সংঘাতের দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পর ইরানের রণকৌশল এখন আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। শুরুতে তাদের লক্ষ্য ছিল আমেরিকা ও ইসরায়েলের আক্রমণগুলো সহ্য করে নেওয়া এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলি শহর ও মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে পাল্টা আঘাত হানা, যাতে প্রতিপক্ষের ইন্টারসেপ্টর বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুত শেষ করে দেওয়া যায়। তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল সংঘাতের দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য আরও বড় ও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জমিয়ে রাখা।
তবে ইরান এর পাশাপাশি একটি সমান্তরাল—এবং সম্ভবত আরও কার্যকর—কৌশল প্রয়োগ করেছে: বিশ্ব অর্থনীতির বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা। ইরানি মিসাইল ও ড্রোনগুলো কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কেন্দ্রে এবং পারস্য উপসাগরের তেলবাহী ট্যাংকারে আক্রমণ চালিয়েছে। এ ছাড়া তারা হরমুজ প্রণালিতে যাতায়াত সীমিত করে কার্যত তা বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
সংঘাত শুরুর কয়েক দিন আগে, ২৪ ফেব্রুয়ারি স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান নিয়ে খুব সামান্যই কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি গ্যাসের দাম, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনীতির অবস্থা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন। ইরানিরা বুঝতে পেরেছে যে, বোমা বা মিসাইল অনেক মার্কিনির নজর না-ও কাড়তে পারে, কিন্তু গ্যাসের দাম আর মুদ্রাস্ফীতি ঠিকই তাদের গায়ে লাগবে।
তাদের এই ধারণা সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। সংঘাত যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি বিশ্ব বাজারকে অস্থির করে তুলল। যদিও ইরান ঠিক এই ধরনের পরিস্থিতির ব্যাপারে আগেই সতর্ক করেছিল, তবুও আমেরিকা অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরা খেয়েছে। তাদের এই অপ্রস্তুত ভাব আসন্ন সংকটের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে ইরান শুধু জ্বালানি সরবরাহের ওপরই আঘাত হানছে না। তাদের ড্রোন ও মিসাইলগুলো উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে—প্রযুক্তি কোম্পানি থেকে শুরু করে এয়ারলাইনস পর্যন্ত। তারা আমাজনের ডেটা সেন্টার, দুবাই বিমানবন্দর এবং বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের বন্দরগুলোতে আক্রমণ চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কনটেইনার পরিবহনেও প্রভাব পড়ছে, যা পণ্যসামগ্রী, শিল্পজাত পণ্য যেমন পেট্রোকেমিক্যাল এবং কৃষির জন্য প্রয়োজনীয় সার বহন করে।
সংঘাতে প্রযুক্তির মতোই ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। পারস্য উপসাগরের পুরো উত্তর উপকূল ইরানের দখলে, যা দক্ষিণ উপকূলের জ্বালানি ক্ষেত্র এবং এই জলপথ দিয়ে চলাচলকারী সবকিছুর ওপর তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তাদের মিত্র হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথে এবং সুয়েজ খালের পথে অবস্থান করছে; ফলে ইরান আরব উপদ্বীপের দুই দিক থেকেই বিশ্ব অর্থনীতিকে চেপে ধরার মতো মোক্ষম অবস্থানে রয়েছে।
বর্তমানে ইরানের কমান্ডে যারা রয়েছেন, তারা ইরাক ও সিরিয়ার ছায়া সংঘাতের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ফাইটার। তারা এখন সেই একই কৌশল বিশ্ব অর্থনীতির রণক্ষেত্রে আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রয়োগ করছেন। ড্রোন, স্বল্পপাল্লার মিসাইল এবং মাইন দিয়ে ট্যাংকার ও বন্দরে আগুন লাগিয়ে দেওয়াটা অনেকটা ইরাকের সেই আইইডি আক্রমণর মতোই প্রভাব ফেলছে, তবে এর মাত্রা আরও ব্যাপক—এটি বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত করছে এবং তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের জুনে যখন আমেরিকা ও ইসরায়েল শেষবার আক্রমণ করেছিল, তখন ইসরায়েলি ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমিয়ে দেওয়ার ইরানি কৌশল তাদের সিজফায়ারে বাধ্য করতে সাহায্য করেছিল। তবে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর এবারের এই সংঘাত সম্ভবত ভিন্ন কোনো ফলাফল নিয়ে আসবে।
ইরান এবার তার পাল্টা আক্রমণ অনেক সহজে এবং দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যেতে সক্ষম। তদুপরি, শুধুমাত্র একটি সংঘাতবিরতিই পারস্য উপসাগরের ওপর ইরানের তৈরি করা ঝুঁকির ছায়া সরাতে পারবে না, যা বর্তমানে একটি দুঃস্বপ্নময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই ইরানি নেতারা বলছেন যে, ওয়াশিংটন যতক্ষণ না এই সংঘাতের বিশ্বজনীন অর্থনৈতিক মূল্য হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে, ততক্ষণ তারা সিজফায়ার মেনে নেবে না। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী এবং পর্যটকেরা হয়তো আর উপসাগরীয় দেশগুলোতে ফিরবে না যদি তারা মনে করে যে সংঘাত আবারও শুরু হতে পারে।
যদি না আমেরিকা ইরান আক্রমণ করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত করতে এবং সেখানে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘকাল অবস্থান করার প্রস্তুতি নেয়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে আস্থা তখনই ফিরবে যখন আমেরিকা ও ইরান একটি টেকসই সংঘাত বিরতিতে পৌঁছাবে। একটি সমাধানের জন্য ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়ছে। শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোই নয়, বরং এশিয়া, আফ্রিকা এমনকি ইউরোপের দেশগুলোও এই লড়াই থামাতে চায়, কারণ তারা ভয় পাচ্ছে যে সংঘাত দ্রুত বন্ধ না হলে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেবে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আমেরিকা ও ইসরায়েল তাদের বোমাবর্ষণের গতি ও তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে এই আশায় যে তারা ইরানকে আত্মসমর্পণ করতে বা ভেঙে পড়তে বাধ্য করবে। অন্যদিকে, ইরানি শাসকেরা বিশ্ব অর্থনীতির বিরুদ্ধে এই অসম সংঘাত তত দিন চালিয়ে যেতে প্রস্তুত, যত দিন না ওয়াশিংটন একটি রাজনৈতিক সমঝোতাকে একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হয়।
ইরান বলছে, তারা কেবল তখনই সিজফায়ার মেনে নেবে যদি তাদের সার্বভৌমত্বের জন্য আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়। যার অর্থ সম্ভবত রাশিয়া ও চীনের সরাসরি ভূমিকা। তারা সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননে একটি যাচাইযোগ্য সংঘাত বিরতির দাবিও করতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমেরিকাকে ফেব্রুয়ারিতে জেনেভায় আলোচনার টেবিলে রেখে আসা পরমাণু চুক্তির কোনো একটি সংস্করণে একমত হতে হবে এবং নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।
ইরানি নেতারা এই সংঘাতে নেমেছেন এই লক্ষ্য নিয়ে যে, এটিই যেন শেষ সংঘাত হয়। হয় এটি তাদের ধ্বংস করবে, নতুবা দেশটির পরিস্থিতি আমূল বদলে দেবে। তারা বাজি ধরেছে যে, তারা যথেষ্ট সময় টিকে থাকতে পারবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে এমনভাবে চেপে ধরবে যাতে তাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসে ভালি নাসরের লেখা থেকে অনুবাদ করেছে আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান