হোম > জীবনধারা > জেনে নিন

বিশ্ব সাইকেল দিবস

সমাজ ভাঙা, ফ্যাশন গড়া আর নারীর আপন আকাশ খোঁজার গল্প

ফিচার ডেস্ক

ছবি: সংগৃহীত

প্যাডেল ঘুরছে, তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে যাচ্ছে ইতিহাসের চাকা। কখনো তা ভাঙছে সমাজের তৈরি লোহার শিকল, কখনো আবার বদলে দিচ্ছে বিশ্ব ফ্যাশনের খতিয়ান। আজ ‘বিশ্ব সাইকেল দিবস’। এই বিশেষ দিনে সাইকেল বিষয়টিকে কেবল দুটি চাকা আর একটি ফ্রেমের বাহন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সাইকেল আসলে এক ‘মুক্তির যন্ত্র’। এটি গত এক শতকের বেশি সময় ধরে মানুষকে দিয়েছে গতি, স্বাধীনতা আর নিজের মতো করে বাঁচার সাহস। বিশেষ করে নারীদের জন্য সাইকেল বয়ে এনেছিল এক নীরব বিপ্লব। ইতিহাসের ধুলো পড়া পথ থেকে শুরু করে আধুনিক ফ্যাশনের র‍্যাম্প—সাইকেলের সেই রোমাঞ্চকর যাত্রার কিছু গল্প আমাদের আজও অজানা।

যখন চাকা ঘুরল প্রতিবাদের টানে

উনিশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপে যখন সাইকেলের জোয়ার আসে, তখন উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত নারীদের জন্য এটি ছিল স্বাধীনতার প্রতীক। সেই সময় এক দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারের মেয়ের কাছে সাইকেল ছিল জীবন বদলানোর, সমাজ থেকে পালিয়ে বাঁচার এক মোক্ষম উপায়। তিনি আলফোনসিনা স্ত্রাদা। উত্তর ইতালির এক অতি দরিদ্র পরিবারে ১৮৯১ সালে জন্ম নেওয়া আলফোনসিনার বাবা ১০টি মুরগির বিনিময়ে মেয়ের জন্য একটা পুরোনো সাইকেল কিনেছিলেন। ১০ বছর বয়সে তাতেই আলফোনসিনার সাইকেল চালানোর হাতেখড়ি। রক্ষণশীল সমাজের চোখরাঙানি, বয়স্ক নারীদের অভিশাপ, কোনো কিছুই থামাতে পারেনি তাঁকে। ১৩ বছর বয়সে প্রথম প্রতিযোগিতায় জিতে পুরস্কার পেয়েছিলেন একটা আস্ত শূকর!

ছবি: সংগৃহীত

সমাজ তখন সাইকেল চালানো নারীদের ‘অস্বাভাবিক’ বা ‘লজ্জাহীন’ বলে গণ্য করত। কিন্তু আলফোনসিনা ছিলেন নাছোড়বান্দা। ১৯১১ সালে ভারী এক গিয়ারের সাইকেল নিয়ে ঘণ্টায় ৩৭ কিলোমিটার বেগে চালিয়ে নারীদের গতির বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে দেন তিনি। তাঁর রেকর্ড পরবর্তী ২৬ বছর কেউ ভাঙতে পারেনি। স্বামী লুইগি স্ত্রাদার সহায়তায় তিনি ১৯২৪ সালের বিখ্যাত ‘জিরো দ’ইতালিয়া’ রেসে অংশ নেন। পুরুষদের জন্যও কঠিন সে প্রতিযোগিতায় তিনি ছিলেন একমাত্র নারী। ঝড়-বৃষ্টি, ভাঙা রাস্তা আর হাঁটুর চোট উপেক্ষা করে কেবল ঝাড়ুর হাতল দিয়ে সাইকেলের হ্যান্ডেল মেরামত করে রেস শেষ করেছিলেন এই অদম্য নারী। পরে সংবাদপত্র তাঁর নাম দিয়েছিল ‘স্কার্ট পরা শয়তান’।

একই রকম আরও গল্প আছে। ১৮৮৯ সালে শিকাগোয় আসা সুইডিশ অভিবাসী কিশোরী তিলি অ্যান্ডারসন ছিলেন একজন দরজি। জমানো টাকা দিয়ে সাইকেল কিনে তিনি ট্র্যাকে নামেন। ১৩০টি রেসের মধ্যে ১২৩টিতে জয়ী হন তিলি। তাঁর ক্ষিপ্রতা আর বুদ্ধিমত্তা তখনকার খবরের কাগজে ঝড় তুলেছিল। দুঃখজনকভাবে, ১৯০২ সালে এক নারী সাইক্লিস্টের মৃত্যুর পর নারীদের সাইকেল রেস নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে অকালেই থমকে যায় তিলির ক্যারিয়ার।

ইংল্যান্ডের বেরিল বার্টনের কথা না বললে নারীদের সাইকেল রেসের গল্প ঠিক জমে না। ৯০টির বেশি ঘরোয়া চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ৭টি বিশ্ব খেতাবজয়ী বেরিল ১৯৬৭ সালে ১২ ঘণ্টার এক রেসে পুরুষদের রেকর্ড শূন্য দশমিক ৭৩ মাইল ব্যবধানে হারিয়ে ২৭৭ দশমিক ২৫ মাইল পাড়ি দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে সাইকেল চালাতে চালাতেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি।

ছবি: সংগৃহীত

সাইকেল পোশাকের রূপান্তর

নারীদের এই সাইকেল বিপ্লব খুব একটা সহজ ছিল না। সে যুগের ভারী পেটিকোট আর লম্বা স্কার্ট সাইকেলের চাকার স্পোকে আটকে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। সংবাদপত্রে নারীদের মৃত্যুর খবর আসত প্রায়ই। কিন্তু সাইকেল চালানো কি আর বন্ধ রাখা যায়? তাই নারীরা শুরু করলেন পোশাকের এক অভিনব রূপান্তর, যা ‘র‍্যাশনাল ড্রেস’ বা ব্লুমার নামে পরিচিতি পায়। তবে লোকলজ্জা আর টিটকারির ভয়ে অনেক নারী এক চমৎকার বুদ্ধি খাটালেন। তাঁরা এমন সব পোশাকের নকশা তৈরি করলেন, যা বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ স্কার্ট মনে হলেও প্রয়োজনের সময় সাইকেল চালানোর উপযোগী হয়ে উঠত। যেমন অ্যালিস বাইগ্রোভ নামের লন্ডনের এক পোশাকশিল্পী স্কার্টের সামনে ও পেছনে একটি গোপন পুলি সিস্টেম যুক্ত করেন, যা দিয়ে ইচ্ছেমতো স্কার্টের ঝুল টেনে ওপরে তুলে নেওয়া যেত। জুলিয়া গিলের তৈরি সেই স্কার্টে লুকানো ছিল আংটা আর দড়ি, যা টেনে স্কার্টটিকে কোমরের কাছে গুটিয়ে সেমি-স্কার্ট বানিয়ে ফেলা যেত। ইয়র্কশায়ারের মেরি ও সারাহ এমন এক স্কার্ট বানালেন, যা প্রয়োজনে শরীর থেকে খুলে হ্যান্ডেলের সঙ্গে ফিতা দিয়ে বেঁধে রাখা যেত, আবার দরকার হলে গায়ে জড়িয়ে কেপ বা চাদর বানিয়ে নেওয়া যেত। হেনরিয়েটা মুলার নামে এক নারী অধিকারকর্মী কোট, স্কার্ট আর ব্লুমারের সমন্বয়ে তৈরি পোশাকে নারীদের সুবিধার জন্য পাঁচটি গোপন পকেট যুক্ত করেছিলেন। এই উদ্ভাবনগুলো কেবল পোশাক ছিল না, এগুলো ছিল নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার রাজনৈতিক হাতিয়ার।

সাইকেল থেকে ফ্যাশন

ফ্যাশন দুনিয়ায় একটি বহুল প্রচলিত তত্ত্ব হলো ‘২০ বছরের ফ্যাশন চক্র’। অর্থাৎ আজ যা ফ্যাশনে আছে, ২০ বছর পর তা আবার ঘুরেফিরে আসবে। ১৯৩০-এর দশকে জেমস লেভার অবশ্য একে ১৫০ বছরের চক্র বলেছিলেন। কিন্তু আধুনিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি একে ২০ বছরে নামিয়ে এনেছে। আজ আমরা চারপাশে যে ২০০০ সালের শুরুর দিকের ফ্যাশন দেখছি, তা এই ২০ বছরের চক্রেরই ফসল। যেমন মিনি স্কার্ট, বেবি টি, ঝলমলে প্যান্ট ইত্যাদি। ২০২০-২১ সালের দিকে গুগল সার্চে ‘ওয়াইটুকে ফ্যাশান’ শব্দটির খোঁজ এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যায়। জুসি কুতুর বা ট্রু রিলিজিয়নের মতো ২০০০ সালের জনপ্রিয় ব্র্যান্ডগুলো কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা করে আবার বাজারে ফিরে আসে। ফ্যাশন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষ যখন দ্রুতগতির জীবনের মুখোমুখি হয়, তখন সে ফেলে আসা সহজসরল দিনগুলোর প্রতি একধরনের নস্টালজিয়া বা আবেগ অনুভব করে। আর সেই আবেগের টানেই পুরোনো ফ্যাশন ফিরে আসে।

ইন্টারনেটের যুগে নিয়ম ভাঙার নতুন ট্রেন্ড

কিন্তু বর্তমানের ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই ২০ বছরের চাকা কিছুটা হলেও থমকে গেছে। এখন মানুষ আর শুধু চলতি ফ্যাশনের ওপর নির্ভর করে না। টিকটক বা ইনস্টাগ্রামের কল্যাণে এখন যে কেউ চাইলে ভিক্টোরিয়ান যুগের পোশাক, নব্বই দশকের জাপানি ডেকোরা ফ্যাশন, কিংবা সাইবার গ্রাঞ্জ স্টাইলে নিজেকে সাজাতে পারে। একই সঙ্গে জন্ম নিচ্ছে মাইক্রোট্রেন্ড বা অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের ফ্যাশন ধারা। এগুলো মাত্র কয়েক সপ্তাহ বা এক মাসের জন্য স্থায়ী হয়। যেমন ফরেস্টকোর, গবলিনকোর কিংবা ক্লিন গার্ল অ্যাসথেটিক। এখন মানুষ আর ভিড়ে মিশে যাওয়ার জন্য জামাকাপড় পরে না, বরং পোশাক এখন নিজের সৃজনশীলতা প্রকাশের মাধ্যম। কেউ হয়তো ২০০০ সালের ফ্যাশনে মেতে আছে, আবার তার পাশের জনই হয়তো নিজেকে সাজাচ্ছে ৭০ দশকের আদলে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান মিডিয়াম, সাইক্লিং ইউকে

পেটের মেদ কমাতে কোন ধরনের আঁশযুক্ত খাবার খাবেন

স্বাস্থ্য ও বাড়ির পরিবেশ ভালো থাকবে এই কয়েকটি অভ্যাসে

কেন পালিত হয় আন্তর্জাতিক গোসল দিবস? জেনে নিন গোসলের সঠিক নিয়ম

‘ড্রাই বেগিং’ কি সম্পর্কের সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে? যেভাবে সামাল দেবেন

বয়সের ছাপ রুখতে কী খাবেন, কী খাবেন না

জেনে নিন, গরমে ত্বকের সমস্যা সমাধানে কতভাবে গোলাপজল ব্যবহার করা যায়

ফিটনেস রুটিনে পরিবর্তন আনার আগে জেনে নিন

ঘরে আম পাকানোর ৫টি প্রাকৃতিক উপায়

নিজের সৌন্দর্য নিয়ে চিন্তায় আছেন? দেখে নিন, এ থেকে বাঁচতে কী করবেন

কর্মক্ষেত্রে কীভাবে ভিন্নমত জানাবেন? জানুন ৬ ম্যাজিক্যাল কৌশল