সূর্য সেদিন অন্যভাবে জ্বলবে। মানুষ দিশেহারা হয়ে ছুটে বেড়াবে, কিন্তু কোনো আশ্রয় পাবে না। কারণ এটি হবে হাশরের ময়দান, শেষ বিচারের দিন। পৃথিবীর সব মানুষ, সব জীব-জন্তু, সব সৃষ্টি একত্রিত হবে এক বিশাল প্রান্তরে। প্রত্যেকেই সেদিন নিজেদের পাপের ভারে এতটাই চিন্তিত থাকবে যে, কেউ কারও দিকে তাকানোর সাহস পাবে না। সেই দিনটির নাম ‘ইয়াওমুল হিসাব’, অর্থাৎ হিসাব-নিকাশের দিন।
হাশরের ময়দান। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হবে না। হাজার বছর ধরে মানুষ অপেক্ষা করবে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, আর ভয়ের এক তীব্র অনুভূতি তাঁদের ঘিরে ধরবে। প্রতিটি মানুষ কেবলই নিজেদের মুক্তির জন্য প্রার্থনা করবে। অবশেষে তাঁরা একত্রিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, ‘যদি আমরা আমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে কাউকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাই, যিনি আমাদের এই কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন, তাহলে আমরা হয়তো কিছুটা শান্তি পাব।’
তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করবে, সর্বপ্রথম তাঁরা আদি পিতা আদম (আ.)-এর কাছে যাবে। তিনি ছিলেন আল্লাহর হাতে গড়া প্রথম মানুষ। তাঁকে জান্নাতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। তাই তাঁর কাছে গিয়ে তাঁরা কাকুতি-মিনতি করবে।
আদম (আ.)-এর সামনে এসে তাঁরা বলবে, ‘হে আদি পিতা আদম, আল্লাহ আপনাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, আপনাকে জান্নাতে বসবাস করিয়েছেন, ফেরেশতাদের দিয়ে আপনাকে সিজদা করিয়েছেন এবং তিনিই সবকিছুর নাম আপনাকে শিখিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন, যেন তিনি আমাদের এই কষ্টদায়ক স্থান থেকে মুক্ত করে প্রশান্তি দান করেন।’
আদম (আ.) তখন মাথা নিচু করে বলবেন, ‘আমি তোমাদের এই কাজের মোটেই উপযুক্ত নই।’ তিনি সেই ভুলের কথা স্মরণ করবেন—যখন তিনি আল্লাহর নিষেধ সত্ত্বেও গাছের ফল খেয়েছিলেন। তিনি বলবেন, ‘বরং তোমরা আল্লাহর প্রেরিত সর্বপ্রথম নবী নুহ (আ.)-এর কাছে যাও।’
নুহ (আ.)-এর কাছে গিয়ে মানুষজন একই আবেদন করবে। কিন্তু নুহ (আ.) বলবেন, ‘আমি তোমাদের এ কাজের জন্য একেবারেই যোগ্য নই।’ তিনি তাঁর সেই ভুলের কথা স্মরণ করবেন—যখন তিনি অজ্ঞতাবশত নিজের অবাধ্য ছেলের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। তিনি বলবেন, ‘বরং তোমরা আল্লাহর খলিল, ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে যাও।’
মানুষজন তখন ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে যাবে। ইবরাহিম (আ.)-ও বলবেন, ‘আমি তোমাদের এ কাজের জন্য কিছুই করার ক্ষমতা রাখি না।’ তিনি তাঁর জীবনের তিনটি ভুলের কথা স্মরণ করবেন। তিনি বলবেন, ‘বরং তোমরা মুসা (আ.)-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহর এমন এক বান্দা—যাকে আল্লাহ তওরাত দান করেছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন এবং নৈকট্য দান করেছেন।’
তখন তাঁরা সবাই মুসা (আ.)-এর কাছে যাবে। মুসা (আ.) বলবেন, ‘আমি তোমাদের জন্য সুপারিশের ক্ষেত্রে অপারগ।’ তিনি সেই ভুলের কথা স্মরণ করবেন, যা তাঁর হাতে সংঘটিত হয়েছিল—যখন তিনি একজন ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। তিনি বলবেন, ‘বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা ও তাঁর মনোনীত রাসুল, তাঁর কালিমা ও রুহ ইসা (আ.)-এর কাছে যাও।’
মানুষজন তখন ইসা (আ.)-এর কাছে যাবে। ইসা (আ.) বলবেন, ‘আমি তোমাদের এ কাজের উপযুক্ত নই। বরং তোমরা মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহ তাআলার এমন এক বান্দা, যার আগের ও পরের সমস্ত গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়েছে।’
সব নবী ও রাসুলদের প্রত্যাখ্যাত হয়ে মানুষজন অবশেষে শেষ নবী, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে যাবে। তাঁরা এসে বলবে, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনিই আমাদের শেষ আশ্রয়।’
নবীজি (সা.) বলেন, ‘তাঁরা আমার কাছে আসবে। আমি তখন আমার রবের কাছে তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করব। অতঃপর আমাকে তাঁর নিকট যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ আমাকে যতক্ষণ চাইবেন সিজদা অবস্থায় রাখবেন।’
আল্লাহ বলবেন, ‘হে মুহাম্মদ, মাথা ওঠাও। আর যা বলার বলো—তোমার কথা শোনা হবে। সুপারিশ করো—কবুল করা হবে। তুমি চাও—তোমাকে দেওয়া হবে।’
নবীজি (সা.) বলেন, ‘তখন আমি মাথা ওঠাব এবং আমার রবের এমনভাবে প্রশংসা বর্ণনা করব—যা তিনি আমাকে শিখিয়ে দেবেন। অতঃপর আমি সুপারিশ করব। তবে এ ব্যাপারে আমার জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তখন আমি আল্লাহর দরবার থেকে উঠে আসব এবং সেই নির্ধারিত সীমার লোকদের জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব।’
‘তারপর আমি আবার ফিরে এসে আমার প্রতিপালকের দরবারে হাজির হওয়ার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই তাঁর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে যাব এবং আল্লাহ যতক্ষণ চাইবেন আমাকে সিজদা অবস্থায় থাকতে দেবেন।’
তারপর আল্লাহ বলবেন, ‘হে মুহাম্মদ, মাথা ওঠাও। আর যা বলার বলো—তোমার কথা শোনা হবে। সুপারিশ করো—কবুল করা হবে। তুমি প্রার্থনা করো—যা প্রার্থনা করবে তা দেওয়া হবে।’
নবীজি (সা.) বলেন, ‘তখন আমি মাথা ওঠাব এবং আমার রবের এমনভাবে প্রশংসা ও গুণকীর্তন বর্ণনা করব, যা আমাকে শিখিয়ে দেওয়া হবে। এরপর আমি সুপারিশ করব। তবে এ ব্যাপারে আমার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। তখন আমি আমার রবের দরবার থেকে উঠে আসব এবং সেই নির্দিষ্ট লোকগুলোকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব।’
‘অতঃপর তৃতীয়বার ফিরে আসব এবং আমার প্রতিপালক আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করব। আমাকে তাঁর কাছে উপস্থিত হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। আমি যখন তাঁকে দেখব, তখনই সিজদায় পড়ে যাব। আল্লাহ যতক্ষণ ইচ্ছা আমাকে সিজদা অবস্থায় রাখবেন। তারপর বলবেন—হে মুহাম্মদ, মাথা ওঠাও। তুমি যা বলবে—তা শোনা হবে। সুপারিশ করো—কবুল করা হবে। প্রার্থনা করো—তা দেওয়া হবে।’
নবীজি (সা.) বলেন, ‘তখন আমি মাথা ওঠাব এবং আমার রবের এমন হামদ ও সানা বর্ণনা করব—যা তিনি আমাকে শিখিয়ে দেবেন। তারপর আমি সুপারিশ করব। এ ব্যাপারে আল্লাহ আমার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেবেন। তখন আমি সেই দরবার থেকে বের হয়ে আসব এবং তাঁদের জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে প্রবেশ করাব।’
অবশেষে কোরআন যাদের আটকিয়ে রাখবে (অর্থাৎ যাদের জন্য কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী চিরস্থায়ী ঠিকানা জাহান্নামে নির্ধারিত হয়ে গেছে) তাঁরা ব্যতীত আর কেউ জাহান্নামে অবশিষ্ট থাকবে না।
বর্ণনাকারী সাহাবি আনাস (রা.) বলেন, অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআনের এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন—
عَسٰۤی اَنۡ یَّبۡعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحۡمُوۡدًا
অর্থ: ‘আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক অচিরেই আপনাকে “মাকামে মাহমুদ”-এ পৌঁছে দেবেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৭৯)
এরপর নবীজি (সা.) বললেন, ‘এটাই সেই মাকামে মাহমুদ—যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের নবীকে দেওয়া হয়েছে।’
সাহাবিরা নবীজির কথা শুনে গভীরভাবে প্রভাবিত হলেন। তাঁদের চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠল।
তথ্যসূত্র: সহিহ্ বুখারি: ৭৪৪০