হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

একাত্তরে গণহত্যা: মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব বাংলাদেশের কূটনৈতিক অর্জন

একাত্তরের ইতিহাসকে বিকৃত বা পুনর্লিখনের চেষ্টা নতুন নয়; তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু ইতিহাসের প্রতি অবমাননা নয়; বরং এটি একটি বিপজ্জনক সামাজিক বার্তা বহন করে।

চিররঞ্জন সরকার

১৯৭১ সালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ গণহত্যা। ছবি: সংগৃহীত

একাত্তরের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এ দেশের দোসরদের দ্বারা পরিচালিত গণহত্যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিস্মৃত ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। সেই ইতিহাসকে ক্রমেই মুছে ফেলার একটা সচেতন চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। যদিও এই গণহত্যাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত প্রস্তাব—যেখানে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে—এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রক্রিয়ায় এক নতুন গতি সঞ্চার করেছে। মার্কিন আইনপ্রণেতা গ্রেগ ল্যান্ডসম্যানের উদ্যোগে উত্থাপিত এই প্রস্তাব শুধু একটি কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ নয়; এটি ইতিহাসের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা, যা বিশ্ববিবেককে আবারও একাত্তরের দিকে তাকাতে বাধ্য করছে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যে নির্মম অভিযান শুরু করেছিল, তা ছিল সুপরিকল্পিত, সংগঠিত এবং লক্ষ্যনির্দিষ্ট। বাঙালি জাতিসত্তাকে দমন এবং বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়কে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই অভিযান ইতিহাসে এক নির্মম দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, গ্রামাঞ্চল, এমনকি নিরীহ মানুষের ঘরবাড়িও এই হত্যাযজ্ঞ থেকে রক্ষা পায়নি। লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়, অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হয় এবং কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড তাঁর বিখ্যাত ব্লাড টেলিগ্রাম-এ একে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাঁর এই সাহসী প্রতিবেদন সে সময়ের মার্কিন প্রশাসনের অবস্থানের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছিল।

তৎকালীন রিচার্ড নিক্সন এবং হেনরি কিসিঞ্জারের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছিল। ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশলগত বিবেচনা পাকিস্তানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্রে পরিণত করেছিল। ফলে মানবিক বিপর্যয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল কৌশলগত স্বার্থ। এই স্বার্থের কারণে মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে গণহত্যা চালানোর ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করে আসছিল।

এই প্রেক্ষাপটে ল্যান্ডসম্যানের প্রস্তাবটি ইতিহাসের সেই নৈতিক শূন্যতা পূরণের একটি প্রয়াস। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে ১৯৭১ সালে সংঘটিত সহিংসতা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ গণহত্যা। তাঁর বক্তব্যে যে দৃঢ়তা প্রতিফলিত হয়েছে, তা শুধু অতীতের ভুল স্বীকার নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নীতিগত অবস্থান নির্ধারণ করে। এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক মহলে একটি বার্তা দেয় যে দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত কোনো সত্যই চিরকাল চাপা থাকে না।

এই আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একাত্তরের ঘাতক শক্তিগুলোর ভূমিকা এবং তাদের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা। পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি এদেশীয় সহযোগী সংগঠনগুলো—বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের সহায়ক বাহিনী আলবদর ও আলশামস—এই হত্যাযজ্ঞে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা শুধু তথ্য সরবরাহ বা সহায়তা করেই ক্ষান্ত থাকেনি; বরং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডসহ নানা নৃশংস কর্মকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিল। ফলে একাত্তরের বিচার প্রসঙ্গে এই সংগঠনগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হলেও তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত প্রস্তাবটি বিচারপ্রক্রিয়াকে একটি আন্তর্জাতিক বৈধতা দিতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী অবস্থান হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এই আলোচনায় গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে একাত্তরের বিরোধী শক্তিগুলোর পুনরুত্থান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

একাত্তরের ইতিহাসকে বিকৃত বা পুনর্লিখনের চেষ্টা নতুন নয়; তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে উপস্থাপন করার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু ইতিহাসের প্রতি অবমাননা নয়; বরং এটি একটি বিপজ্জনক সামাজিক বার্তা বহন করে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হতে পারে এবং ন্যায়বিচারের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একটি প্রতিরোধক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ইতিহাসের সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক হবে।

উল্লেখ্য, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর যুদ্ধাপরাধে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় উৎস, বিচারিক দলিল এবং গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত। জামায়াতের মুখপত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে আলবদর বাহিনী গঠনের বিবরণ পাওয়া যায়। এসব দলিলে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন থেকেই আলবদর বাহিনী গড়ে ওঠে এবং তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করত।

বিভিন্ন দালিলিক প্রমাণে এটি স্বীকৃত যে জামায়াতে ইসলামী একটি সংগঠন হিসেবে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য পরিকল্পিতভাবে আলবদর, রাজাকার ও আলশামসের মতো আধা সামরিক বাহিনী গঠন ও পরিচালনা করে। এই বাহিনীগুলো শুধু সহায়ক ভূমিকা পালন করেনি; বরং সরাসরি হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন ও গণহত্যায় অংশ নিয়েছে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আলবদর বাহিনীর ভূমিকা সুপ্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে পরাজয় নিশ্চিত জেনে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। আলবদর বাহিনী—যা জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠিত—বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রস্তুত করে, তাঁদের বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল নবগঠিত বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করা।

বিভিন্ন গণহত্যার ঘটনায় জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে। যেমন, ফরিদপুরের চরভদ্রাসন গণহত্যায় জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের নেতৃত্বে রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনী হিন্দু গ্রামগুলোতে হামলা চালিয়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করে এবং শত শত ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। একইভাবে খুলনার শাঁখারীকাঠি হত্যাকাণ্ডেও রাজাকার বাহিনী—যা জামায়াত নেতাদের দ্বারা সংঘটিত—নিরস্ত্র হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায়। এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; বরং একটি বৃহত্তর পরিকল্পিত নিধন অভিযানের অংশ, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

এটা আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত যে একাত্তরের গণহত্যা শুধু পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কাজ ছিল না; বরং স্থানীয় সহযোগী শক্তি—বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সংগঠিত বাহিনীগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণে তা বাস্তবায়িত হয়েছিল।

এই বাস্তবতায় মার্কিন কংগ্রেসে এই প্রস্তাবটি গৃহীত হলে তার প্রভাব বহুমাত্রিক হবে। প্রথমত, এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি অর্জনের পথকে সুগম করবে। জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, যাতে তারা এই ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। দ্বিতীয়ত, এটি যুদ্ধাপরাধে জড়িত সংগঠন ও ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত, এটি বাংলাদেশের সরকারকে মানবাধিকার সুরক্ষা এবং উগ্রবাদ দমনে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে বাধ্য করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রস্তাবটি প্রমাণ করে যে ইতিহাসের বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু তা কখনো অস্বীকার করা যায় না। একাত্তরের গণহত্যা কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক ইস্যু নয়; এটি একটি জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন। এই সত্যকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে শুধু অতীতকে সম্মান করা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের পথ প্রশস্ত করা।

সুতরাং, মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপিত এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি কূটনৈতিক অর্জন নয়; এটি একটি নৈতিক বিজয়। এটি সেইসব মানুষের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, যারা একাত্তরে প্রাণ দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে এটি একটি প্রতিশ্রুতি—যেকোনো অন্যায়, যতই শক্তিশালী শক্তির দ্বারা সংঘটিত হোক না কেন, একদিন তার বিচার হবেই। এই প্রস্তাব যদি বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে; যেখানে মানবাধিকার, ন্যায়বিচার এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হয়।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ কোথায় গিয়ে দাঁড়াল

বাসাভাড়া ২৪ ঘণ্টার, গেট কেন রাত ১১টার পর বন্ধ

নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিক্ষার্থীরা

দাহকাল উতরানো কতটা সহজ

অটুট মনোবল অটুট স্বাধীনতা

মার্কিন ঘাঁটি বন্ধ না হলে যুদ্ধ লেগেই থাকবে

ছাদবাগান দেবে সবুজ ছায়া

ঈদের আনন্দযাত্রা যখন মৃত্যুর মিছিল

পরিপাটি সন্‌জীদা

ভর্তি পদ্ধতি: লটারি না পরীক্ষা