হোম > ফ্যাক্টচেক > দেশ

‘বেদে নারী’দের চুল কাটার ভিডিও ভাইরাল, অভিযুক্ত কি সত্যিই মুগদার জামায়াত নেতা

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

বেদে সম্প্রদায়ের দুই নারীর চুল কেটে শারীরিক নির্যাতন করেছেন জামায়াত নেতা দাবিতে ভিডিও প্রচার। ছবি: স্ক্রিনশট

বেদে সম্প্রদায়ের দুই নারীর চুল কেটে দেওয়ার মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন করেছেন জামায়াত নেতা—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

এই দাবিতে পোস্ট আছে এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে

Afzal Hossen’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ৩ জুন রাত ১০টার দিকে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়, যা আলোচিত দাবিতে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। প্রচারিত ভিডিওটি ৪ জুন দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ২৭ হাজার বারের বেশি দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটিতে ১ হাজার ৬০০ রিয়্যাকশন, ৪৭৯ কমেন্ট ও ৩ হাজার ১০০ শেয়ার রয়েছে।

শেয়ার করা ভিডিওর কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ ব্যবহারকারী আলোচিত দাবিটিকে সত্য মনে করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

পোস্টের কমেন্ট। ছবি: স্ক্রিনশট

আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান

আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ের শুরুতে ভাইরাল ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। ১৭ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটিতে দেখা যায়, গাছের সঙ্গে রশি দিয়ে হাত বাঁধা তিনজন নারী দাঁড়িয়ে আছেন। এক বয়স্ক ব্যক্তি কাঁচি দিয়ে এক নারীর চুল কেটে দিচ্ছেন। তখন ভুক্তভোগী নারী চুল না কাটার আকুতি জানিয়ে বলছেন, ‘বাবা, চুলডি কাইট্টো না, বাবা।’ তখন ওই ব্যক্তি বলেন, ‘তরে পুশকুনিতে (পুকুরে) ফালাইয়া দিমু। চুল থাকলে তোর ঠান্ডা লাইগা যাইব। তোরে পুশকুনিত ফালাইয়া মারমু। এমনে মারমু না।’ এ সময় ওই তিন নারী বারবার আকুতি জানাতে থাকেন।

পর্যবেক্ষণে ভিডিওর টেক্সট অন ক্যাপশনে (বা ভিডিওতে ইনসার্ট করে দেওয়া স্থির লেখা) দাবি করা হচ্ছে, ‘সাপের খেলা দেখাতে এলাকায় প্রবেশ করায় বেদে পরিবারের নারীদের চুল কেঁটে দিয়েছে মুগদা উপজেলা জামাতের নেতা আলি হাসান।’

তবে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার কোনো গণমাধ্যমে মুগদার বা অন্য কোনো এলাকার জামায়াত নেতার সম্পৃক্ততার এমন কোনো সংবাদের প্রমাণ মেলেনি। এমনকি বাংলাদেশে ‘মুগদা উপজেলা’ বলেও কোনো উপজেলা নেই। বরং, রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি এলাকার নাম মুগদা।

পরে ভিডিওটির কী–ফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ অনুসন্ধান করা হয়। অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। নারায়ণগঞ্জের ‘রূপগঞ্জে চুরির অভিযোগে ৩ নারীকে বেঁধে কেটে ফেলা হয়েছে মাথার চুল’—শিরোনামে চলতি বছরের ৩ মার্চ শেয়ার করা ওই ভিডিও প্রতিবেদনের দৃশ্যের সঙ্গে ফেসবুকে প্রচারিত ভিডিওর মিল পাওয়া যায়।

এটিএন নিউজের ইউটিউব প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘রূপগঞ্জে চুরির অভিযোগে ৩ নারীর চুল কেটে গাছে বেঁধে মারধর’ শিরোনামে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। চলতি বছরের ২ মার্চ প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ডহরগাঁও এলাকায় স্বর্ণের চেইন চুরির অভিযোগ তুলে তিন নারীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করা হয় এবং তাঁদের চুল কেটে দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই তিন নারীকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়।

অভিযুক্ত বাড়ির মালিক সেলিম মিয়া দাবি করেন, তাঁর স্ত্রীর সোনার চেইন নিয়ে পালানোর সময় ওই নারীরা ধরা পড়েছিলেন। তবে তিন নারীর দাবি, তাঁরা কাজ ও বাসাভাড়া খোঁজার উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তা মেহেদী ইসলাম সে সময় জানান, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে বেঁধে মারধর করা বা চুল কেটে দেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই তথ্য পাওয়া যায় জাতীয় দৈনিক ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনেও

প্রথম আলোর প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিনশট

মূলত, জাতীয় গণমাধ্যমের এসব প্রতিবেদনের কোথাও ঘটনাটির সঙ্গে কোনো জামায়াত নেতা বা রাজনৈতিক সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চুরির অভিযোগে স্থানীয়দের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটি ঘটনা ছিল।

এমনকি, এই তিন জন নারী যে বেদে সেই বিষয়েও কোথাও কোনো তথ্য–প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

সিদ্ধান্ত

চলতি বছরের মার্চ মাসে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চুরির অভিযোগে তিন নারীকে গাছে বেঁধে নির্যাতন ও চুল কেটে দেওয়ার একটি স্থানীয় ঘটনাকে বর্তমানে ‘মুগদা উপজেলা জামায়াত নেতা আলি হাসান কর্তৃক বেদে নারীদের নির্যাতন’ দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে, যা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com

ছাত্রলীগের মিছিল নিয়ে তথ্যমন্ত্রীর নামে ছড়ানো ফটোকার্ডটি ভুয়া

স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শাশুড়িকে বিয়ের খবরটি ভারতের, জামায়াত নেতার নামে মিথ্যা প্রচার

জুলাই আন্দোলনের ভিডিওকে আ. লীগের মিছিল দাবিতে প্রচার

সুনামগঞ্জের ‘চোর নির্মূল কমিটি’র অভিযানকে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বলে প্রচার

‘ছেলের সামনে থেকে মাকে তুলে নিয়ে যাওয়া’র ভিডিওটি ভারতীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বানানো

কুমিল্লায় শিশু নির্যাতনের ভিডিওকে আ.লীগ নেতার ছেলেকে হত্যা দাবিতে প্রচার

বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিলের দাবিটি গুজব

সীমান্তে মাইন পুঁততে গিয়ে ভারতীয় গুপ্তচর আটকের দাবিটি মুন্সিগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতার

‘জামাত দেশ রক্ষার জন্য রাজনীতি করে’—রুমিন ফারহানার নামে ছড়ানো বক্তব্যটি বানোয়াট

ট্রাম্পের স্কটল্যান্ড সফরের ভিডিওকে ভারতে শেখ হাসিনার গাড়িবহর বলে প্রচার