জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার কাছে ২০২৪ সালের বন্যার টাকার হিসাব চেয়েছেন এক ব্যক্তি। আজ মঙ্গলবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘ঈদ আনন্দ মিছিল’-বিষয়ক এক সংবাদ সম্মেলন চলাকালে এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হন আসিফ।
ওই ব্যক্তি নিজেকে জুলাই যোদ্ধা বলে পরিচয় দেন। আসিফের উদ্দেশে ক্ষুব্ধ স্বরে তিনি বলেন, ‘আপনাদের কাছে বন্যার যে টাকাগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেই টাকাগুলোর কি হিসাব এখন পাওয়া যাবে? বন্যার টাকা তো ফান্ডে দেওয়া হয়েছিল, সেই টাকা কোথায়?’
প্রশ্নকারী ওই ব্যক্তি আসিফ মাহমুদকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘মববাজ’ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, ‘বন্যার টাকা কোথায় গেছে, সেটি কি আমি জানতে চাইতে পারি না! উনি (আসিফ মাহমুদ) কোটি টাকার গাড়িতে চড়েন, এই টাকা কই থেকে আসে?’
এ সময় ওই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, জুলাই যোদ্ধাদের কোনো খোঁজখবর নেননি আসিফ মাহমুদ। এ সময় প্রশ্নকারী ওই ব্যক্তিকে ঘিরে হট্টগোল তৈরি হয়। পরে তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ জানান, আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানীতে তিন দিনব্যাপী ঈদ উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। ঈদের দিন বর্ণাঢ্য ঈদ আনন্দ মিছিলের পাশাপাশি চাঁদরাতে মেহেদি উৎসব ও সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং ঈদের পরদিন ঘুড়ি উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এই আয়োজন বাস্তবায়নে ক্রাউডফান্ডিং অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আর্থিক সহযোগিতা নেওয়া হবে।
আসিফ মাহমুদ বলেন, প্রায় পাঁচ শ বছর আগে এই অঞ্চলে ঈদের মিছিল ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সামাজিক উৎসবের প্রতীক। সুলতানি আমল থেকে শুরু করে মোগল আমলেও ঈদের দিন বর্ণাঢ্য মিছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। হাতি, ঘোড়া ও নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে ঈদের মিছিল তখন নাগরিক জীবনের প্রাণবন্ত উৎসব হিসেবে উদ্যাপিত হতো।
এনসিপির মুখপাত্র বলেন, পরে ঔপনিবেশিক শাসন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক দমনের ফলে এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় এবং ঈদের আনন্দ অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। তবে ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুনভাবে সাংস্কৃতিক চর্চার পুনরুত্থান ঘটেছে।
আসিফ মাহমুদ জানান, গত বছর রাজধানীতে ঈদের মিছিলে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। শহরের বিভিন্ন সড়ক দিয়ে মিছিল অতিক্রম করার সময় পথচারীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে যোগ দেন। শিশু, তরুণ ও প্রবীণ—সব বয়সী মানুষ রাস্তায় নেমে এসে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন, ফলে পুরো শহর উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। এই ধারাবাহিকতায় এবার ঈদকে কেন্দ্র করে তিন দিনব্যাপী উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঈদের আগের দিন চাঁদরাতে রাজধানীর রবীন্দ্র সরোবরে মেহেদি উৎসব ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হবে। সেখানে ঈদের গান, কবিতা ও বিভিন্ন পরিবেশনা থাকবে এবং ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই এতে অংশ নিতে পারবেন।
ঈদের দিন সকাল ১০টায় জাতীয় ঈদগাহের সামনে (হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ) থেকে বর্ণাঢ্য ঈদ আনন্দ মিছিল শুরু হবে। ঈদের নামাজের পর রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে নাগরিক উদ্যোগে ছোট ছোট ঝটিকা মিছিল নিয়ে মানুষ সেখানে জড়ো হবেন। মিছিলটি দোয়েল চত্বর হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে দিয়ে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে শেষ হবে। শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করতে মিছিলের একটি বড় অংশে ‘কিডস জোন’ রাখা হবে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ঝটিকা মিছিলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ মিছিলকে পুরস্কৃত করা হবে। ঐতিহ্য অনুযায়ী মিছিলে ঐতিহাসিক চরিত্রের উপস্থিতি, প্ল্যাকার্ড, হাতি ও ঘোড়ার গাড়িসহ নানা আয়োজন থাকবে। ঈদের পরদিন ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুড়ি উৎসব আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আয়োজকদের মতে, ঢাকার পুরোনো এই ঘুড়ি উৎসবকে ঈদের সঙ্গে যুক্ত করলে অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক চর্চা আরও বিস্তৃত হবে।
আসিফ মাহমুদ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ এবং সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি। আমাদের সঙ্গে যে কেউ চাইলে ভলান্টিয়ার হিসেবে যুক্ত হতে পারবেন এবং আমরা এটি একধরনের ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে এই ঈদ মিছিলের ফান্ড (তহবিল) কালেক্ট (সংগ্রহ) করব।’
তিন দিনের এই ঈদ উৎসব আয়োজন বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি ও কয়েকটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। ঈদ আনন্দ মিছিল-২০২৬ আয়োজন কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া, আব্দুল কাদের, লুৎফর রহমান, সারোয়ার তুষার, সাইয়েদ জামিল, সৈয়দা নীলিমা দোলা, আব্দুল্লাহ আল কাফি, আফজাল হোসাইন, আহনাফ তাহমীদ, আল আমিন টুটুল, আল মাশনূন, আরিফুর রহমান, মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ, জাহিদ আহসান, জুবায়ের হোসাইন, তারেক এ আদেল, তুহিন খান, ডা. শাফিন ইব্রাহিম হোসাইন, নুসরাত তাবাসসুম প্রমুখ।