হোম > খেলা > ফুটবল

প্রবাসী ছোঁয়ায় মুখর বিশ্বকাপ

আনোয়ার সোহাগ, ঢাকা

সুইডেনের হয়ে তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করেছেন আয়ারি। ছবি: সংগৃহীত

২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া এক দুর্দান্ত হাফ ভলি জড়াল জালে। গ্যালারিতে তখন বুনো উল্লাস। এমন একটা নান্দনিক গোলের পর জার্সি খুলে ভোঁ-দৌড় দেওয়া কিংবা দর্শকদের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়াই তো স্বাভাবিক। কিন্তু গোলদাতা ইয়াসিন আয়ারি কেবল হাত দুটো জোড় করলেন, এরপর নতজানু হয়ে চুম্বন করলেন সবুজ ঘাসকে।

সেই উদ্‌যাপনে আনন্দের চেয়ে বেশি মিশে রইল এক নীরব ক্ষমা প্রার্থনা। কেন এই অনুতাপ? কারণ, সুইডেনের জার্সিতে খেলা এই ব্রাইটন মিডফিল্ডারের ধমনিতে বইছে তিউনিসিয়ান রক্ত। যে দেশের বিপক্ষে তিনি গোলটি করলেন, সেটি তাঁর বাবার জন্মভূমি।

আন্তর্জাতিক ফুটবলের আবেগঘন মঞ্চে আয়ারির এই হাত জোড় করার দৃশ্যটি আসলে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ফুটবলের এক নতুন বাস্তবতাকে আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। ফুটবল এখন আর কেবল মানচিত্রের কাঁটাতারে সীমাবদ্ধ কোনো খেলা নয়; এটি এখন ছড়িয়ে থাকা শিকড় আর প্রবাসীদের মেলবন্ধনের ক্যানভাস।

এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ১ হাজার ২৪৮ ফুটবলারের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে চক্ষু চড়কগাছ হতে বাধ্য। প্রতি চারজনে একজন খেলোয়াড় মাঠে নামছেন নিজের জন্মভূমির বাইরে অন্য কোনো দেশের জার্সি গায়ে। ফিফার নিয়ম শিথিল হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে এক অদৃশ্য ‘স্কাউটিং যুদ্ধ’। কে কত আগে কার ঘরের প্রতিভাকে নিজের দেশের জার্সি পরিয়ে দিতে পারে, তা নিয়ে ফুটবল ফেডারেশনগুলোর মধ্যে চলছে তুমুল প্রতিযোগিতা। বিশ্বায়নের এই যুগে ফুটবলাররা এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের প্রতিনিধি নন।

প্রবাসী ভেড়ানোর দৌড়ে সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটি লিখছে ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র কুরাসাও। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট এই দেশটিকে এবার রূপকথার জন্ম দিতে সহায়তা করেছে ডাচ লিগের ফুটবল একাডেমিগুলো। তাদের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের ২৫ জনই জন্মেছেন নেদারল্যান্ডসে! মাঠের ফুটবলটা কুরাসাও খেললেও, পেছনের শিক্ষাটা সম্পূর্ণ ডাচদের।

মরক্কো তো এই ধারার বৈশ্বিক রূপকার। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টরা এবারও মাঠ কাঁপাচ্ছে এমন এক স্কোয়াড নিয়ে, যাদের অর্ধেকের বেশি খেলোয়াড়ের জন্ম স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস কিংবা বেলজিয়ামে। ব্রাজিলের বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তারা এমন এক শুরুর একাদশ মাঠে নামিয়েছিল, যাঁরা সবাই জন্মেছেন মরক্কোর বাইরে।

আশরাফ হাকিমি-ব্রাহিম দিয়াজদের মতো তারকারা ইউরোপের জাঁকজমকপূর্ণ জীবন আর বড় দলের হাতছানি উপেক্ষা করে বেছে নিয়েছেন পিতৃভূমির লাল-সবুজ জার্সিকে। মাঠের পারফরম্যান্সে সেই টান স্পষ্ট।

ফুটবলারদের জন্য এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা সব সময় সহজ হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ফোলারিন বালোগুনের গল্পটাই ধরা যাক। মা-বাবা যখন ছুটিতে নিউইয়র্কে, তখন ব্রুকলিনে জন্ম তাঁর। ফলে জন্মসূত্রে তিনি আমেরিকান। আবার বেড়ে উঠেছেন ইংল্যান্ডে, ওদিকে মা-বাবার সূত্রে খেলতে পারতেন নাইজেরিয়ার হয়েও। তিনটি ভিন্ন সংস্কৃতির টান উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত বালোগুন বেছে নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রকে। জামাল মুসিয়ালা, হালান্ডের মতো তারকাদের ক্যারিয়ারের শুরুর গল্পটাও এমন দ্বৈততার চাদরে ঢাকা। যেমনটি আয়ারি এই সপ্তাহে বলছিলেন, ‘আমার বাবা বলেছিলেন, “তুমি নিজেই সিদ্ধান্ত নাও তুমি কী করতে চাও।” সুইডেনের সঙ্গে থাকাটা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়েছে।’

অনেকে সমালোচনা করে বলেন, এই প্রবাসী নির্ভরতায় স্থানীয় ফুটবলারদের খাটো করে দেখা হয়। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন এক আলো। এই প্রবাসী তারকারা আসলে যুদ্ধ, অভিবাসন ও উন্নত জীবনের খোঁজে দেশ ছাড়া লাখো মানুষের একেকজন প্রতিনিধি। মাঠের ৯০ মিনিটে যখন ফ্রান্সে বড় হওয়া কোনো তরুণ হাইতির জার্সিতে গোল করে ডাগআউটে এসে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে, তখন ফুটবল আর কেবল গোল করার খেলা থাকে না। তা হয়ে ওঠে শিকড়ে ফেরার গান, মানচিত্রের সীমানা মুছে এক হওয়ার উৎসব।

স্পেনকে স্তব্ধ করা কেপ ভার্দে গোলরক্ষককে কেন ‘দাদি’ ডাকা হয়

বিশ্বকাপে অঘটন, স্পেনকে রুখে দিল কেপ ভার্দে

মরক্কোর সঙ্গে ড্রয়ের পর ফুরফুরে মেজাজে ব্রাজিলের ফুটবলাররা

ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় মেসি

বিশ্বকাপের আগে শুরুর একাদশ নিয়ে দোটানায় আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপে সুইডেনের কাছে হেরে বরখাস্ত তিউনিসিয়া কোচ

তাহলে এই কারণে বিশ্বকাপে ১০ নম্বর জার্সি পাচ্ছেন না ইয়ামাল

ভিএআর স্টুডিওর দিকে রেফারির বিতর্কিত ইশারা, বিশ্বকাপে নতুন ঝড়

বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক: কারও কাছে আশীর্বাদ, কারও কাছে অভিশাপ

আর্জেন্টিনার শিরোপার স্মৃতিতে মিশে থাকা সেই রেফারির গল্প