‘বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কারণেই বাংলাদেশ এতিম হয়ে যায়। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে তাঁকে সর্বসম্মতভাবে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মেনে নেওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তাঁর হত্যাকাণ্ড মুসলিম উম্মাহর সেই স্বপ্নকে চূর্ণ করে দেয়’—মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের মন্তব্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উদ্ধৃতি সংবলিত ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে।
‘আজকের কণ্ঠ ডিজিটাল’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ১৮ মার্চ দুপুর ২টা ৫৪ মিনিটে একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়। আলোচিত দাবিতে এটিই সম্ভাব্য প্রথম পোস্ট এবং এই পোস্টটিই সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। পোস্টটিতে আজ (২০ মার্চ) বেলা ১টা পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার রিঅ্যাকশন, ৩৮২ কমেন্ট এবং ১ হাজার ৪০০ শেয়ার রয়েছে।
শেয়ার করা এসব অ্যাকাউন্ট ও পেজের পোস্টগুলো পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ পোস্টে আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমালোচনামূলক কথা বলা হয়েছে। এসব পোস্টের কমেন্টে অনেকেই মন্তব্যটিকে সত্য মনে করে মতামত জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ ভিন্নমতও প্রকাশ করেছেন।
আজকের পত্রিকার অনুসন্ধান
ফটোকার্ডটিতে মাহাথির মোহাম্মদের ছবি ও নামের সঙ্গে উদ্ধৃতিটি যুক্ত করা হলেও কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি।
এ ছাড়া পোস্টের ক্যাপশনে ‘মাহাথির মোহাম্মদের চোখে বঙ্গবন্ধু’, ১৯৭৫ সালে সপরিবারে হত্যা, ১৯৭৪ সালের ওআইসি সম্মেলন, বিশ্বনেতাদের চোখে বঙ্গবন্ধু, ঐক্যের প্রতীক বঙ্গবন্ধু—ইত্যাদি শব্দগুচ্ছ উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেশি বা আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যমে ফটোকার্ডে প্রচারিত মাহাথির মোহাম্মদের এমন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে অনুসন্ধানে ‘The CrossExam with Kazi Mamun’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রকাশিত মাহাথির মোহাম্মদের একটি সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়। ১৭ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ভিডিওটির ৫ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের দিকে উপস্থাপক কাজী মামুন প্রশ্ন করেন, ‘যদি আমরা ৫০ বছর পেছনে যাই, বাংলাদেশের জন্মলগ্নে, শেখ মুজিবের দর্শনে কি আপনি অনুপ্রেরণা দেখেছিলেন? ঔপনিবেশিক-পরবর্তী এক সহ-নেতা হিসেবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পথে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে আপনি তাঁকে কীভাবে দেখেছিলেন?’
প্রশ্নের জবাবে মাহাথির মোহাম্মদ বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই সময়ের নেতা, যখন পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে পৃথক হয়ে “বাংলাদেশ” নামে নতুন দেশ গড়ে তোলে। এই অবদানের জন্য বাংলাদেশিদের তাঁর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকা উচিত। পরে তাঁকে হত্যা করা হয়, এরপর তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী হন।’
এ ছাড়া ভিডিওটিতে মাহাথির মোহাম্মদ তাঁর রাজনৈতিক জীবন, মালয়েশিয়ার অবস্থা, মুসলিম বিশ্বের করণীয়, শেখ হাসিনা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে কীভাবে তাল মিলিয়ে চলা যায়—এসব বিষয়ে কথা বললেও আলোচিত দাবির মতো কোনো মন্তব্য করেননি।
সিদ্ধান্ত
মাহাথির মোহাম্মদের নামে প্রচারিত বক্তব্যটির কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাঁর প্রকাশিত সাক্ষাৎকারেও এমন মন্তব্যের উল্লেখ নেই। সুতরাং ফটোকার্ডের উদ্ধৃতিটি ভিত্তিহীন।