দিনাজপুর সদরের ছোট গুড়গোলা গ্রামের মেহেনাজ পারভীনের জীবনের প্রতিটি পরতে মিশে আছে বইয়ের ঘ্রাণ। তিনি সবুজ সাথী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং খোলাহাটী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ থেকে ২০০১ সালে এইচএসসি পাস করেন। মেহেনাজ পারভীন ছাত্রজীবন থেকে ছিলেন বইপ্রেমী। টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে বই কেনা কিংবা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির সামনে সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা—এসবই ছিল তাঁর নিত্যদিনের কাজ।
পুরস্কার এবং স্বীকৃতি
বইয়ের প্রতি এই টান তাঁকে এনে দিয়েছে জাতীয় পর্যায়ের সম্মান। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৬৯ নম্বর সদস্য মেহেনাজ ২০০৬ ও ২০১০ সালে পুরো দেশে বই পড়া প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ পাঠক হিসেবে নির্বাচিত হন। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মেহেনাজের হাতে তুলে দিয়েছিলেন সাফল্যের পুরস্কার।
পেশা ও শিক্ষাজীবন
২০০৮ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পড়াশোনায় বিরতি দেননি মেহেনাজ। শিক্ষকতার পাশাপাশি দিনাজপুর ল কলেজ থেকে এলএলবি এবং রংপুর টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন তিনি। বর্তমানে নিজ জেলার উত্তর গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।
স্বপ্ন, দুর্যোগ, পুনরুত্থান
প্রমথ চৌধুরীর দর্শনে উদ্বুদ্ধ মেহেনাজ বিশ্বাস করেন, সমাজে একটি লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা হাসপাতালের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এই চিন্তা থেকে ২০১৪ সালে স্বামীর ঘরে নিজের জমানো ৫০০ বই নিয়ে গড়ে তোলেন গ্লোরিয়াস লাইব্রেরি। তবে ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা তাঁর স্বপ্নে আঘাত হানে। বন্যার পানিতে ডুবে যায় তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত হাজারখানেক বই। তবে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেলেও মেহেনাজের কান্না ছিল তাঁর প্রিয় বইগুলোর জন্য। কিন্তু তিনি হার মানেননি। নিজের বেতন আর স্বামীর সহযোগিতায় আবার নতুন করে বই কেনা শুরু করেন। ২০২১ সালের মধ্যে তাঁর বইয়ের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৭০০। এরপর ২০২২ সালে পাঠাগারটি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে নিবন্ধিত হয়।
লেখক ও সংগঠক সত্তা
সংসার ও স্কুল সামলানোর পাশাপাশি মেহেনাজ একজন লেখকও বটে। এ পর্যন্ত তাঁর ১০টি বই প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে আছে ৩টি কবিতার বই, ৩টি উপন্যাস, ১টি গবেষণা গ্রন্থ, ১টি ছড়ার বই এবং ২টি গল্পের বই। তিনি সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা পাঠাগার সম্মেলন থেকে শুরু করে বেগম রোকেয়ার স্মৃতিবিজড়িত পায়রাবন্দের সম্মেলনেও তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল।
বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
বর্তমানে গ্লোরিয়াস লাইব্রেরির নিবন্ধিত সদস্য ২২১ জন। কোনো ফি ছাড়াই সপ্তাহে ৫ দিন, বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাঠকদের জন্য খোলা থাকে এই লাইব্রেরি। পাঠকেরা চাইলে বই বাড়িতে নিয়েও পড়তে পারেন। মেহেনাজ পারভীন বলেন, ‘বই পড়া আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি চাই বইপড়ুয়া একটি জাতি তৈরি হোক।’ শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁর স্বপ্ন—নিজের পাঠাগারটিকে আরও বড় করে তোলা এবং মানুষকে বইমুখী করার এই লড়াই চালু রাখা।