বাংলার সবুজ পল্লি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ভুবন গ্রাম। ১৮৯৬ সালে এই গ্রামের এক পুণ্যময় দম্পতি মাওলানা আনোয়ার আলী ও জোবায়দা খাতুনের কোল আলো করে জন্ম নেন এক ফুটফুটে শিশু। পিতা পরম আহ্লাদে নাম রাখলেন তাজুল ইসলাম, যার অর্থ ইসলামের মুকুট। কে জানত, এই শিশুই একদিন বিশ্বজুড়ে বাংলার গৌরব বয়ে আনবেন!
তাজুল ইসলামের মেধা ছিল প্রবাদপ্রতিম। বিদ্যালয়ে ভর্তির মাত্র ৯ মাসে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত সব বই মুখস্থ করে ফেলেন! ছেলের এই অলৌকিক প্রতিভা দেখে পিতা তাকে শ্রীঘর মাদ্রাসায় ভর্তি করান। এরপর হবিগঞ্জের বাহরুল উলুম এবং সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। সিলেটের প্রখ্যাত কারি আবদুশ শহিদ (রহ.) বলেছিলেন, ‘মাওলানা তাজুল ইসলামের উত্তরপত্রে কোনো ভুল-ভ্রান্তি বা কাটাকাটিও থাকত না; তাঁর ভাষা ছিল অত্যন্ত নির্ভুল ও বিশুদ্ধ।’
১৯২০ সালে তিনি বিশ্বখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। মাত্র ৪ বছরে তাফসির, ফিকহ, হাদিস ও আরবি সাহিত্যে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তিনি আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.), শাব্বির আহমাদ উসমানি (রহ.) এবং শাইখুল আদব আল্লামা ইজাজ আলীর মতো জগদ্বিখ্যাত মনীষীদের প্রিয় ছাত্র ছিলেন।
হাদিসের শিক্ষকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবন শুরু হয়। প্রথমে তিনি কুমিল্লার জামিয়া মিল্লিয়া ও কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। ১৩৪৫ হিজরিতে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামিয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসায় পরিচালক পদে যোগদান করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ৪২ বছর এই পদে ছিলেন। তাঁর হাতে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার বিজ্ঞ আলেম ও দূরদর্শী চিন্তাবিদ।
ফখরে বাঙাল ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী। একবার কুমিল্লা রেলস্টেশনে এক উদ্ধত কাবুলিওয়ালার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। কাবুলিওয়ালা দাড়ি মুন্ডিয়ে বড় গোঁফ রেখে সুন্নতের অবমাননা করছিল এবং দম্ভভরে বলছিল, ‘গোঁফে শক্তি আছে, দাড়িতে নেই।’ তাজুল ইসলাম (রহ.) এই অবমাননা সইতে না পেরে তাকে মল্লযুদ্ধের চ্যালেঞ্জ দেন। মুহূর্তের মধ্যে শক্তিশালী কাবুলি যুবককে ধরাশায়ী করে তিনি তার বুকের ওপর বসে পড়েন এবং গোঁফ টেনে ধরে হুংকার দেন—‘বল এবার, গোঁফে শক্তি বেশি না দাড়িতে?’
১৯৬৭ সালের ৩ এপ্রিল এই মহান সিংহপুরুষ ইন্তেকাল করেন।