ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা কেবল তেহরানের ভাগ্যই নয়, বরং প্রতিবেশী আফগানিস্তানের তালেবান শাসনের পতনের এক নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বর্তমানে ইরানে কেন্দ্রীয় শাসনের যে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে দেশটিতে নির্বাসিত হাজার হাজার সাবেক আফগান সেনাসদস্য একত্র হতে পারে। একটি নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ের অভাবে যারা এত দিন তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে পারছিল না, ৬০০ মাইলের দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় এখন ইরানই হতে পারে তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত লঞ্চপ্যাড।
এমনটি মনে করছেন লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো ডেভিড লয়েন। এই মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞের মতে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আফগানিস্তান দ্বিমুখী যুদ্ধের মুখে পড়েছে। পশ্চিমে যখন ইরান তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে মত্ত, তখন পূর্ব সীমান্তে পাকিস্তানের সঙ্গে তালেবানের সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত এক সপ্তাহে পাকিস্তান কেবল সীমান্তেই সংঘর্ষ সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং কাবুল ও কান্দাহারে সরাসরি বিমান হামলা চালিয়েছে।
এই সংঘাত গত ৩০ বছরের পাকিস্তানি নীতির চরম ব্যর্থতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে যে তালেবানকে পাকিস্তান নিজের স্বার্থে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে লালন-পালন করেছিল, ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর সেই তালেবানই এখন পাকিস্তানের চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছে। ইসলামাবাদের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকার বদলে তালেবান এখন পাকিস্তানে হামলাকারী জঙ্গিগোষ্ঠী ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’কে (টিটিপি) সরাসরি মদদ দিচ্ছে। টিটিপির ক্রমবর্ধমান হামলায় ক্ষিপ্ত হয়েই পাকিস্তান এখন তার পালিত শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।
তবে তালেবানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে পাকিস্তান এখন অবিশ্বস্ত। পাকিস্তান নিজেই ‘আফগানিস্তান ইনডিপেনডেন্টস ফ্রন্ট’ নামক একটি মিলিশিয়া বাহিনী তৈরি করেছে, কিন্তু আফগানিস্তানের ভেতরে তাদের কোনো জনসমর্থন নেই। উপরন্তু, ইসলামপন্থী উগ্রবাদীদের দীর্ঘকাল সমর্থন দেওয়ার ট্র্যাক রেকর্ড থাকায় কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক বা প্রগতিশীল আফগান গোষ্ঠী পাকিস্তানকে বিশ্বাস করছে না।
অন্যদিকে ইরানের বর্তমান বিশৃঙ্খলা আফগান প্রতিরোধ যোদ্ধাদের জন্য এক ‘শাপে বর’ হতে পারে। যদি ইরানি শাসনব্যবস্থা পঙ্গু হয়ে যায়, তবে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণের অভাবে বিরোধীরা সেখানে নিরাপদ ঘাঁটি গেড়ে আফগানিস্তানের ভেতরে অপারেশন চালাতে পারবে।
বর্তমানে আফগানিস্তানে মানবাধিকারের কোনো বালাই নেই। তালেবানের নতুন দণ্ডবিধিতে নারীদের সব অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং পুরুষদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছে মোল্লারা। স্বামীদের ওপর আইনি লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে স্ত্রীদের পেটানোর জন্য, যতক্ষণ না হাড় ভাঙছে বা গভীর ক্ষত তৈরি হচ্ছে। এই চরম নারীবিদ্বেষী শাসনের সমান্তরালে আফগানিস্তান এখন আল-কায়েদাসহ ২০টির বেশি আন্তর্জাতিক জিহাদি গোষ্ঠীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো বর্তমানে আফগানিস্তানে কোনো সশস্ত্র বা শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধকে সমর্থন দিচ্ছে না। মানবিক সহায়তার নামে তারা তালেবানের সঙ্গে একধরনের ‘এনগেজমেন্ট’ বা যোগাযোগ রাখছে, যা আসলে আফগান জনগণের দুর্ভোগকেই দীর্ঘায়িত করছে। আন্তর্জাতিক সমর্থনের আশা ছেড়ে দিয়ে আফগানবিরোধী গোষ্ঠীগুলো এখন বুঝতে পারছে, ইরানের এই অস্থিতিশীলতাই তাদের জন্য শেষ সুযোগ।
সর্বোপরি, যুদ্ধ সব সময় অনিশ্চিত পথে হাঁটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানি ‘রেজিম চেঞ্জ’ পরিকল্পনা হয়তো কেবল তেহরানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে এই আগুনের আঁচ যদি আফগানিস্তানে পৌঁছায় এবং নির্বাসিত যোদ্ধারা সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করতে শুরু করে, তবে তালেবানের রক্তক্ষয়ী শাসনের অবসান হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপারমাত্র।
দ্য স্পেকট্যাটর থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ