কর্মজীবনে বড় কোনো সাফল্য পেতে হলে কেবল কঠোর পরিশ্রমই যথেষ্ট নয়, মাঝে মাঝে সাহসী কিছু সিদ্ধান্ত বা ‘ঝুঁকি’ নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আমাদের মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের নিরাপদ রাখতে চায়, যাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নেতিবাচক পক্ষপাত’বলা হয়। এই আদিম স্বভাবের কারণেই আমরা সম্ভাব্য লাভের চেয়ে ক্ষতির ভয় বেশি পাই। কিন্তু আধুনিক পেশাদার বিশ্বে আসল ঝুঁকি কিছু না করে এক জায়গায় স্থবির হয়ে থাকা। স্পষ্টতা বা স্বচ্ছতা কেবল চিন্তা থেকে আসে না। এসব আসে কাজের মাধ্যমে। সবকিছুর নিখুঁত পরিকল্পনার জন্য বসে না থেকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পদক্ষেপ নিন। সঠিক সময়ে নেওয়া একটি ছোট ঝুঁকিই আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
আরামদায়ক অবস্থা থেকে বের হন
উন্নতির একমাত্র পথ হলো অস্বস্তি বা চ্যালেঞ্জকে আলিঙ্গন করা। সাহসিকতার সঙ্গে সেগুলোকে মোকাবিলা করা। সেই মানসিকতাও আগে থেকে তৈরি করে নিতে হবে। কারণ, যখন সবকিছু খুব সহজ মনে হয়, তখন শেখার সুযোগ কমে যায়। নিজেকে প্রশ্ন করুন—আসল ঝুঁকি কোনটি—সাহসী কিছু করা নাকি কিছুই না করে সুযোগ হারানো? যাঁরা ঝুঁকি নিতে ভয় পান, তাঁরা অজান্তেই নিজের বৃদ্ধির পথ বন্ধ করে দেন।
ক্যারিয়ার এগিয়ে নেওয়ার ৬ উপায়
—অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আপনার পরিচিত পরিধির বাইরে নতুন মানুষের সঙ্গে যুক্ত হোন। পছন্দের প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী বা আদর্শ কোনো ব্যক্তির সঙ্গে ই-মেইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় যোগাযোগ করুন। বড়জোর তাঁরা উত্তর দেবেন না, কিন্তু চেষ্টা না করলে আপনি একটি বড় সুযোগ হারাবেন।
—চিন্তা ও পাঠে সময় বাড়ান। ব্যস্ত থাকা মানেই উৎপাদনশীল হওয়া নয়। ওয়ারেন বাফেটের মতো সফল ব্যক্তিরা তাঁদের ক্যারিয়ারের ৮০ শতাংশ সময় পড়া ও চিন্তায় ব্যয় করেন। প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার জন্য সময় বের করা কোনো আলস্য নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
—নিজের মতামত প্রকাশ করার চেষ্টা করুন। নিজেকে তাঁর জন্য তৈরি করুন। আপনার দক্ষতা প্রকাশ করতে লিঙ্কডইন বা অন্যান্য মাধ্যমে লেখালেখি করুন। সমসাময়িক বিষয় বা আপনার পেশাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলে আপনি প্রাসঙ্গিক থাকবেন।
—জনসমক্ষে কথা বলার চেষ্টা করুন। মিটিং বা কনফারেন্সে কথা বলার সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। নিখুঁত হওয়ার চেয়ে নিজের নেতৃত্বের উপস্থিতি জানান দেওয়া বেশি জরুরি।
—প্রতিষ্ঠানের কোনো সমস্যা সমাধানে আপনার কাছে ভালো আইডিয়া থাকলে তা শেয়ার করুন। আপনার আইডিয়া গ্রহণ করা না হলেও আপনার মূল্য ও সৃজনশীলতা কর্তৃপক্ষের নজরে আসবে।
—নিজের কাজ সম্পর্কে ফিডব্যাক বা মতামত চান। গঠনমূলক সমালোচনা সাময়িকভাবে ইগোতে আঘাত দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি আপনাকে ত্রুটিমুক্ত হতে সাহায্য করে। সহকর্মী বা ম্যানেজারদের কাছে নিজের উন্নতির জায়গাগুলো জানতে চান।
তবে সব সময় মনে রাখবেন, সক্রিয় থাকা আর অতি উৎসাহী থাকার মধ্যে সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য আছে। সেই সীমানা জেনে তারপর পদক্ষেপ নেবেন।
ঝুঁকি নেওয়া কেন জরুরি
জগৎ পরিবর্তনশীল। কর্মক্ষেত্রে আপনি যে পদ বা প্রতিষ্ঠানে আছেন, তা চিরকাল একই রকম থাকবে না। ঝুঁকি নেওয়া কেবল ক্যারিয়ারের জন্যই নয়, মানসিক প্রশান্তি ও নতুন শক্তির উৎস। এটি আপনাকে কৌতূহলী করে তোলে এবং মিটিংয়ের টেবিলে বা নেটওয়ার্কিং ইভেন্টে কথা বলার মতো আকর্ষণীয় গল্প তৈরি করে। মনে রাখবেন, আপনার কাছে কিছু ‘সুপার পাওয়ার’বা বিশেষ দক্ষতা আছে, যা বিশ্বকে দেওয়ার জন্য আপনি দায়বদ্ধ।
যে ৪ ঝুঁকি নেওয়া সার্থক হতে পারে
—কেবল কাড়ি কাড়ি টাকার পেছনে না ছুটে এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নিন, যেখানে কাজের পরিবেশ ভালো এবং আপনার মূল্যায়ন আছে। সুখী কর্মপরিবেশ আপনার উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি আয় উভয়ই বাড়িয়ে দেবে।
—আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কাজ করলে দৃষ্টিভঙ্গি ও নেটওয়ার্ক বহুগুণ বেড়ে যায়, যা পেশাদার জীবনে অমূল্য সম্পদ।
—নিজের অবস্থান পোক্ত করতে বা নতুন কিছু শিখতে নিজ থেকেই বাড়তি কাজের দায়িত্ব নিন। তবে তার আগে কাজগুলো সুনিপুণভাবে সম্পন্ন করার মতো সক্ষম করে তুলুন নিজেকে।
—বিষাক্ত কর্মপরিবেশ বা যেখানে উন্নতির সুযোগ নেই, সেই কাজ আঁকড়ে ধরে রাখা বোকামি। তবে ছাড়ার আগে বিকল্প ব্যবস্থা বা নিজের নেশাকে পেশায় রূপান্তরের পরিকল্পনা থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।
ঝুঁকির মূল্যায়ন করবেন যেভাবে
যেকোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিজেকে চারটি প্রশ্ন করুন।
১. এই মুহূর্তে আমার ঝুঁকি নেওয়ার মানসিক অবস্থা কেমন?
২. এই পরিবর্তনের লাভ ও ক্ষতির অনুপাত কতটুকু?
৩. নেতিবাচক প্রভাবগুলো কি আমি সামলে নিতে পারব?
৪. যদি সিদ্ধান্তটি সফল না হয়, তবে কি আমি তা মেনে নিতে প্রস্তুত?
সূত্র: ফোর্বস, বিজনেস নিউজ ডেইলি