হোম > ফ্যাক্টচেক > দেশ

রোগীকে ধর্ষণের দাবিতে ছড়ানো ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার, ধর্ষককে আদালতে গুলির দাবিটিও ভুয়া

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

সামাজিক মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

রাজধানীর পল্লবীতে সম্প্রতি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে, বিচারের দাবি উঠছে, সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একশ্রেণির ব্যবহারকারী পুরোনো ও ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনাগুলোকে নতুন অপরাধের ভিডিও বলে প্রচার করছে। এসব দাবিতে শেয়ার করা ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ তৈরি করছে।

আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিমের অনুসন্ধানে অন্তত এমন তিনটি ঘটনাকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সরকারি হাসপাতালে রোগীকে ধর্ষণ

সিলেটে ওসমানী মেডিকেলে ‘রোগী ধর্ষণ’-এর দাবিতে প্রচারিত ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

‘Saddam Hosan Ohide’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ১ মিনিট ১০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও https://perma.cc/PGM8-4HDJ শেয়ার করা হয়েছে, যা ইতিমধ্যে প্রায় ৮ লাখ বার দেখা হয়েছে। ওই ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়েছে—‘মেয়ে রোগীকে ডাক্তার কর্তৃক ধর্ষণের শিকার! সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে!’ এমন দাবিতে ছড়িয়ে পড়া পোস্টের নিচে ব্যবহারকারীদের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

আলোচিত দাবির বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এমন কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে গণমাধ্যমের স্ক্রিনশট সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর বেসরকারি চ্যানেল টুয়েন্টিফোর টিভির একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়।

আজকের পত্রিকার কম্পেরিজন।

ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি ২০২২ সালের। সে সময় বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের মনোরোগ বিভাগের প্রধান ডা. রামেন্দ্র কুমার সিংহ ওরফে আর কে রয়েলকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের তৎকালীন উপ-কমিশনার আজবাহার আলী শেখ জানিয়েছিলেন, ২০১৮ সাল থেকে এক তরুণীর সঙ্গে ডা. রয়েলের সম্পর্ক ছিল। ওই তরুণী চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার পর চিকিৎসক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে একটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ছাড়া আরও কিছু গণমাধ্যম ( , ) থেকেও একই তথ্য পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, চার বছর আগে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসকের অপরাধের ঘটনাকে সম্প্রতি ‘হাসপাতালে রোগী ধর্ষণ’—দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

সিলেটে ধর্ষণ চেষ্টা

সিলেটে ছাত্রদল নেতার ‘প্রকাশ্য ধর্ষণ চেষ্টা’ দাবিতে প্রচারিত ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও শেয়ার করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে—‘সিলেটে কলেজ ছাত্রীকে রাস্তায় একা পেয়ে প্রকাশ্য ধর্ষণের চেষ্টা ছাত্রদলের নেতার। মেয়েটি বাঁচার জন্য আশেপাশের লোকজনদের ডাকছে কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছে না। সারাদেশে চলছে ধর্ষণ আর খুনের মহা উৎসব।’

পোস্টের কমেন্টে কেউ কেউ ‘নতুন বাংলাদেশ’কে খোঁচা দিয়ে বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন—‘ছাত্রদল যেই হোক, বিচার হবেই।’

ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ে দেখা যায়, এই ঘটনাটি সিলেটের নয়, এমনকি এটি ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনাও ছিল না। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজ-এর ইউটিউব চ্যানেলে ‘নারীকে মারধরের ভিডিও ভাইরাল, ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার’ শিরোনামে হুবহু একই ভিডিওটি পাওয়া যায়।

আজকের পত্রিকার কম্পেরিজন।

এ ছাড়া একই শিরোনামে জাগো নিউজের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি পিরোজপুরের।

পিরোজপুরের নাজিরপুর মাটিভাংগা ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মুন্নার বিরুদ্ধে একটি নির্জন বাগানে এক নারীকে ধরে টানাটানি ও চড়-থাপ্পড় মারার ভিডিও ভাইরাল হয়। অভিযুক্ত মুন্না মারধরের কথা স্বীকার করে দাবি করেছিলেন, ওই নারী তাঁর স্ত্রী এবং কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে তিনি চড়-থাপ্পড় দিয়েছিলেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরপরই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে পিরোজপুর জেলা ছাত্রদল মুন্নাকে সংগঠনের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে।

অর্থাৎ, পিরোজপুরে ছাত্রদল নেতার প্রকাশ্যে স্ত্রীকে মারধরের ঘটনাকে সম্প্রতি ‘সিলেটে ছাত্রদল নেতার প্রকাশ্যে ধর্ষণ চেষ্টা’ দাবিতে ছড়ানো হচ্ছে।

আদালত চত্বরে ধর্ষককে গুলি

খুলনায় আদালত প্রাঙ্গণে ‘ধর্ষকের ওপর জনতার বিচার’ ক্যাপশনে প্রচারিত ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

অপরদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ৫০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে—‘খুলনা কোর্টে শিশু ধর্ষণকারীকে আদালতে তোলার সময় গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা।’

‘গুরুদাসপুর উপজেলা যুবলীগ’ নামের একটি ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে লেখা হয়, সাধারণ জনগণ ধর্ষণের বিচার না পেয়ে নিজেই বিচার করে ফেলেছে। ভিডিওটি এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ১৬ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে এবং কয়েক হাজার শেয়ার করা হয়েছে।

ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে অনুসন্ধানে বেসরকারি টিভি চ্যানেল যমুনা টেলিভিশনের একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর প্রকাশিত ওই ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর মিল পাওয়া যায়।

আজকের পত্রিকার কম্পেরিজন।

এ ছাড়া একই দিনে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গেও ভিডিওর দৃশ্যের মিল রয়েছে। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এটি খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের বাইরের একটি খুনের ঘটনা। সেদিন দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আদালত থেকে হাজিরা দিয়ে বের হয়ে মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে চা পান করছিলেন দুই ব্যক্তি। এ সময় চার থেকে পাঁচজন দুর্বৃত্ত হেঁটে এসে তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি করে পালিয়ে যায়, আক্রান্ত দুজনই নিহত হন।

সে সময় প্রকাশিত কোনো প্রতিবেদনেই এই ঘটনার সঙ্গে ধর্ষণ সম্পর্কিত কোনো তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, আদালত প্রাঙ্গণে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ডের ভিডিওকে শিশু ধর্ষণের কারণে ‘জনতার বিচার’ দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com

ছাত্রলীগের মিছিল নিয়ে তথ্যমন্ত্রীর নামে ছড়ানো ফটোকার্ডটি ভুয়া

স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শাশুড়িকে বিয়ের খবরটি ভারতের, জামায়াত নেতার নামে মিথ্যা প্রচার

জুলাই আন্দোলনের ভিডিওকে আ. লীগের মিছিল দাবিতে প্রচার

সুনামগঞ্জের ‘চোর নির্মূল কমিটি’র অভিযানকে সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বলে প্রচার

‘ছেলের সামনে থেকে মাকে তুলে নিয়ে যাওয়া’র ভিডিওটি ভারতীয় কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বানানো

কুমিল্লায় শিশু নির্যাতনের ভিডিওকে আ.লীগ নেতার ছেলেকে হত্যা দাবিতে প্রচার

বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিলের দাবিটি গুজব

সীমান্তে মাইন পুঁততে গিয়ে ভারতীয় গুপ্তচর আটকের দাবিটি মুন্সিগঞ্জে নির্বাচনী সহিংসতার

‘জামাত দেশ রক্ষার জন্য রাজনীতি করে’—রুমিন ফারহানার নামে ছড়ানো বক্তব্যটি বানোয়াট

ট্রাম্পের স্কটল্যান্ড সফরের ভিডিওকে ভারতে শেখ হাসিনার গাড়িবহর বলে প্রচার