হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পুরুষের মতো নয়, মানুষের মতো

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সাহিত্যে আমরা বীরদের বীরত্বের খবর অহরহ পাই, অন্তঃপুরচারিণীদের কথা কম আসে। কিন্তু যখন আসে, তখন বোঝা যায়, কি সহনশীলতায়, কি বাস্তব বুদ্ধিতে, কিংবা কৌতুকপ্রিয়তায় এরা কম উজ্জ্বল নয়। রামের কথা পাওয়া যায়, সীতার অনুভূতির বিষয়ে জানবার ও জানাবার মানুষ নেই। নইলে দেখা যেত সেই মানবিক কাহিনিও আরেক অমর কাব্যের উপযোগী বটে। মানবিক বললাম, পুরুষালি কিংবা মেয়েলি না বলে। মানবিক পূর্ণতাটাই মানদণ্ড হওয়া দরকার; আংশিকতার তুলনায়।

হোমারের অপর মহাকাব্য ‘ওডিসিতেই তো দেখি, ওডিসিয়ুস ঘরে ফিরছে, দীর্ঘ ও বিপৎসংকুল পথ ধরে ফিরতে সময় লেগেছে তার, এক-দুই বছর নয়, ১০ বছর গেল যুদ্ধে, ১০ বছর ফিরতি পথে। একটানা এই ২০ বছর একাকী ঘর সামলেছে তার স্ত্রী পেনিলোপি এবং যুদ্ধও করেছে।

তাকেও ‘উদ্ধার’ করতে চেয়েছিল স্থানীয় সেই ‘বীরেরা’ যারা যুদ্ধে যায়নি, দেশেই ছিল। অরক্ষিতা রানি নিজেই নিজেকে রক্ষা করেছে, ওই সব দুর্বৃত্তের বিপক্ষে তো বটেই, ক্রমবর্ধমান অন্তর্গত হতাশার বিরুদ্ধেও। রটিয়ে দিয়েছে বৃদ্ধ শ্বশুরের জন্য কাফনের যে কাপড়টি বুনছে, তার বুনন শেষ হলেই কাউকে না কাউকে সে গ্রহণ করবে, স্বামী হিসেবে। কাপড় বুনত ঠিকই, দিনে যতটুকু বুনত, রাতে তা খুলে ফেলে দিত। এভাবে চলছিল দিনে বোনা, রাতে খোলা। এই বুদ্ধিটা তার স্বামীর ট্রয়ের ঘোড়া উদ্ভাবনের বুদ্ধির চেয়ে কম ছিল না, গুণের দিক থেকে। পরে ওই কৌশলও যখন ব্যর্থ হলো পরিচারিকাদের একজনের বিশ্বাসঘাতকতায়, পেনিলোপি তখন ঘোষণা করল, সেই বীরকেই সে বিয়ে করবে ওডিসিয়ুসের পুরোনো ধনুকটিতে যে জ্যা পরাতে পারবে। ওডিসিয়ুসই পরিয়েছিল সেই জ্যা, তত দিনে দেশে ফিরে।

পেনিলোপি প্রচ্ছন্ন বটে, কিন্তু শেক্‌সপিয়ারের কমেডিগুলোতে নায়িকারা মোটেই গৃহবন্দিনী নয়। তারা বেরিয়ে যায়, বনে যেমন তেমনি আদালতে, আত্মরক্ষা করে ছদ্মবেশ ধারণ করে; বুদ্ধিতে, কৌতুকে এবং বাস্তববাদিতায় বারবার হারিয়ে দেয় পুরুষদের। আর বার্নার্ড শ তো বলতেনই যে মেয়েরা অনেক বেশি বাস্তববাদী পুরুষদের তুলনায়। বার্নার্ড শর আগে ইবসেনের নোরা স্বামীর সামান্যতা দেখে গৃহত্যাগ করেছে। কোথায় যাবে জানে

না, কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি। সন্তানদের প্রতি ভালোবাসার প্রশ্নটা স্বামী তুলেছিল, নোরা তবু ফেরেনি। ফিরবেও না।

এসবই বীরত্বব্যঞ্জক। বোঝা যায়, পুরুষের তুলনায় মেয়েরা সামান্য নয়। অথবা ধরা যাক টলস্টয়ের আন্না কারেনিনার কথা। অনেক বড় সেই নারী—যেমন তার স্বামীর তুলনায়, তেমনি তার প্রেমিকের।

মেয়ে ও মেয়েলিপনা এক নয়, যেমন এক নয় নাটক ও নাটুকেপনা, কিংবা পুরুষ ও পুরুষালিপনা। জর্জ এলিয়ট নামে পুরুষ, কিন্তু ওটি তাঁর ছদ্মনাম, মেয়েই তিনি এবং তাঁর উপন্যাসে জ্ঞান ও উপলব্ধির যে গভীরতা প্রকাশ পেয়েছে, বহু পুরুষ লেখকের মধ্যেই তা দুর্লভ। এই নারী, মেরি ইভানস, পুরুষের ছদ্মনামে লিখতেন; সেটা শুধু এই কারণে যে উনিশ শতাব্দীর ইংল্যান্ড প্রস্তুত ছিল না একজন নারীর লেখাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে। তাই পুরুষের নাম নিয়েছিলেন, পুরুষদের তথাকথিত পৌরুষকে ব্যঙ্গ করবার জন্যই যেন। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’র ওপর জর্জ এলিয়টের ‘ফেলিক্স হল্ট, দ্য র‍্যাডিক্যাল’ উপন্যাসের কোনো প্রভাব পড়েছে কি পড়েনি, সেই তদন্ত অবশ্যই অবাস্তব; তবু সত্য এই যে জর্জ এলিয়ট তাঁর বহু পাঠককে প্রভাবিত করেছেন, বহুভাবে। ওদিকে নিজের নামেই লিখেছেন যে এমিলি ব্রন্টি তাঁর একমাত্র উপন্যাস ‘উদারিঙ হাইটস’-এর মূল চরিত্র হিথক্লিফ ও ক্যাথির মধ্যে তীব্র আবেগ রয়েছে। কিন্তু তথাকথিত মেয়েলি ভাবালুতার ছিটেফোঁটাও নেই। ক্যাথি একাধারে আবেগপ্রবণ ও বাস্তববাদী। ভালোবাসে সে হিথক্লিফকে, কিন্তু বিয়ে করেছে এডগার লিন্টনকে। হিথক্লিফ দৃঢ়, এডগার নড়বড়ে। কিন্তু হিথক্লিফ দরিদ্র, এডগার ধনী। যে জন্য হিথক্লিফকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু বিয়ে করা যায় না। জর্জ এলিয়ট মেয়েলি নন, এমিলি ব্রন্টিও মেয়েলি নন, যেমন মেয়েলি নয় এমিলি ব্রন্টির ওই নায়িকা, ওই ক্যাথি। তুলনায় কবি টেনিসন বরং মেয়েলি, যদি ওই রকমের একটা ভাগ

খাড়া করতেই হয়।

জেন অস্টেনকে ডি এইচ লরেন্স বলেছেন সংকীর্ণ ও বিচ্ছিন্ন। অভিযোগটি যথার্থ। জেন অস্টেন অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং বড় জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সে তুলনায় লরেন্স উষ্ণ, উদার এবং বীরত্বপূর্ণ। কিন্তু আশ্চর্য বক্রাঘাত এটা যে লরেন্সের নিজের মধ্যেও তথাকথিত মেয়েলিপনার মোটেই অভাব নেই। জেন অস্টেনের লেখায় প্রধান বিষয়টি হচ্ছে বিবাহ; লরেন্সের লেখাতেও তাই। বিয়ে বলতে অস্টেন যা বোঝেন, লরেন্স তা বোঝেন না। অবশ্যই নয়, লরেন্সের বিয়েতে দৈহিক সম্পর্কের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই যে প্রেম ও বিবাহকে অধিক প্রাধান্য দেওয়া, এই যে যৌনতার প্রশ্নে মোহাবিষ্টতা, এই ইঙ্গিত করে যে মনে মনে লরেন্স তাঁর পিতার পুত্র হতে চেয়েছেন বটে, কিন্তু আসলে তিনি তাঁর পিতার নন, তিনি তাঁর মাতারই পুত্র। ‘সান্স অ্যান্ড লাভার্স’ উপন্যাসটি তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা দেয় না। সত্য বটে, তিনি বীরত্বকে গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর দুষ্টুমিপনা, ঝগড়াপ্রিয়তা, এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে সেই যে অভিযোগ—তিনি মেয়েদেরকে দ্বিতীয় জায়গায় রাখতে চেয়েছেন পুরুষের তুলনায়, সেই প্রবণতার সত্যতাও মেয়েলিপনাই প্রমাণ করে বলতে গেলে। লরেন্স মেয়েদের যেমনভাবে বুঝতেন, সেটা অসাধারণ, গার্হস্থ্য কাজে তাঁর ব্যক্তিগত দক্ষতাও সামান্য ছিল না। তিনি কখনো স্বীকার করতেন না, প্রশ্নই ওঠে না স্বীকার করার যে জেন অস্টেন থেকে তিনি ততটা দূরবর্তী ছিলেন না যতটা দূরবর্তী বলে বিশ্বাস করতে তিনি ভালোবাসতেন।

সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিষয়টি আসলে খুবই গভীর ও জটিল। মেয়েদেরকে অধস্তন অবস্থানে রাখার ব্যাপারে জেন অস্টেন প্রস্তুত ছিলেন, তিনি খুবই প্রথাবদ্ধ ও রক্ষণশীল; কিন্তু প্রথাবিরোধী ও বিদ্রোহাত্মক লরেন্সও মেয়েদেরকে ওখানেই রাখতে চান। ওই দ্বিতীয় স্থানে। প্রাচীন গ্রিক সংস্কৃতির আমরা প্রশংসা করতে অভ্যস্ত। প্রশংসা তাদের প্রাপ্যও বটে, কিন্তু সেই সংস্কৃতিতেও মেয়েদের স্থান দ্বিতীয়, প্রথম নয়। গ্রিক দার্শনিকদের কেউ কেউ যে আত্মসন্তোষ প্রকাশ করেছেন, তাঁরা মেয়ে হয়ে জন্মাননি বলে, সেটা মোটেই অযৌক্তিক কাজ ছিল না। সেই সমাজে প্রেমের চেয়ে বন্ধুত্ব বড় ছিল এবং বন্ধুত্ব হতো পুরুষে-পুরুষে, পুরুষে-নারীতে নয়। আধুনিক আমেরিকাতেও দেখি, কোনো নারী যে প্রেসিডেন্ট হবেন এমন আশা ক্ষীণ।

আসলে ঘটনা প্রাচীনও বটে। আদমের বুকের পাঁজর থেকে হাওয়ার জন্ম। এই পুরোনো কাহিনিই বলে দেয়, মেয়েদের অধস্তনতার ধারণা কত পুরোনো। অধস্তনতার এই ধারণা আজকের বাংলাদেশের যেকোনো আসরে, আড্ডায়, বৈঠকখানায় সমান বেগে প্রবাহিত। হাসি-ঠাট্টাতেও। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের সাম্প্রতিক বার্ষিকীতে একটি মেয়ে বড় দুঃখ করে লিখেছে, মেয়েরা

যে অনর্থক কৌতুকের বিষয়ে পরিণত হয়, সে সম্পর্কে। উদাহরণও দিয়েছে একটি প্রচলিত কৌতুকের: লোকটি মাঝিকে বলছে নদী পার করিয়ে দিতে। মাঝি বলছে জবাবে, ‘আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে, আগে গাভিটাকে পার করি।’ শুনে লোকটি বলল, ‘সেকি! মানুষের আগে গাভি?’ জবাবে মাঝি বলেছে চরম কৌতুকের কথা, ‘হুজুর, লেডিস ফার্স্ট, মহিলারা আগে।’ এ গল্প শুনে হো হো করে হাসবার মতো লোকের অভাব হবে বলে আমরা আশা করতে পারি না। না, মোটেই হবে না। হয়নি কখনো। মাঝি তো বটেই, বৈষম্যমূলক সমাজব্যবস্থায় যেকোনো পুরুষ, সে যতই পঙ্গু কিংবা অপদার্থ হোক, যেকোনো মেয়ের চেয়ে নিজেকে উঁচু মনে করতে চায়। অন্য কোনো যোগ্যতায় নয়, পুরুষ বলে। এই তার শিক্ষা, এই তার অভ্যাস। এই তার সংস্কৃতি। ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই ব্যতিক্রম নিয়মকেই প্রমাণ করে আসলে।

অত বড় জ্ঞানী লোক ছিলেন ড. জনসন। কিন্তু মেয়েদের শিক্ষায় বিশ্বাস করতেন না। রসিকতা করে মন্তব্য করেছেন যে মেয়েদের লেখাপড়া শেখা অনেকটা কুকুরের পক্ষে নিজের পেছনের পা দুটোর ওপর ভর করে দাঁড়ানোর মতো। গুণের প্রশ্ন অবান্তর, পারে যে এটা তো বিস্ময়ের ব্যাপার। কিন্তু এটি কোনো আকস্মিক রসিকতার ব্যাপার ছিল না। তাঁর জন্য নয়। অনেকের জন্যই নয়। দুর্বলকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করার চেয়ে সহজ কাজ আর কবে ছিল, কোথায় ছিল? ড. জনসনের ক্ষেত্রে একটা আদর্শিক অনুপ্রেরণাও কার্যকর ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সাহিত্যে, রাজনীতিতে, সমাজে—সর্বত্রই তিনি রক্ষণশীল ছিলেন। এই রক্ষণশীলতা এবং স্বাভাবিক প্রবণতা তাদের মধ্যে থাকেই, যারা সুবিধাভোগী।

মূল ঘটনাটি হচ্ছে বৈষম্য। বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে রয়েছে। নারী-পুরুষ বিভাজনের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য সরল ও মোটা রেখায় টানা খুবই সোজা। টানা হয়ও। বিশেষ করে বৈষম্যমূলক সমাজে। বৈষম্যের এই বিশেষ সমস্যাকে সমাজতান্ত্রিক সমাজও যে পুরোপুরি সমাধান করতে পেরেছিল, তা কিন্তু নয়, তবে অনেক অনেক পরিমাণে যে কমিয়ে এনেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে বেশ কয়েকটির এরই মধ্যে পতন ঘটেছে এবং যে কয়টি পতিত হয়েছে, তাদের প্রতিটিতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ইতিমধ্যে বহুগুণে বেড়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, বৈষম্যভিত্তিক সমাজব্যবস্থার সঙ্গে মেয়েদের দুর্ভোগের সম্পর্ক কত প্রত্যক্ষ।

নারীবাদী আন্দোলন এই বৈষম্য দূর করতে চায়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এই আন্দোলন বুঝতে চায় না যে বিষয়টা শুধু মেয়েদেরকে পুরুষের সমান করা নয়, তথাকথিত পুরুষালি গুণে ভূষিত করাও নয়, বিষয়টা হচ্ছে মেয়েদেরও মানবিক হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। এ সুযোগ পুরুষের জন্যও দরকার। কেননা যে সমাজে বৈষম্য আছে, সেখানে পুরুষও বন্দী; বন্দী পুরুষ মেয়েদেরকেও বন্দী করতে চায়। পুরুষতান্ত্রিক বন্ধন ছিন্ন করা একটি পদক্ষেপমাত্র, আরও একটি পদক্ষেপ অত্যাবশ্যক; যেটি পুরুষকেও মুক্ত করবে। নারী-পুরুষ উভয়েই তখন মুক্ত হবে—নারী কিংবা পুরুষ হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অবৈধ পথে ইউরোপযাত্রা

হাসান হাফিজুর রহমানের সাহিত্য-প্রচেষ্টা

একাত্তরে গণহত্যা: মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কোথায় গিয়ে দাঁড়াল

বাসাভাড়া ২৪ ঘণ্টার, গেট কেন রাত ১১টার পর বন্ধ

নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

দাহকাল উতরানো কতটা সহজ

অটুট মনোবল অটুট স্বাধীনতা

মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ না হলে যুদ্ধ লেগেই থাকবে

ছাদবাগান দেবে সবুজ ছায়া