সকালটা ছিল অন্য সব দিনের মতোই শান্ত আর স্নিগ্ধ। মদিনার আকাশে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়তেই যেন এক বিষাদের সুর নেমে এল। আজ একজন সাহাবি ইন্তেকাল করেছেন। মদিনার প্রতিটি অলি-গলিতে শোকের ছায়া, কারণ তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। নাম তাঁর আবু সাঈদ (রা.)। তিনি ছিলেন একজন ভালো মানুষ। তাঁর দয়ার হাত ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। তাঁর হাসি ছিল মদিনার সবার প্রিয়। আজ সেই মানুষটি নেই।
প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জানাজা পড়ালেন। এরপর একদল সাহাবি মৃতদেহ কবরস্থানে নিয়ে এলেন। নবীজি (সা.) নিজেও হেঁটে হেঁটে এলেন, কারণ তিনি জানতেন—এই যাত্রায় তাঁর সাহাবির সঙ্গ দেওয়া প্রয়োজন। কবরস্থানে পৌঁছানোর পর দুজন সাহাবি কবর খোঁড়া শুরু করলেন। বাকিরা সবাই মৃতদেহকে ঘিরে শান্তভাবে বসে আছেন। সবার চোখে-মুখে এক নীরব প্রশ্ন!
নবীজি (সা.) গভীর মনোযোগ দিয়ে কবর খোঁড়া দেখছিলেন। হঠাৎ তিনি সবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো, মানুষ মারা যাওয়ার পর, তাঁর আত্মার কী হয়?’
সাহাবিরা আগ্রহ নিয়ে নবীজিকে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের বলুন।’
নবীজি (সা.) একটু চুপ করে থাকলেন। সবাই তাঁর কাছে এসে ঘিরে বসলেন। তাঁদের হৃদয়ে গভীর আগ্রহ, কারণ মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা ছিল না। আজ তাঁরা সরাসরি নবীজির মুখ থেকে শুনবেন, এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে! নবীজি (সা.) একবার কবরের দিকে তাকালেন, তারপর মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর তিনি গল্পের মতো করে বলতে শুরু করলেন—
শোনো, যখন কোনো মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি আসে, তখন সে মৃত্যুর ফেরেশতাকে দেখে ভয় পেয়ে যায়। কিন্তু যে ইমানদার এবং ভালো মানুষ, তাকে মৃত্যুর ফেরেশতা হাসি মুখে সালাম দেন। তাকে অভয় দেন এবং মাথার পাশে এসে ধীরে ও যত্ন করে বসেন। তারপর মৃতপ্রায় মানুষটির দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘হে পবিত্র আত্মা, তুমি তোমার পালনকর্তার ক্ষমা ও ভালোবাসা গ্রহণ করো এবং এই দেহ থেকে বেরিয়ে আসো।’
নবীজি (সা.) এমনভাবে কথাগুলো বলছিলেন, যেন তিনি চোখের সামনে সবকিছু দেখতে পাচ্ছেন। সাহাবিদের মনে হচ্ছিল, তাঁরা যেন মৃত্যুর সেই মুহূর্তটি অনুভব করতে পারছেন।
নবীজি (সা.) আরও ভালো করে উদাহরণ দিয়ে বললেন—মনে করো একটা পানির জগ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর ওপর থেকে এক ফোঁটা পানি যেমন নিঃশব্দে নিচে নেমে আসে, ঠিক তেমনি নীরবে ও কোনো কষ্ট ছাড়াই আত্মাটি তাঁর দেহ থেকে বের হয়ে আসে।
সেই সময় দুজন অন্য ফেরেশতা বেহেশত থেকে খুব সুগন্ধি মাখানো একটা নরম সুতার সাদা চাদর নিয়ে আসেন। তাঁরা আত্মাটিকে সেই চাদরে আবৃত করে আকাশের দিকে নিয়ে যান। তাঁরা যখন আকাশে পৌঁছান, তখন অন্য ফেরেশতারা সেই আত্মাকে দেখার জন্য এগিয়ে আসেন। কাছে এসে সবাই বলেন, ‘সুবহানাল্লাহ! কত সুন্দর আত্মা, কী সুন্দর তাঁর ঘ্রাণ!’
তারপর সবাই জানতে চান, ‘এই আত্মাটি কার?’
উত্তরে আত্মা বহনকারী ফেরেশতারা বলেন, ‘তিনি হলেন অমুকের সন্তান অমুক।’
বাকি ফেরেশতারা তখন আত্মাটিকে সালাম দেন, তারপর আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘তিনি কী করেছেন? তাঁর আত্মায় এত সুঘ্রাণ কেন’
আত্মা বহনকারী ফেরেশতারা তখন বলেন, ‘আমরা শুনেছি মানুষজন নিচে বলাবলি করছে—তিনি একজন ভালো মানুষ ছিলেন, আল্লাহর ভালো বান্দা, অনেক দয়ালু, মানুষের অনেক উপকার করেছেন।’
নবীজি (সা.) এতটুকু বলার পর একটু থামলেন। সবার দিকে ভালো করে দৃষ্টি দিয়ে, তাঁর কণ্ঠটা একটু বাড়িয়ে বললেন, ‘এই কারণেই বলছি—সাবধান, তোমরা কিন্তু মানুষের সঙ্গে কখনো খারাপ ব্যবহার করবে না। তুমি মারা যাওয়ার পর মানুষ তোমার সম্পর্কে যা যা বলবে, এই আত্মা বহনকারী ফেরেশতারাও আকাশে গিয়ে ঠিক একই কথা অন্যদের বলবে।’
এই কথা বলে তিনি আবার একটু চুপ করলেন, কবরটার দিকে দৃষ্টি দিলেন। সাহাবিদের মধ্যে অনেকেই তখন চোখের পানি মুছলেন।
নবীজি (সা.) আবার বলতে শুরু করলেন—এই সময় মানুষ যখন পৃথিবীতে মৃতদেহকে কবর দেওয়ার জন্য গোসল দিয়ে প্রস্তুত করে, তখন আল্লাহ তাআলা আত্মা বহনকারী ফেরেশতাদের বলেন, ‘যাও, এখন তোমরা আবার এই আত্মাকে তাঁর শরীরে দিয়ে আসো। মানুষকে আমি মাটি থেকে বানিয়েছি, মাটির দেহেই তাঁর আত্মাকে আবার রেখে আসো। সময় হলে তাকে আমি আবার পুনরায় জীবন দেব।’
তারপর মৃতদেহকে কবরে রেখে যাওয়ার পর দুজন ফেরেশতা আসেন। তাঁদের নাম মুনকার ও নাকির। তাঁরা মৃতের সৃষ্টিকর্তা, তাঁর ধর্ম ও নবী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন।
মুনকার-নাকির চলে যাওয়ার পর, আত্মাটি আবার অন্ধকার কবরে একাকী হয়ে যায়। সে এক ধরনের অজানা আশঙ্কায় অপেক্ষা করে। কোথায় আছে? কী করবে? এক অনিশ্চয়তা এসে তাকে ঘিরে ধরে। এমন সময় সে দেখে, খুব সুন্দর একজন তাঁর কবরে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তাঁকে দেখার পর আত্মাটি ভীষণ মুগ্ধ হবে। এত মায়াবী ও সুন্দর তাঁর চেহারা, সে জীবনে কোনো দিন দেখেনি।
আত্মাটি তাঁকে দেখে জিজ্ঞেস করবে, ‘তুমি কে?’
সেই লোকটি বলবে, ‘আমি তোমার জন্য অনেক বড় সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। তুমি দুনিয়ার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। তোমার জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতের ব্যবস্থা করেছেন। তুমি কি সেটা একটু দেখতে চাও?’
আত্মাটি ভীষণ খুশি হয়ে বলবে, ‘অবশ্যই আমি দেখতে চাই, আমাকে একটু জান্নাত দেখাও।’
লোকটি বলবে, ‘তোমার ডান দিকে তাকাও।’
আত্মাটি ডানে তাকিয়ে দেখবে কবরের দেয়ালটি সেখানে আর নেই। সেই দেয়ালের দরজা দিয়ে অনেক দূরে সুন্দর বেহেশত দেখা যাচ্ছে। বেহেশতের এই রূপ দেখে আত্মাটি অনেক মুগ্ধ হবে ও প্রশান্তি লাভ করবে। সেখানে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে, ‘আমি সেখানে কখন যাব? কীভাবে যাব?’
লোকটি মৃদু হেসে বলবেন, ‘যখন সময় হবে, তখনই তুমি সেখানে যাবে ও থাকবে। আপাতত কিয়ামত পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। ভয় পেয়ো না, আমি তোমার সঙ্গেই আছি। তোমাকে আমি সেই দিন পর্যন্ত সঙ্গ দেব।’
আত্মাটি তখন তাকে আবারও জিজ্ঞেস করবে, ‘কিন্তু তুমি কে?’
তখন লোকটি বলবে, ‘আমি তোমার এত দিনের আমল। পৃথিবীতে তোমার সব ভালো কাজের, তোমার সব পুণ্যের রূপ আমি। আজ তুমি আমাকে একজন সঙ্গীর মতো করে দেখছ। আমাকে আল্লাহ তাআলা তোমাকে সঙ্গ দেওয়ার জন্যই এখানে পাঠিয়েছেন।’
এই কথা বলে, লোকটি আত্মাটির ওপর যত্ন করে হাত বুলিয়ে দেবেন এবং বলবেন, ‘হে পবিত্র আত্মা! এখন তুমি শান্তিতে ঘুমাও। নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নাও।’
এই কথা বলার পর, আত্মাটি এক নজরে বেহেশতের দিকে তাকিয়ে থাকবে এবং একসময় এই তাকানো অবস্থায় গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে।
নবীজি (সা.) এতটুকু বলে আবার একটু থামলেন। সাহাবিরা তখন গায়ের কাপড় দিয়ে ভেজা চোখ মুছলেন। তাঁদের হৃদয়ে তখন এক নতুন অনুভূতি। তাঁরা বুঝতে পারলেন—জীবন কেবল এখানেই শেষ নয়, বরং মৃত্যুর পরেই শুরু হয় আসল জীবন। আর সেই জীবনের সফলতা নির্ভর করে মানুষের ভালো কাজের ওপর।
তথ্যসূত্র: সহিহ্ বুখারি ও মুসনাদে আহমাদ