মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং উত্তেজনা বৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, যদি সোনার দাম প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১০০ মার্কিন ডলারের ওপরে স্থির থাকতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী প্রবণতায় প্রবেশ করেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। এমনটাই বলছেন ট্রেডাররা। এই পরিস্থিতি চলতি সপ্তাহেই ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। থাইল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম ব্যাংকক পোস্টের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গত সোমবার সোনার দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩০০ ডলারের নিচে নেমে যায়, যা ২০২৬ সালের সর্বনিম্ন পর্যায়। ইরান বনাম ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে প্রবেশ করায় এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন হামলার হুমকি দেওয়ায় এই পতন ঘটে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দুই দিনের সময়সীমা দেন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে হবে। নইলে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে বোমা হামলা চালানো হবে। জবাবে ইরান জানায়, তারা এই কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি ‘সম্পূর্ণভাবে’ বন্ধ করে দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলো সরকারি বন্ড ধারণ করে, সেগুলোসহ সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালাবে।
থাইল্যান্ডের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং ঐতিহ্যবাহী গোল্ড ট্রেডিং কোম্পানি হুয়া সেং হেং-এর গবেষণা বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট সিরিলুক পাকোটিপ্রাফা ব্যাংকক পোস্টকে বলেন, ‘আমরা এখন প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২৩৫ এবং ৪ হাজার ১০০ ডলারে দুটি বড় প্রতিরোধস্তর দেখতে পাচ্ছি। যদি দাম ৪ হাজার ১০০ ডলারের নিচে নেমে যায়, তাহলে বোঝা যাবে সোনা দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী প্রবণতায় ঢুকে পড়ছে।’ সোজা কথায় বললে, সোনার দাম দীর্ঘদিন ধরে নিচে নামতে থাকবে।
সাধারণত বাজার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ স্তর (Resistance Level) হলো এমন একটি নির্দিষ্ট মূল্যের সীমা, যেখানে পৌঁছালে কোনো শেয়ার বা পণ্যের দাম আর সাধারণত বাড়তে পারে না এবং সেখান থেকে দাম কমে যাওয়ার বা বাউন্স করার প্রবণতা দেখা যায়।
এই সপ্তাহেই ৪ হাজার ১০০ ডলারের স্তর স্পর্শ করার সম্ভাবনা থাকায় সিরিলুক মনে করছেন বছরের শেষ নাগাদ সোনার দাম প্রতি আউন্স ৪,০০০ ডলারের নিচেও নেমে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘শনিবার ট্রাম্প তেহরানকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন—হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে, না হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হবে। ইরান পাল্টা আঘাতের হুমকি দেওয়ায় সংঘাত আমাদের ধারণার চেয়ে দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।’
থাইল্যান্ডের স্থানীয় বাজারে ইতিমধ্যেই সোনার বার প্রতি বাহাত-ওজন ৭০ হাজার বাথের নিচে নেমে গেছে। সোমবার বিকেলে এটি ৬৫ হাজার বাথে লেনদেন হয়েছে এবং দিনে মোট ৬৬ বার দামের ওঠানামা হয়েছে বলে জানিয়েছে গোল্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন (জিটিএ)।
মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে ব্যবহৃত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত সোনা গত সপ্তাহে ১০ শতাংশের বেশি মূল্য হারিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে এবং বৈশ্বিক সুদের হার বৃদ্ধির প্রত্যাশাও জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে। সিএমই ফেডওয়াচ টুল অনুযায়ী, ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা প্রায় ৩২ শতাংশ।
জিটিএ–এর সভাপতি জিট্টি ট্যাংসিথপাকদি সতর্ক করে বলেছেন, সোনার দাম আরও প্রতি আউন্স ১০০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত কমতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের জল্পনামূলক উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে সোনা কেনাবেচায় না জড়াতে পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন না যে সোনার দাম ৪ হাজার ডলারের নিচে নামবে। তাঁর মতে, সোনা এখনো ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে। জিটিএ ২০২৬ সালের জন্য তাদের পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখেছে—প্রতি আউন্স ৬ হাজার ডলার এবং সোনার বার প্রতি বাহাত-ওজন ৯০ হাজার বাথ।