নারী, শিশু ও তরুণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হবে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন। আজ শুক্রবার বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে নারী মৈত্রী আয়োজিত ইয়ুথ কনফারেন্সে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন বলেছেন, ‘যে সকল অধ্যাদেশ নিয়ে আমরা একমত হয়েছি–অনুমোদিত ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই অধ্যাদেশটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এই অধ্যাদেশের ব্যাপারে আমরা সকলে একমত হয়েছি, সেহেতু সংসদের বাধ্যবাধকতা মেনে প্রথম অধিবেশনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এটিকে আইনে পরিণত করা হবে।’
এ যুব সম্মেলনে জানানো হয়, টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে তামাকজনিত রোগে মৃত্যু হয় প্রায় ২ লাখ মানুষের, যা দৈনিক গড়ে প্রায় ৫৪৬ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ বছর তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা। পক্ষান্তরে, তামাকের ব্যবহারজনিত কারণে মৃত্যু, অন্যান্য স্বাস্থ্য ক্ষতি এবং পরিবেশের ক্ষতি বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়ে ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি।
অকাল মৃত্যু রোধ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গত বছর ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদিত হয়। অনুমোদিত অধ্যাদেশে পাবলিক প্লেস এবং গণপরিবহনে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা; বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শন নিষিদ্ধসহ প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ওটিটি ও ডিজিটাল মিডিয়াসহ যে কোনো মাধ্যমে তামাকজাত দ্রব্যের সকল প্রকার বিজ্ঞাপন, প্রচার ও পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ করা; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও খেলাধুলার স্থানের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা এবং তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটের গায়ে বিদ্যমান ৫০ শতাংশের পরিবর্তে ৭৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সতর্কবাণী মুদ্রণের বিধান সংযোজন করাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি ড. গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা দেওয়া। তামাক কোম্পানি যে পরিমাণ রাজস্ব দেয়, তার চেয়ে বেশি টাকা সরকার আমাদের দেয় তামাকজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য। কিন্তু আমরা তো তা চাই না। আমরা চাই কেউ যেন এই রোগে আক্রান্ত না হই। আর সে জন্য তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইনে রূপান্তর করতে হবে।
নারী মৈত্রী তামাকবিরোধী ইয়ুথ ফোরামের সদস্য তাসফিয়া নওরিন বলেন, সর্বশেষ জনশুমারি (২০২২) অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশই তরুণ। এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে পাশ কাটিয়ে দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়। কারণ তামাক কোম্পানির প্রধান টার্গেট এই তরুণ জনগোষ্ঠী। তাই তামাক কোম্পানির এই কূটকৌশল রুখে দিয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই নবনির্বাচিত সরকারকে তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটিকে আইনে রূপান্তর করতে হবে। কেন না তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়ে অঙ্গীকার করেছিল। তাই নির্বাচনী অঙ্গীকার রক্ষা করতে অধ্যাদেশটি পাস করে আইনে পরিণত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।
নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলির সভাপতিত্বে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন—স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী, নারী মৈত্রী তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরাম, শিক্ষক ফোরাম, সাংবাদিক ফোরাম, ইয়ুথ ফোরাম এবং বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।