‘দোয়া’ শব্দটি মূলত আরবি ‘দাআ’ ধাতু থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে। যার অর্থ—সম্বোধন করা, কাউকে ডাক দেওয়া, আহ্বান করা, প্রার্থনা বা অনুরোধ করা। সহজ কথায়, মহান আল্লাহ তাআলাকে পরম আকুতিতে সম্বোধন করে ডাকা এবং তাঁর কাছে নিজের অভাব-অভিযোগ ও প্রয়োজন পেশ করাই হচ্ছে মূলত দোয়া। আমাদের সমাজে এটি ‘মোনাজাত’ নামেও বহুল পরিচিত।
আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা প্রয়োজনে কত মানুষের কাছে হাত পাতি! ক্ষমতাধর ব্যক্তি কিংবা নামকরা দানবীরের কাছে চাইতে আমরা দ্বিধাবোধ করি না। কিন্তু যিনি পুরো মহাবিশ্বের মালিক, সমস্ত সৃষ্টির রিজিকদাতা, সেই পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে চাইতে আমরা অনেকেই উদাসীনতা দেখাই। অথচ মানুষের কাছে চাইলে মানুষ বিরক্ত হয়, আর আল্লাহর কাছে না চাইলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন।
চাওয়ার মাধ্যমেও যে সওয়াব বা ইবাদত হতে পারে, তা ইসলামের এক অনন্য সৌন্দর্য। বিখ্যাত সাহাবি হজরত নুমান ইবনে বাশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—‘দোয়াই হলো ইবাদত।’ (জামে তিরমিজি, সুনানে ইবনে মাজাহ)।
আমরা যা কিছু চাইব, তা মূলত আমাদের নিজেদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক প্রয়োজনে। অথচ এই চাওয়ার প্রক্রিয়াটিকেই আল্লাহ তাআলা ইবাদত হিসেবে গণ্য করছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—‘আর তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো। আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব (তথা তোমাদের দোয়া কবুল করব)।’ (সুরা মুমিন: ৬০)
যিনি অমুখাপেক্ষী এবং সৃষ্টির সমস্ত মানুষ যাঁর করুণা ও অনুগ্রহের ভিখারি, তাঁর কাছে চাওয়ার এই মহাসুযোগ একজন মুমিন কীভাবে হাতছাড়া করতে পারে?
মানবজীবনে ইমানের পর সবচেয়ে দামি সম্পদ হলো ‘হেদায়েত’ বা সঠিক পথপ্রাপ্তি। আল্লাহ তাআলা দয়া করে আমাদের ইসলাম নামক এই শ্রেষ্ঠ নিয়ামত দিয়েছেন, যার জন্য আমাদের কোনো পূর্ব আবেদন বা দরখাস্তের প্রয়োজন হয়নি। তবে এই অর্জিত সম্পদ ধরে রাখার জন্য আল্লাহ নিজেই আমাদের পবিত্র কোরআনে দোয়া শিখিয়েছেন:
‘হে আমাদের প্রতিপালক, হেদায়েত বা সঠিক পথপ্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরকে বক্র করে দেবেন না। আপনি আমাদের আপনার পক্ষ থেকে রহমত ও অনুগ্রহ দান করুন। নিশ্চয়ই আপনি পরম দাতা।’ (সুরা আলে ইমরান: ০৮)
এই হেদায়েতের ওপর অটল থাকার জন্য আমাদের দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে সুরা ফাতিহার মাধ্যমে কমপক্ষে ৩২ বার (ফরজ ও সুন্নাত মিলিয়ে) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হয়—‘আপনি আমাদের সরল সঠিক পথে পরিচালিত করুন।’
দোয়া করার ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিকতার কথা হাদিসে এসেছে:
১. দৃঢ় আশা নিয়ে দোয়া করা: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—তোমাদের কেউ যেন কখনো এ কথা না বলে যে—‘হে আল্লাহ, আপনার ইচ্ছে হলে আমাকে ক্ষমা করুন, আপনার ইচ্ছে হলে আমাকে দয়া করুন।’ বরং দৃঢ় আশা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে দোয়া করবে। কারণ, আল্লাহকে বাধ্য করার মতো কেউ নেই। (সহিহ্ বুখারি)
২. তাড়াহুড়ো না করা: অনেক সময় আমরা কয়েকবার দোয়া করেই হাল ছেড়ে দিই। অথচ দোয়া কখনো বৃথা যায় না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন—তোমাদের প্রত্যেকের দোয়াই কবুল হয়ে থাকে, যদি সে তাড়াহুড়ো না করে এবং এই কথা না বলে যে—‘আমি এত দোয়া করলাম, অথচ আমার দোয়া কবুল হলো না’। (সহিহ্ বুখারি ও মুসলিম)
হাদিস অনুযায়ী, দোয়া হুবহু কবুল না হলেও এর অছিলায় আল্লাহ কোনো বিপদ দূর করে দেন, অথবা পরকালে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করেন।
দোয়া কবুলের জন্য এর কিছু বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ আদব বজায় রাখা জরুরি:
মহাবিশ্বের কোনো বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে চাইলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়, পিএসের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। কিন্তু রাজাধিরাজ আল্লাহর দরবারে যোগাযোগের জন্য কোনো মাধ্যম বা নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন নেই; তাঁর দরজা ২৪ ঘণ্টা খোলা। তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমন কিছু বিশেষ ক্ষণ রয়েছে, যে সময়গুলোতে আল্লাহ বান্দার দোয়া ফিরিয়ে দেন না। যেমন—
দোয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি, কৃপণতা বা তাড়াহুড়ো কাম্য নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে দোয়ার প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করে পূর্ণ আদব, নম্রতা ও একাগ্রতার সঙ্গে তাঁর দরবারে হাত তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি জামে মসজিদ, গাজীপুর।