মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠার প্রথম স্ফুরণটি কিন্তু ঠিক পরিকল্পনা করে হয়নি। ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশের নিরীহ মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনারা যখন হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তাৎক্ষণিকভাবে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীর বাঙালি সদস্যরা আত্মরক্ষার জন্য রুখে দাঁড়ান। সেই মুহূর্ত থেকেই মুক্তিযুদ্ধের শুরু। এরপর ৪ এপ্রিল সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে কর্নেল এম এ জি ওসমানী, কর্নেল রব, মেজর সফিউল্লাহ, মেজর জিয়াউর রহমান, কর্নেল নূরুজ্জামান, মেজর খালেদ মোশাররফসহ আরও কয়েকজন সম্মিলিত হয়ে মুক্তিফৌজ নামে একটি সংগঠন করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয় ১৭ এপ্রিল, মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে শপথ নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর।
আমাদের সামরিক, আধা-সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর যেসব বাঙালি সদস্য প্রতিরোধযুদ্ধ করতে করতে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছ থেকে তাঁরা সামান্য কিছু অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য সহায়তা পাচ্ছিলেন। যে গতিতে ও ব্যাপকতায় তখন মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠা দরকার ছিল, তার তুলনায় এ সহায়তা ছিল অপর্যাপ্ত। পরিস্থিতি ও প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে মে মাস থেকে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর ন্যস্ত হয়। এই প্রথম ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে আমাদের সত্যিকারের যোগাযোগ সূচিত হলো। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তারা আমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস দিতে শুরু করল।
শক্তিশালী একটি বাহিনী গড়ে তুলে শত্রুদের পরাস্ত করে দেশ স্বাধীন করতে হবে, এ সংকল্প নিয়েই কাজ শুরু হয়। এই আত্মবিশ্বাস না থাকলে আমাদের অস্থায়ী সরকার বা মুক্তিবাহিনী—কারও পক্ষেই তো সেই পরিস্থিতিতে কিছু করা সম্ভবপর হতো না। আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ছিল অদম্য। সে কারণে আমরা অতি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করে উঠতে পেরেছিলাম।
তথ্যসূত্র: সাজ্জাদ শরিফ কর্তৃক গৃহীত মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকারের সাক্ষাৎকার, ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় প্রকাশিত