নারীর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সামাজিক মানসিকতা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি। আদালতের বাইরে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত বাধা দূর না করলে বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের নারীর মর্যাদাবিষয়ক কমিশনের (সিএসডব্লিউ) ৭০তম অধিবেশন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সন্ধ্যায় ‘আদালতের সীমানার বাইরে ন্যায়বিচার প্রক্রিয়া: বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে কাঠামোগত বাধা’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত এই সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন বিশ্লেষক ও গবেষক ফউজুল আজিম। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এখনো নানা কাঠামোগত বাধার মুখে রয়েছে। ন্যায়বিচার শুধু আদালতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা নারীদের বিচার পাওয়ার সক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
ফউজুল আজিম বলেন, যদিও সংবিধান ও আইনি কাঠামো নারীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং বিভিন্ন আইনি সংস্কার হয়েছে, তবুও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, আইনি সচেতনতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে এখনো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাবেক সচিব রেহানা পারভীন বলেন, বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা কাঠামোগত বাধা এখনো বিদ্যমান। যদিও শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে, তবুও ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকার সব সময় নিশ্চিত হয়নি। আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার পাশাপাশি সালিস, আইনি সহায়তা ও নাগরিক সমাজের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
রেহানা পারভীন বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সামাজিক মানসিকতা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি। একই সঙ্গে নারী ও কন্যাশিশুর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা বাড়ানোর মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক খান বলেন, সহিংসতার শিকার নারীদের ঘটনা সম্মানের ভয়ে, কমিউনিটির চাপে অনেক সময় অপ্রকাশিত থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম শুধু তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। গণমাধ্যম সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে, ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বরকে সামনে আনতে পারে এবং সমাজে প্রচলিত বৈষম্যমূলক ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
সভায় মডারেটর হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু।
বক্তারা জানান, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলা এবং নারীর ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপকমিটি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৯০টি সরাসরি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ৮৫০টি আইনি পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।
পারিবারিক বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতির মাধ্যমে ৪৭৩টি মামলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার প্রায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারীদের জন্য মোট ৬৩ লাখ ৪ হাজার ৬০০ টাকা দেনমোহর আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ফৌজদারি ও পারিবারিক বিষয়ে মোট ২৩২টি মামলা পরিচালনা করা হয় এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ভুক্তভোগীদের পক্ষে ৬টি মামলায় রায় আসে।