দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ ও একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর ভাঙনরোধে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর এলাকায় তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে নদীরক্ষার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নদী থেকেই ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক সাবেক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। উত্তোলিত সেই বালু কিনে নিয়ে আবার ব্যবহার করা হচ্ছে নদীতীর সংরক্ষণকাজে। দীর্ঘদিন ধরে দিন-রাত বালু উত্তোলন চললেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, হালদা নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়া, বালু ও মাটি তোলা এবং চর কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সচেতন মহল।
আজ রোববার সকালে সরেজমিনে সুন্দরপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাড়িঘাটা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নদীতীর সংরক্ষণ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। প্রকল্প এলাকার অদূরে হালদা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। পরে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই বালু সরাসরি নদীর তীরে ফেলা হচ্ছে। আর এই বালু উত্তোলন করছেন সুন্দরপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শামশুল আলম, যিনি সিনা মেম্বার নামে পরিচিত।
ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের কথা স্বীকার করে সিনা মেম্বার বলেন, ‘বালু উত্তোলনের জায়গাটি আমার নিজের জায়গা। এখান থেকে বালু উত্তোলনের জন্য আবার কার কাছ থেকে অনুমতি নেব?’ এ কথা বলে তিনি মেজাজ হারান। এ সময় তিনি সাংবাদিককে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘এত বছর কোথায় ছিলেন?’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে দিন-রাত অব্যাহতভাবে নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হলেও এ বিষয়ে প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, হালদা নদী রক্ষার জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। অথচ সেই প্রকল্পের কাজেই নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে, অন্যদিকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে হালদা নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিলায়েন্স করপোরেশন ও আমিন অ্যান্ড কোম্পানি। প্রকল্পের আওতায় বাঁধ রক্ষার জন্য বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সিসি ব্লক স্থাপন ও জিও ব্যাগ ফেলা হবে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রিলায়েন্স করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘কাজটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় কাজ শুরু করি। আমরা স্থানীয় বাসিন্দা সিনা মেম্বারের কাছ থেকে বালু কিনে নিচ্ছি। তিনি কোথা থেকে বালু দিচ্ছেন, সেটি আমার দেখার বিষয় নয়।’
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সোহাগ তালুকদার বলেন, ‘ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত নই।’
বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হালদা রিসার্চ ল্যাবরেটরির চেয়ারম্যান ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, ‘এটি অত্যন্ত অন্যায় ও আত্মঘাতী একটি কাজ। আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে আহ্বান জানাব, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে। পাশাপাশি প্রশাসনেরও এ বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো উচিত।’
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ‘হালদা নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’