অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশকে আংশিকভাবে ইতিবাচক বললেও, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশে সরকারের অবস্থানকে ‘নেতিবাচক বার্তা’ হিসেবে দেখছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
আজ সোমবার (৬ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত ‘রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রণীত কতিপয় অধ্যাদেশ বাতিল ও পরিবর্তন বিষয়ে টিআইবির অবস্থান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসির পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ছিলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অধ্যাদেশ বাতিলের কথা বা প্রতিরোধটা কিছু রাজনৈতিক দল থেকে কিছুটা ভেতর থেকে (সচিবালয়) আসছে। সরকার কিছু কিছু বক্তৃতা দিচ্ছেন, এট সেইম টাইম যে দৃষ্টান্তগুলো ইতিমধ্যে স্থাপিত হয়েছে যেটি আমি কিছু উল্লেখ করলাম, আর বিশেষ করে এখন যে অধ্যাদেশ ‘খেলাটা’ হচ্ছে, ‘খেলাই’ বলব আমি। সেখানে কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধটা আসছে, সেটা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে প্লাস পোশাকি ও অপোশাকি আমলাতন্ত্র থেকে।”
সংস্থাটি বলছে, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু আইনে পরিণত করার সুপারিশ ইতিবাচক হলেও, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয় বিষয়ক তিনটিসহ চারটি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করার সুপারিশ গভীর উদ্বেগের। একই সঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুদক এবং গুম প্রতিরোধে করা জনগুরুত্বপূর্ণ কয়েকটিসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই আইনে পরিণত না করে পরে নতুনভাবে আনার প্রস্তাবকেও স্পষ্ট অনিশ্চয়তার বার্তা হিসেবে দেখছে টিআইবি।
টিআইবি মনে করে, এখানে মূলত তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি কার্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ বিষয়ে সরকার কোনো সময়সীমাও নির্ধারণ করেনি, ভবিষ্যতে তা করা হবে, এমন ইঙ্গিতও দেয়নি।
দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার কমিশন ও দুদকসহ ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ পরে আরও শক্তিশালী করে আনার কথা বলা হলেও, সে প্রক্রিয়া ও সময়সীমা অস্পষ্ট। তৃতীয়ত, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিলে পরিণত করার কথা বলা হলেও, কী ধরনের সংশোধন আনা হবে, তা স্পষ্ট নয়।
সংস্থাটি আরও বলছে, সরকারের এই অবস্থান বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধের মতো মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রশ্নে পিছু হটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব সংস্কার কার্যকর হলে দেশে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হতে পারত।
বিশেষ করে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়ে টিআইবি বলেছে, বর্তমান কাঠামোতে এটি এমনিতেই দুর্বল। তার ওপর প্রস্তাবিত কমিশনকে আরও বেশি সরকারি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখে বিল আকারে পাসের উদ্যোগ হতাশাজনক।
এ ছাড়া, আইনে পরিণত হতে যাওয়া কিছু অধ্যাদেশেও গুরুতর ঘাটতি রয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এবং স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত চারটি সংশোধনী অধ্যাদেশের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।
টিআইবির ভাষ্য, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশে মহা হিসাব-নিরীক্ষকের সাংবিধানিক মর্যাদা ও স্বাধীনতার পরিপন্থী সীমাবদ্ধতা এখনো বহাল রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি হিসাবে প্রাপ্য রাজস্ব ও অন্যান্য প্রাপ্তি আইন, বিধি ও পদ্ধতি অনুযায়ী সঠিকভাবে নিরূপণ, জমা ও হিসাবভুক্ত হয়েছে কি না— তা নিরীক্ষার যথাযথ সুযোগ না থাকায় জবাবদিহি দুর্বল হবে এবং রাজস্ব খাতে অনিয়ম ও করফাঁকি রোধে কার্যকর ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হবে।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত সংশোধনী অধ্যাদেশগুলোতেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি দেখছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগের যে ক্ষমতা সরকার পেয়েছে, তা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ভবিষ্যতে নির্বাহী নিয়ন্ত্রণকে স্বাভাবিক করে তুলতে পারে।