২০২৫ সালের জুলাই মাসে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মোস্তফা কাভাকেবিয়ানের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা হয়। সেই সাক্ষাৎকার পুরো ইরানে তোলপাড় সৃষ্টি করে। মোস্তফা কাভাকেবিয়ান সেখানে দাবি করেন, ক্যাথরিন পেরেজ শকদাম নামের এক নারী ১২০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে ইরানের স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুপ্রবেশ করেছিলেন।
যদিও তেহরান প্রসিকিউটর অফিস এই দাবিকে ‘অশোভন ও মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং কাভাকেবিয়ানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। কিন্তু তাতে ক্যাথরিনকে ঘিরে রহস্যের জট যেন আরও ঘনীভূত হয়েছে।
পরিচয়ের বহুরূপী মুখোশ
১৯৮২ সালে ফ্রান্সে এক ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি পরিবারে জন্ম নেন ক্যাথরিন। তিনি একাধারে মনোবিজ্ঞান, ফিন্যান্স এবং কমিউনিকেশনসে উচ্চতর ডিগ্রিধারী। আছে পাঁচটি ভাষার ওপর দখল। লন্ডনে পড়ার সময় এক ইয়েমেনি সুন্নি মুসলিমের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রস্থলে প্রবেশের সুযোগ পান। ২০১৪ সালে ডিভোর্সের পর তিনি শিয়াপন্থী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা শুরু করেন। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ইরানে অবস্থান করার সময় তিনি নিজেকে একজন একনিষ্ঠ শিয়া মুসলিম হিসেবে পরিচিত করেন। আরবাঈনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে হিজাব পরা অবস্থায় ক্যাথরিনের উপস্থিতি এবং কাসেম সোলেইমানির মেয়ে জয়নব সোলেইমানির সঙ্গে তাঁর ছবি ইরানের রক্ষণশীল মহলে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
সর্বোচ্চ মহলে প্রবেশ
বাইরে ক্যাথরিনের পরিচয় ছিল একজন সাংবাদিক হিসেবে। কিন্তু তিনি শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন ইরানের ‘অক্ষশক্তি’র অন্যতম প্রবক্তা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে নিয়মিত তাঁর নিবন্ধ প্রকাশিত হতো। রক্ষণশীল পত্রিকা ‘কায়হান’ এবং সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’ ও ‘মেহর’-এ তিনি কলাম লিখতেন। অবাক করা বিষয় ছিল, ২০১৭ সালে ইব্রাহিম রাইসির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় নেওয়া তাঁর বিশেষ সাক্ষাৎকারটি। শকদামের দাবি অনুযায়ী, পশ্চিমাদের জন্য যা ছিল অসম্ভব, তিনি তা সম্ভব করেছিলেন শুধু নিজের ‘ফরাসি পাসপোর্ট’ এবং ‘মুসলিম পরিচয়’ ব্যবহার করে। রুশ গণমাধ্যম আরটি এবং ইরানি প্রেস টিভিতে নিয়মিত বিশ্লেষক হিসেবে উপস্থিত হয়ে তিনি নিজেকে বিশ্বস্ত করে তুলেছিলেন।
ইরান ছাড়ার পর ২০২১ সালে ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’-এ একটি নিবন্ধ লিখে ক্যাথরিন পুরো বিশ্বকে চমকে দেন। সেখানে তিনি স্বীকার করেন, তিনি কখনোই শিয়া মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। শুধু তা-ই নয়, তিনি এ-ও স্বীকার করেন, তিনি তাঁর আসল পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি দেখতে চেয়েছিলেন ইরান কি শুধু ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরোধী, নাকি পুরো ইহুদি জাতির। তিনি দাবি করেন, সেখানে গিয়ে তিনি ইহুদিবিদ্বেষের চরম রূপ লক্ষ করেছেন।
গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ও অস্বীকার
ইরানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ফুয়াদ সাদেঘি দাবি করেন, শকদাম নিশ্চিতভাবেই একজন ‘মোসাদ এজেন্ট’। তাঁর মতে, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর চরম ব্যর্থতার কারণে একজন ইহুদি নারী খামেনির ওয়েবসাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন। তবে ২০২২ সালে বিবিসি পার্সিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্যাথরিন গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো রাষ্ট্রের এজেন্ট নই। আমি একজন বিশ্লেষক হিসেবে সেখানে গিয়েছিলাম। আমি কারও পেছনে ছুটিনি, বরং ইরানি কর্তৃপক্ষই তাদের প্রচারণার স্বার্থে আমাকে খুঁজে নিয়েছিল।’ তিনি আরও জানান, ইরান জানত, তিনি ইহুদি বংশোদ্ভূত। কিন্তু তাঁর মুসলিম স্বামী থাকায় কেউ তাঁকে সন্দেহ করেনি।
বর্তমান অবস্থান ও প্রভাব
বর্তমানে ক্যাথরিন শকদাম ‘ইসরায়েল পলিসি ফোরাম’-এর স্ট্র্যাটেজিক অ্যাডভান্সমেন্ট ডিরেক্টর এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘উই বিলিভ ইন ইসরায়েল’ সংস্থার পরিচালক। তিনি এখন প্রকাশ্যে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের পর তিনি ইরানের যুদ্ধকৌশলকে ‘কামিকাজে ডকট্রিন’ বা ‘কৌশলগত আত্মহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
ক্যাথরিন শকদামের কাহিনি কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। তাঁর কর্মকাণ্ডে ইরান আজ এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে তারা নিজেদের মিডিয়া আর্কাইভ থেকে শকদামের নাম ও নিবন্ধগুলো মুছে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। ক্ষমতার অন্দরমহলে একজন ইহুদি নারীর এই দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন এবং ইতিহাসের পাতায় এক রহস্যময় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সূত্র: আল জাজিরা, আরব নিউজ, বিবিসি