়। এটি আড়ালে থাকে, কারণ এটি প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মেলে না, বিশেষ বাহিনী দেখতে কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রচলিত গল্পের সঙ্গে। এখানে কোনো একক প্রতীক নেই, নেই কোনো একক বাহিনী, যা পুরো ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে। যা আছে, তা হলো একটি জটিল ব্যবস্থা, যাকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন, আর ভেঙে ফেলা তার চেয়েও কঠিন।
দ্য ক্রেডল থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান