‘গিভ টু গেইন’—৮ মার্চ বিশ্বব্যাপী পালিত হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য এটি। বিশ্বের নারীরা আজ সব বাধা তুড়ি মেরে নিজেদের পছন্দসই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তাঁদের কেউ কেউ কাজ করছেন নারীর শারীরিক, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্য নিয়ে। যোগব্যায়াম হচ্ছে সেই মাধ্যম, যা চর্চার ফলে একজন নারী সব দিক থেকে সুন্দর হয়ে উঠতে পারেন। স্বনামধন্য তিনজন যোগব্যায়াম প্রশিক্ষকের নিজেদের কথা থাকছে আজ। অনুলিখনে সানজিদা সামরিন।
নারীকে সুস্থ, সুন্দর এবং আত্মবিশ্বাসী করে তোলার ব্রত পালন করছি
বৃতি দেব
স্বত্বাধিকারী ও প্রধান যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক, ইয়োগা উইদ দেব
নিজের সুস্থতার জন্য যোগব্যায়াম করতাম অনেক আগে থেকে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমবিএ শেষ করার পর কোনো নামকরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে চাকরি করার ইচ্ছা থাকলেও বুঝলাম, সেই চাকরি ৯টা-৫টার ধরাবাঁধা রুটিনের চেয়ে ইয়োগা ম্যাটের ওপর কাটানো সময়গুলো আমাকে অনেক বেশি জীবন্ত রাখে। সেই ভালো লাগা থেকে স্কলারশিপ নিয়ে বেঙ্গালুরুতে ইয়োগা ট্রেনিং নিতে যাই। আমাদের দেশে শারীরিকভাবে ফিট থাকার চেয়ে মানসিক শান্ত থাকার প্রয়োজনটা তীব্র। একজন সার্টিফায়েড ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে মনে হলো, আমাদের দেশে দক্ষ এবং শুদ্ধভাবে শেখানোর মতো প্রশিক্ষক রয়েছেন হাতে গোনা; তাহলে সেখানে কেন আমার এই বিদ্যাকে অন্যের উপকারে প্রয়োগ করতে পারছি না? এখন দিন শেষে যখন দেখি, আমার মাধ্যমে অন্য কেউ শারীরিক ও মানসিক শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন, তখন যে তৃপ্তি পাই, সেটি কোনো এসি রুমের করপোরেট জবে সম্ভব ছিল না। আমার কাছে ইয়োগা এখন শুধুই পেশা নয়; বরং এটি মানুষের সেবা করার পবিত্র মাধ্যম।
নারীদের মধ্য়ে যোগব্যায়ামের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে
শামা মাখিং
যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক, এভারগ্রিন ইয়োগা সেন্টার
গতানুগতিক জীবনযাপন আমার কখনো পছন্দ ছিল না। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্নাতক শেষ করে একটু অবসাদেই ভুগছিলাম এই ভেবে যে ধরাবাঁধা সময়ের চাকরি পছন্দ নয়, সেটিই কি আমাকে করতে হবে? ছোটবেলা থেকে মেডিটেশন করতে অভ্যস্ত ছিলাম। সে কারণে বিভিন্ন ভিডিও দেখা হতো। তখন বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাণায়াম, যোগব্যায়াম ও মেডিটেশনের বিভিন্ন ভিডিও দেখতে শুরু করলাম। এভাবেই ধীরে ধীরে আগ্রহ বাড়তে থাকে। পরে পেশা হিসেবে যোগব্যায়ামকেই বেছে নিলাম। এতে করে নিজের শরীর ও মনের নানান সমস্যার সমাধান হয়ে যেতে শুরু করল। আবার অনেক ক্লায়েন্টের সমস্যাও মিটে যেতে শুরু করল। যেমন অনেক ক্লায়েন্ট আছেন, যাঁদের পিসিওএসের সমস্যার কারণে কনসিভ করতে পারছেন না। কিন্তু নিয়মিত সেশন নেওয়ার পর, দিনের পর দিন যোগাসন করার ফলে তাঁরা কনসিভ করতে পেরেছেন। আবার অনেকের ব্যাক পেইনের সমস্যাও সেরে যাচ্ছে, ডায়াবেটিসের সমস্যা থেকে তাঁরা সুফল পাচ্ছেন; এসব ঘটনা ঘটতে যখন দেখি, তখন নিজেকে সফল মনে হয়।
শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়
এলিজা চৌধুরী
যোগ প্রশিক্ষক ও স্বত্বাধিকারী, এলিজা’স ইয়োগ আর্ট
যোগব্যায়ামকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, সেবা দেওয়ার মাধ্যমে নিজেও উপকৃত হওয়া, যেটা অন্য কোনো পেশায় পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এখানে যেমন আমি মানুষকে শেখাচ্ছি, ঠিক সে সময় নিজেও এর সুফল নিজের শরীর ও মনে উপলব্ধি করতে পারছি। গিভ টু গেইনের মূল ব্যাপারটা এখানেই রয়েছে বলে আমার মনে হয়। বিশ্বের অনেক দেশের মতো আমাদের দেশের নারীরাও কিন্তু আর্থিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। বলা হয়, সুস্থতাই সাফল্যের চাবিকাঠি। সেদিক থেকে একজন নারী যদি শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ এবং আত্মবিশ্বাসী থাকেন, তাহলে অন্যান্য দিকের সমস্যাও কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়। যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষণ দেওয়াকে কল্যাণমূলক কাজ মনে হয়। যখন কোনো মানুষ অবসাদগ্রস্ত অথবা কোনো সমস্যা নিয়ে আমার এখানে এসে যোগব্যায়াম ও মেডিটেশন চর্চার মাধ্য়মে সুস্থতা অনুভব করেন, তখন নিজেকে সফল মনে হয়। আমি মনে করি, নারীর প্রথম দায়িত্বই হচ্ছে নিজেকে যত্নে রাখা; নিজের শরীর, মন আর স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া। এর পাশাপাশি ত্বকের যত্ন এবং খাদ্যাভ্যাসের দিকে বিশেষভাবে নজর রাখতে হবে। নিজের যত্ন না নিলে আশপাশের সবকিছু মলিন মনে হবে। এতে করে বিভিন্ন সমস্যার মধ্য় দিয়ে যেতে হবে।