পদ্মা সেতু উদ্বোধন হয় ২০২২ সালের মাঝামাঝি। এর মধ্য দিয়ে সারা দেশের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। নৌপথের পরিবর্তে সড়কপথই হয়ে ওঠে মুখ্য। তাই ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের নৌপথে যাত্রী চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে বেড়েছে লঞ্চের কেবিনের চাহিদা।
গত বুধ ও গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ঘুরে বাড়িফেরা যাত্রীর সংখ্যা খুব একটা চোখে পড়েনি। বেশির ভাগ পন্টুনে যাত্রী উপস্থিতি কম থাকায় অনেকটা ফাঁকা পরিবেশ লক্ষ্য করা গেছে। যাত্রীর সংখ্যা কম হলেও ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে কেবিন টিকিটের চাহিদা বেশ তুঙ্গে। আগামী বুধ ও বৃহস্পতিবারের বেশির ভাগ লঞ্চের কেবিনের টিকিট দ্রুতই শেষ হয়ে গেছে।
লঞ্চমালিকেরা জানান, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে সড়কপথে দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। অনেক যাত্রী এখন বাসে ভ্রমণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। ফলে আগের বছরের তুলনায় ডেকে যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য অনেকেই এখনো কেবিনে যাতায়াত করতে আগ্রহী।
যাত্রাবাড়ীতে ব্যবসা করেন সজল হোসেন। চাঁদপুর যাওয়ার উদ্দেশ্যে সদরঘাটে এসে তিনি বলেন, ‘আমার মা অনেক অসুস্থ। তাই কেবিন ভাড়া করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এসে দেখি কোনো কেবিন নেই। আগামী দু-তিন দিন পর্যন্ত নাকি সব বুক হয়ে গেছে। এখন ভাবছি বাসে যাব।’
বরিশালগামী যাত্রী রুনা আক্তার বলেন, ‘আগে থেকেই লঞ্চে যাতায়াতের অভ্যাস। বাসের তুলনায় এটা অনেক আরামদায়ক। পরিবার নিয়ে যাচ্ছি, তাই একটি ডাবল কেবিন নিয়েছি।’
বর্তমানে একটি সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরবন-১৬ লঞ্চের ম্যানেজার মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘ডেকে যাত্রী কম থাকলেও সব কেবিন বুক হয়ে গেছে। আগামী দু-তিন দিন কোনো কেবিন ফাঁকা নেই।’
তাসরিফ-৩ লঞ্চের কর্মী ইবাদত বলেন, ‘ঈদুল ফিতর সামনে রেখে কেবিনের আগাম বুকিং শুরু হয়েছে। কেবিনের চাহিদা সব সময় বেশি থাকে। এখন যাত্রী কম থাকলেও ঈদের দু-তিন দিন আগে চাপ অনেক বেড়ে যাবে।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, ‘ঈদের দু-তিন দিন আগে যাত্রীর চাপ বেড়ে গেলে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধ রাখতে কঠোর নজরদারি থাকবে।’
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আগে প্রতিদিন গড়ে ৮৫-৯০টি লঞ্চ সদরঘাট টার্মিনাল থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় চলাচল করত। তবে সেতু উদ্বোধনের পর বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৬০-৬৫টি লঞ্চ চলাচল করছে।
এমভি ওয়ালিদ-৪ লঞ্চের কর্মী সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর লঞ্চে যাত্রীর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এখন ঈদ বা বড় কোনো ছুটির সময় কিছুটা ভিড় থাকলেও বছরের বাকি সময় অনেক লঞ্চ ফাঁকা পড়ে থাকে।’
১৭ মার্চ থেকে বছিলা, শিমুলিয়া ঘাটে বিশেষ লঞ্চ, স্টিমার পবিত্র ঈদুল ফিতর উদ্যাপনে নৌপথে ঘরমুখী যাত্রীদের যাতায়াত সহজ ও স্বস্তিদায়ক করতে বিশেষ লঞ্চ ও স্টিমার সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। ১৭ মার্চ থেকে শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট ও ঢাকার বছিলা লঞ্চঘাট থেকে নির্ধারিত কয়েকটি রুটে এসব নৌযান চলাচল করবে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঈদযাত্রাকে সামনে রেখে নৌপথে ঘরমুখী যাত্রীদের নিরাপদ, নির্বিঘ্ন ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে এ বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যবস্থার আওতায় কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া ট্যুরিস্ট ঘাট থেকে শিমুলিয়া-ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-চাঁদপুর-কালীগঞ্জ-হিজলা-বরিশাল নৌরুটে লঞ্চ ও স্টিমার চলাচল করবে।
ঢাকার বছিলা ব্রিজসংলগ্ন বছিলা লঞ্চঘাট থেকে বছিলা-সদরঘাট-মুন্সিগঞ্জ-চাঁদপুর-ঈদগা ফেরিঘাট এবং শরীয়তপুর-ইলিশা-হাকিমুদ্দিন-গলাচিপা নৌপথে যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।