হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কোথায় গিয়ে দাঁড়াল

আব্দুর রাজ্জাক 

দেখার বিষয়—কোন অবস্থায় গিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। ছবি: এএফপি

বেশ কয়েক মাস ধরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সবার অগোচরে চলে গেছে বলে মনে হয়। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে এর লাঠিয়াল ইসরায়েল অতর্কিতে হামলা করেছে ইরানের ওপর। বিশ্বের ৮০০ কোটি মানুষ হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। এই যুদ্ধ কিসের জন্য?

এর কোনো হিসাব মেলাতে পারছেন না বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ। তাই তো সবার দৃষ্টি এখন আমেরিকা-ইসরায়েলের বিপক্ষ শক্তি ইরানের দিকে।

গত ডিসেম্বরের পর থেকে তেমন কোনো মার মার কাট কাট, রমরমা কোনো খবর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে খুব একটা দেখা যায় না। এই চার মাস অবশ্য অত্র অঞ্চলে প্রচণ্ড শীতের সময় ছিল। তাপমাত্রা ওঠানামা করছিল মাইনাস ১০ থেকে ৩০-এর মধ্যে। বলতে গেলে বরফে ঢাকা পড়ে ছিল ওই অঞ্চলের সব জায়গা। বরফ যেমন সবকিছুকে ঠান্ডা করে রাখে, মনে হয় মানুষের মনও কেউ কিছুটা ঠান্ডা করে রেখেছিল, যে কারণে যুদ্ধ মনে হয় ঠান্ডা হয়েছিল! আহা যদি এমন সবকিছু বরফ শীতল থাকত সারা বছর, কতই না ভালো লাগত শান্তিকামী মানুষের। কিন্তু না, এটা সম্ভব হয়নি। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে থাকলেও গত কয়েক দিনে ইউক্রেন হামলা করেছে রাশিয়ার বেশ কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্রে, রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের গ্যাসফিল্ড, তমরুক গ্যাসফিল্ডে আঘাত করে তছনছ করে দিয়েছে। ইউক্রেন হামলা করেছে তুর্কস্ট্রিম তরল গ্যাসের পাইপলাইনে। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে কৃষ্ণসাগরের তল দিয়ে তুরস্কে গ্যাস রপ্তানি করা হয়। তুরস্ক কিছুটা হলেও বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। শীতের সময় গ্যাস না পেয়ে সেখানকার জীবনযাত্রা অনেকটাই বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। যদিও তুরস্ক ন্যাটো অধিভুক্ত একটি দেশ, যে ন্যাটো আর্থিক ও যুদ্ধ পরিচালনার মারণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনকে সাহায্য করছে।

রাশিয়া নীরবে ইউক্রেনের এই আক্রমণ প্রতিহত করেছে, যেন সার্বিকভাবে দেশটির অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে না পড়ে। রাশিয়া কিন্তু তার কাঙ্ক্ষিত পথ থেকে সরে আসেনি, পশ্চিম দিকে অর্থাৎ কিয়েভের দিকে অগ্রসর হচ্ছে তারা। রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা কোনোক্রমেই রহিত করতে পারছে না ইউক্রেনের বাহিনী। পুরোনো কথা আবার কিছুটা ঝালাই করে নিতে চাই, রাশিয়া চারটি অঞ্চল দখল করার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল—লুহানস্ক, দানেস্ক, গেরসন ও জাপোরিঝিয়া। সর্বশেষ যে তথ্য জানা যায় তাতে মনে হয়, এই চার প্রদেশের অর্থাৎ এই চার অঞ্চলের প্রায় ৯০ ভাগ রাশিয়া নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে।

একেকটি শহর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রাশিয়া বলছে, ‘আমরা এ শহরগুলোকে মুক্ত করেছি।’ অর্থাৎ এ শহরগুলো আগে পরাধীন ছিল! এর অর্থ হলো, এই অঞ্চলের মানুষ রাশিয়ার সঙ্গে থাকতে চায়। রাশিয়া যখন যে শহর বা গ্রামকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, সেই অঞ্চল বা শহরের মানুষ রুশ বাহিনীকে স্বাগত জানায়। এখানকার মানুষ বলে এত দিন তারা নাৎসি বাহিনীর কবলে ছিল। তাদের জীবনযাত্রার মান পাল্টে যায়। পার্থিব আয়-রোজগার করার ব্যবস্থা, চিকিৎসাব্যবস্থা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থাসহ সবকিছুই পাল্টে যায়। অর্থাৎ উন্নততর জীবনব্যবস্থা পায় তারা। রাশিয়া এখন পর্যন্ত যেসব শহর বা গ্রাম নিজেদের দখলে নিতে পারেনি, ওই গ্রাম বা শহরের মানুষ অপেক্ষায় আছে কবে রাশিয়া তাদের মুক্ত করবে। এখানেই কি রাশিয়ার সার্থকতা?

আমরা পশ্চিমা প্রোপাগান্ডায় যা-ই দেখি না কেন বা শুনি না কেন, আসল চিত্র হলো রাশিয়ানিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনের বাসিন্দারা রাশিয়ার সঙ্গে থাকতেই পছন্দ করে। তাদের জীবনযাত্রার মান বেড়ে যায়, নিজেদের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল দেখে তারা, একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করে তারা—রাশিয়ার সঙ্গে থাকলেই এসব সম্ভব বলে মনে করে তারা। যেসব অঞ্চল রাশিয়া মুক্ত করেছে, সেসব অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষ রুশ ভাষায় কথা বলে, রাশিয়ার কৃষ্টি-কালচারে অভ্যস্ত। ইউক্রেন এসব অঞ্চলে চিরাচরিত প্রথাবিরোধী সংস্কৃতি চালু করতে চেয়েছিল, যেটা ছিল প্রায় নাৎসি সংস্কৃতি। তাই সাধারণ জনগণ ইউক্রেনের এসব জিনিস পছন্দ করেনি। কিন্তু তাদের লাঠির ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পায়নি। যখন রাশিয়া এসব অঞ্চল দখলে নিয়েছে, তখন যেন তারা হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে।

রাশিয়া চার অঞ্চলের যে কটি শহর বা গ্রাম এখনো দখলে নিতে পারেনি সেগুলো হলো—কুপিয়ানস্ক, ক্রামাতরস্ক, স্লোভিয়ানস্ক, মিকোলাইভ, কোস্তিয়ানতিনিভকা, মালা তোকমাচ্কা ও জাপোরিঝিয়া সিটি। এর মধ্যে দুটি বড় শহর, অন্যগুলো ছোট ছোট শহর বা গ্রাম। এসব শহর ও গ্রাম চারটি প্রদেশের বড়জোর ১০-১২ শতাংশ হবে। এর মধ্যে বড় দুটি শহর রুশ সেনারা ঘিরে রেখেছে। ইউক্রেনের সেনারা এসব গ্রাম বা শহরের পশ্চিম দিকে মাটির বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছে। এখন সবার মনে প্রশ্ন আসবে, রাশিয়া এত দিন ধরে কেন যুদ্ধ চালাচ্ছে? তাদের কি অস্ত্রের বা টেকনোলজির অভাব? মোটেই সেটা নয়। রাশিয়া ইচ্ছা করলে পিন পয়েন্টে আঘাত করে ক্ষেপণাস্ত্র বা মিসাইল নিক্ষেপ করে ওই সব অঞ্চল দখলে নিতে পারে। আগেই একটি কথা বলেছি, উল্লিখিত চার প্রদেশের বেশির ভাগ মানুষ রাশিয়ার পক্ষে। মনে হচ্ছে, রাশিয়া কোনোক্রমেই সাধারণ মানুষের প্রাণহানি চায় না, সম্পদের ধ্বংস চায় না, তাই তারা শক্তির পরীক্ষা সেখানে চালায় না। বলপ্রয়োগের পরিবর্তে ধীরে ধীরে হয়তো তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়।

সবকিছু বুঝেশুনেই ট্রাম্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন জেলেনস্কিকে, রাশিয়া যে চারটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে সেসব অঞ্চল তাদের ছেড়ে দিতে। ট্রাম্প বুঝতে পেরেছেন রাশিয়া যেসব অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে, সেসব অঞ্চল কোনোভাবেই তারা ছাড়বে না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এসব অঞ্চলের মানুষও চায় রাশিয়ার সঙ্গে থাকতে। পুতিন খুবই ঠান্ডা মস্তিষ্কের লোক। জেলেনস্কি যদি অটল থাকে তাহলে পুতিন কিন্তু পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে কিয়েভের কাছাকাছি যে নদী আছে, সেই নদী পর্যন্ত দখল করে নিতে পারেন আগামী জুলাই-আগস্টের মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু বিবেচনা করে এই যুদ্ধের সমাপ্তি এভাবেই করবেন পুতিন—এমনটিই মনে হচ্ছে।

ইউক্রেনের এ ব্যাপারটি মাথায় রেখে সবকিছু করা উচিত। আমেরিকা এই যুদ্ধে আর কোনো আর্থিক সাহায্য দেবে বলে মনে হয় না। দামি কোনো যুদ্ধাস্ত্র যে দেবে, সে লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ইউক্রেন থেকে নিজেদের পাঠানো মিসাইল ধ্বংস করার কিছু অস্ত্র ইসরায়েলকে দিতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেন আবার সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি করেছে যে, তারা সৌদিকে মিসাইল ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অস্ত্র দেবে। যত দূর জানা যায়, ইউক্রেনের কাছে যে অস্ত্র আছে, তা খুবই ছোট পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে পারে—বড়জোর ১০০ কেজির ছোট পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। কিন্তু বর্তমানে এক থেকে দেড় হাজার কেজির মিসাইল নিক্ষেপ হচ্ছে ইরানের পক্ষ থেকে। অতএব, ইউক্রেনের এই সাহায্য খুব একটি কাজে আসবে বলে মনে হয় না। এর অর্থ দাঁড়ায়, ইউক্রেনকে কিছুটা বিপথের দিকে চালিত করছে যুক্তরাষ্ট্র, এ কার্যক্রমে ইউক্রেন কিছুটা দুর্বল হবে বৈকি।

রাশিয়া কিন্তু বেশি দামে তেল বিক্রি করে তাদের অর্থের রিজার্ভ অনেক বাড়িয়ে নিয়েছে। রাশিয়াকে এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে বলতে হবে। ফসল উৎপাদন এবার অনেক ভালো হয়েছে। রাশিয়ার অর্থনীতির রমরমা অবস্থা। এখন দেখার বিষয়, কোন অবস্থায় গিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।

লেখক: প্রকৌশলী

একাত্তরে গণহত্যা: মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন

বাসাভাড়া ২৪ ঘণ্টার, গেট কেন রাত ১১টার পর বন্ধ

নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

দাহকাল উতরানো কতটা সহজ

অটুট মনোবল অটুট স্বাধীনতা

মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ না হলে যুদ্ধ লেগেই থাকবে

ছাদবাগান দেবে সবুজ ছায়া

ঈদের আনন্দযাত্রা যখন মৃত্যুর মিছিল

পরিপাটি সন্‌জীদা

ভর্তি পদ্ধতি: লটারি না পরীক্ষা