ছেলের বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ তুলে মা-বাবাকে মারধর এবং অপমান সইতে না পেরে গৃহবধূর আত্মহত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। জামালপুর সদর থানায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এই মামলা করেন মারা যাওয়া নারীর ছেলে সজীব। এতে ১০ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার পর সদর থানা-পুলিশ রাতেই অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা হলেন সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য নায়েব আলীর ছেলে হৃদয় এবং গ্রাম্য মাতব্বর আজিজুল রহমানের ছেলে গোলাম কিবরিয়া। তাঁদের বাড়ি কেন্দুয়া ইউনিয়নের পূর্ব কুটামনি খলিলহাটা গ্রামে।
আত্মহত্যা করে মারা যাওয়া নারীর নাম জোসনা বেগম। বৃহস্পতিবার ঘর থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়।
থানায় দেওয়া অভিযোগ থেকে জানা গেছে, পূর্ব কুটামনি খলিলহাটা গ্রামের কৃষক সুরুজ মিয়া ও জোসনা বেগম তাঁদের দুই ছেলে সুজন মিয়া ও সজিব মিয়াকে নিয়ে বসবাস করেন। গত বুধবার রাতে দুই ছেলে বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। ওই দিন গভীর রাতে ওই এলাকার নায়েব আলীর ছেলে মো. কাউসার মিয়ার গোয়ালঘর থেকে গরু চুরির গুজব ওঠে এবং লোকজন বাড়িতে ভিড় করে। খবর পেয়ে কাউসারের মামা নায়েব আলীও ওই বাড়িতে আসেন। কিন্তু তখন উপস্থিত লোকজন দেখতে পায়, গোয়ালঘর থেকে গরু চুরি হয়নি এবং ঘর তালাবদ্ধ। তবু তারা সুরুজ মিয়ার ছেলে সুজন চুরি করতে এসেছিল মিথ্যা সন্দেহে নায়েব আলী স্থানীয় লোকজন নিয়ে সুরুজ মিয়ার বাড়িতে যান।
এ সময় নায়েব আলী, কাউসার ও তাঁর লোকজন সুরুজ মিয়ার বড় ছেলে সুজন মিয়াকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর মা-বাবা এতে বাধা দিলে উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সুজন পালিয়ে যান। এরপর তাঁর মা-বাবাকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় কাউসারের বাড়ির উঠানে। এ সময় চুরির অভিযোগ উপজেলার খলিলহাটা এলাকা থেকে রঞ্জু মিয়া (৩২) ও সুহেল মিয়া নামের আরও দুজনকে ধরে আনা হয়।
পরে রাতেই সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোহাম্মদ নায়েব আলীর নির্দেশে দড়ি দিয়ে বেঁধে সুজনের বাবা সুরুজ মিয়া, রঞ্জু ও সুহেলকে মারধর করা হয়। সুরুজ মিয়াকে মারধরের সময় জোসনা বেগম ফেরানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁকেও মারধর ও ছেলের অপরাধে বিভিন্ন অপবাদ দিতে থাকে লোকজন। এর একপর্যায়ে সুরুজ মিয়াকে বেঁধে রেখে রাতেই জোসনাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সকালে জোসনা বেগম আবার ওই বাড়ির উঠানে যান স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে। এ সময় আবারও তাঁকে মারধর ও নানা অপবাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ওই তিনজনকে এক রশিতে হাত বেঁধে এলাকায় হাঁটিয়ে কেন্দুয়া ইউনিয়ন পরিষদে নেওয়া হয়। এসব ঘটনার অপমান সইতে না পেরে বাড়িতে গিয়ে জোসনা বেগম গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। খবর পেয়ে দুপুরে পুলিশ তাঁর লাশ উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। চুরির অপবাদে মারধরের শিকার তিন ব্যক্তিকে উদ্ধার করে তাঁদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মামলা গ্রহণ করে দোষীদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করা হয়। রাতে দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয়েছে। মামলার অপর আসামিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।