প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গরা নির্যাতিত হচ্ছে। তাই তিনি শরণার্থী হিসেবে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে নিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান উন্নত জীবনের আশায় নিজেদের দেশেই ফিরে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান বন্দুক হামলা এবং অভিবাসন কর্মকর্তাদের সহিংসতার হাত থেকে বাঁচতে তারা এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে জানিয়েছে অনেক প্রবাসী।
২০০৩ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী ৫৩ বছর বয়সী অ্যান্ড্রু ভিচ দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়েছিলেন সশস্ত্র ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে। কিন্তু এখন তিনি মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র তাঁর জন্য বেশি বিপজ্জনক। ভিচ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘এখানে দিনের আলোতে মার্কিন নাগরিকদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। আমি এমন জায়গায় থাকতে চাই না।’
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) কর্মকর্তাদের গুলিতে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হন। ট্রাম্প প্রশাসন এই হামলাকে বৈধ বললেও ভিডিও ফুটেজে তার উল্টো চিত্র দেখা গেছে। এই ভীতি থেকেই ভিচ এ বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় ফেরার পরিকল্পনা করছেন।
এদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার সেখানে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের মে মাস থেকে শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের জন্য একটি বিশেষ শরণার্থী কর্মসূচিও চালু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই কর্মসূচির অধীনে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৫০০ জন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। ২০২২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ১৫ হাজার শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান প্রবাসজীবন ছেড়ে দেশে ফিরেছেন। বর্তমানে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত একটি অনলাইন পোর্টালে ১২ হাজার মানুষ তাঁদের নাগরিকত্ব যাচাই করেছেন, যাঁরা পুনরায় দেশে ফিরতে আগ্রহী।
ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের ওপর নিপীড়ন ও কৃষি খামারগুলোয় শ্বেতাঙ্গ হত্যার কথা বললেও পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, খামারে হামলার ঘটনায় শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গরাই বেশি নিহত হন। এ ছাড়া বেকারত্বের হারের ক্ষেত্রেও শ্বেতাঙ্গরা সুবিধাজনক অবস্থানে। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৮ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষ্ণাঙ্গদের বেকারত্বের হার ৩৫ শতাংশ।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অপ্রকাশিত নথি থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রতি মাসে ৪ হাজার ৫০০ শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানের শরণার্থীর আবেদন গ্রহণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ‘অনিরাপদ’ বোধ করে এখন অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গ দেশে ফিরতে চাইছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ফেরার পেছনে প্রবাসীরা মূলত কম জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবারের সান্নিধ্য এবং বিদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। রিলোকেশন এজেন্সিগুলোর মতে, গত ছয় মাসে শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের দেশে ফেরার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার হার ৩০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
নাওমি স্যাফায়ার নামের এক নারী দুই দশক নর্থ ক্যারোলিনায় কাটিয়ে গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপে ফিরেছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে আমার সন্তানেরা অনেক বেশি সময় বাইরে কাটাতে পারে, স্বাস্থ্যবিমা সাশ্রয়ী এবং স্কুলগুলোও অনেক উন্নত। নিজ দেশে ফিরে আসতে পেরে আমি খুশি।’
গত কয়েক বছরে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিদ্যুৎ-বিভ্রাট কমে আসাও প্রবাসীদের ফেরার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, রিমোট ওয়ার্কের সুবিধা থাকায় অনেক পেশাজীবী বিদেশের চাকরি ছেড়ে এখন নিজ দেশেই নিরাপদ জীবন যাপনের সুযোগ পাচ্ছেন।